বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা, বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা বিশ্বকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মঙ্গলবার দিল্লিতে ‘ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরাম’-এর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ভারত অন্য দেশের ক্ষতি করে নিজের উন্নতি করতে চায় না। বরং বিশ্বের সঙ্গে এবং বিশ্বের কল্যাণের জন্যই ভারত এগিয়ে যেতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতকে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে শুধু পণ্য উৎপাদন করাই অর্থনৈতিক শক্তির পরিচয় নয়। প্রয়োজনের সময় সেই পণ্য সরবরাহ করা, জ্বালানির জোগান অব্যাহত রাখা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াও সমান জরুরি। গত কয়েক দশকে বিশ্বায়নের ফলে দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বেড়েছে। কিন্তু বিভিন্ন দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অনেক সময় দুর্বলতার কারণ হয়ে উঠছে। সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থ লেনদেন কিংবা প্রযুক্তিকে যখন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্প ও বাণিজ্যের উপর।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। একটি বিশাল বাজার, দক্ষ মানবসম্পদ, দ্রুত বাড়তে থাকা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে তার জন্য শুধু সম্ভাবনার কথা বললেই চলবে না। উৎপাদনের মান বাড়ানো, পরিকাঠামোর উন্নতি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং ব্যবসার পরিবেশকে আরও সহজ করে তোলার উপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পক্ষে দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিক সংস্কারের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। এই বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনাকে সামনে আনে। পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি, শ্রমক্ষেত্রে সংস্কার এবং ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে এই সংস্কারের সুফল ছোট ব্যবসায়ী, মাঝারি শিল্প, কৃষক এবং সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে।
মোদীর বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রযুক্তির সামাজিক ব্যবহার। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি, তথ্য, জ্ঞান ও উদ্ভাবন শক্তির উৎস। কিন্তু সেই শক্তির আসল মূল্য নির্ভর করে তার ব্যবহারের উপর। এই ভাবনার মধ্যেই রয়েছে ভারতের উন্নয়নের একটি ইতিবাচক দিক। ডিজিটাল লেনদেন, সাশ্রয়ী মোবাইল ইন্টারনেট এবং সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা বহু মানুষের কাছে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ব্যাঙ্কিং পরিষেবা থেকে শুরু করে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া— বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। এই অগ্রগতিকে আরও কার্যকর করতে হলে ডিজিটাল শিক্ষা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী যে ক্ষমতার মাধ্যমে অন্যকে ক্ষমতাশালী করে তোলার কথা বলেছেন, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক আকার কিংবা সামরিক ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্য দেশগুলির উন্নয়নে সহযোগিতা করা, সংকটের সময় নির্ভরযোগ্য থাকা এবং পারস্পরিক স্বার্থকে সম্মান করাও শক্তির পরিচয়। ভারত যদি প্রযুক্তি, ওষুধ, জ্বালানি, কৃষি এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে পারে, তা হলে উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।




