পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অস্থিরতার ছায়া পড়েছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাই তৈরি করছে না, বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মনেও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করছে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও বাজারে আস্থা ও ভোক্তাদের মানসিকতা, এই দুটি বিষয় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ভারতের শেয়ারবাজারের সূচক সেনসেক্স ছিল ৮১,২৮৭। কয়েক দিনের মধ্যেই তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৭,৫৬৬-এ। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার শতাংশ পতন। অবশ্য এই পতন বিশ্ববাজারের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক একই সময়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পড়ে গেছে, আর জাপানের নিক্কেই সূচকও দশ শতাংশের বেশি নেমেছে। বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ হল হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি। এই পথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছয়। পথটি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হয়।
Advertisement
অবশ্য প্রতিটি দেশের সমস্যা এক নয়। ভারতের বাজার এখনও পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়া মানেই পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন— সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বৃদ্ধি। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যবৃদ্ধির উপর। মূল্যবৃদ্ধি যদি দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। আর সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়, দুটোই কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
Advertisement
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা যদি ভারতের বাজারে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা করে দ্রুত বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে শুরু করেন, তাহলে বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। তার প্রভাব পড়বে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উপরও। গত কয়েক বছরে যাঁরা নিয়মিত সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপি-র মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগ করেছেন, সূচকের পতনে তাঁদের সম্পদের মূল্য কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন ‘ওয়েলথ এফেক্ট’। মানুষ যখন নিজের সম্পদের মূল্য কমতে দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই খরচ কমাতে শুরু করে।
ভারতের অর্থনীতিতে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় থেকে। দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী থেকে শুরু করে পোশাক, গাড়ি, শিক্ষা বা ভ্রমণ— সব মিলিয়ে এই খাতই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। চলতি বছরে এই ভোগব্যয়ের অংশ মোট জিডিপির প্রায় ৬১.৫ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা গত পনেরো বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গত কিছু সময়ে ভোক্তা ব্যয় বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। আয়কর ছাড় মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ দিয়েছে, পণ্য ও পরিষেবা করের কিছু হ্রাস অনেক পণ্যকে তুলনামূলকভাবে সস্তা করেছে, আর মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমেছে। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছিল মাত্র ২.৭ শতাংশে। এই সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আর্থিক স্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু যদি যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তাহলে এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করলে মানুষের ওপর অদৃশ্য এক চাপ তৈরি হয়, যাকে অনেক অর্থনীতিবিদ ‘অদৃশ্য কর’ বলেও উল্লেখ করেন। একই সময়ে যদি শেয়ারবাজারেও পতন ঘটে, তাহলে মানুষের আর্থিক আত্মবিশ্বাস আরও কমে যেতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় কমবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত অবশ্য এই যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে সংযমের আহ্বান জানানো ছাড়া এর বেশি কিছু করার সুযোগও নেই। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে আস্থা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের পক্ষে সম্ভব এবং অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বাজারে আতঙ্ক ছড়াতে না দেওয়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা এবং অর্থনীতির শক্ত ভিত সম্পর্কে মানুষকে আশ্বস্ত করা— এই তিনটি কাজ বিশেষভাবে প্রয়োজন। অর্থনীতিতে অনেক সময় বাস্তব সংকটের চেয়ে মানসিক সংকটই বড় হয়ে ওঠে। যেমন ব্যাঙ্ক ভেঙে পড়ে সব সময় অর্থের অভাবে নয়, বরং আতঙ্কে মানুষ একসঙ্গে টাকা তুলতে চায়।
অতএব এই সময়ে প্রয়োজন দূরদর্শী এবং সক্রিয় নীতি। মানুষকে বোঝাতে হবে যে ভারতের অর্থনীতির ভিত শক্ত, আন্তর্জাতিক সংঘাত চিরস্থায়ী নয়, এবং বিশ্ববাজারও শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। আস্থাই অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি। সেই আস্থা অটুট রাখাই এখন সবচেয়ে বড় কর্তব্য।
Advertisement



