• facebook
  • twitter
Saturday, 14 March, 2026

বিতর্কের মঞ্চ: এখন সৃজনশীল দম্ভের দোকান

গণতন্ত্রে নানা মতের দ্বন্দ্ব চলে। একনায়কতন্ত্রে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ দ্বন্দ্ব বিরোধাত্মক দ্বন্দ্ব নয়, তা হবে মিলনাত্মক। মিলনাত্মক দ্বন্দ্ব একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

মহম্মদ শাহাবুদ্দিন

গণতন্ত্রের বিকাশের সূচনায় একনায়কতন্ত্র গণতন্ত্রকে প্রতিহত করার জন্য বহু যুক্তির অবতারণা করেছিল। সেই যুক্তিকে প্রতিহত করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার যুক্তি সাজিয়েছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষেরা। শেষ পর্যন্ত জনগণের অধিকার কায়েম হয়েছিল— ‘গভর্নমেন্ট, অফ দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’। গণতন্ত্রের সূচনা থেকেই যুক্তি তর্কের জন্ম। আবার এই সূচনারও আগের ইতিহাস আছে। পাঁচশ খ্রিস্টপূর্বাদ্রে গ্রীসে শুরু হয়েছিল যুক্তিনিষ্ঠ বিজ্ঞান ও দর্শনের যুগ। জ্ঞানচর্চা তখন গ্রীসকে মুখরিত করেছিল। গ্রীসের ইতিহাসে রয়েছে গণতন্ত্র চর্চার প্রাচীন ইতিহাস। দার্শনিক সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো, প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটলের সময়কালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজদর্শন নিয়ে বিতর্কের যাত্রা শুরু হয়। ষোড়শ শতকে ফ্রান্সিস বেকন তাঁর ‘অব বোল্ডনেস’ গ্রন্থে প্রাচীন এথেন্সের ডোমোন্থেনেসকে বিতর্কের শ্রেষ্ঠ বক্তা বলে উল্লেখ করেছেন। জানা যায় গ্রীক কবি হোমার এবং দার্শনিক হেরাক্লিটাসের মধ্যে নানান মত নিয়ে বিতর্ক চলতো।

Advertisement

৪৮৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীসে যুক্তি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়েছিল সোর্ফিস্ট গোষ্ঠী। এই পেশাদারী তার্কিক সম্প্রদায় রাষ্ট্র পর্ষদের সদস্যদের যুক্তিনির্ভর তত্ত্বকথা শেখাতেন। ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে চিন দেশে দার্শনিক কনফুসিয়াসের সময়কালে বিতর্কচর্চার প্রচলন ছিল। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকেই ভারতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরোধিতা করে যুক্তিবাদী মতবাদ প্রবল হয়ে উঠেছিল।
অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে ফ্রান্সের প্যারী, ব্লুর্জেস, লিয়ঁ শহরের পানশালার টেবিলে টেবিলে সম্ভাব্য বিপ্লবের তত্ত্ব নিয়ে তর্কের ঝড় উঠত। ভলতেয়ার, মঁপাসা সবাই এই আড্ডা আলোচনা বিতর্কের ঝড়ে চিন্তার ঝড়ে চিন্তার নতুন নতুন দিশা খুঁজতেন। আমাদের দেশে উনিশ শতকের গোড়ায় যাঁরা পাশ্চাত্য রেনেসাঁর বাতায়ন যাঁরা খুলে দিয়েছিলেন রামমোহন রায় ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য মানুষ। এই ধারাবাহিকতায় বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ যে মানবতাবাদী চিন্তার ঢেউ তুলেছিলেন, তা এনেছিল নবজাগরণকে ভিত্তি করে নতুন জীবনদর্শন। শিক্ষানির্ভর যুক্তিবাদ ও আধ্যাত্মিক ভাবনার নতুন মূল্যায়ন সারা দেশ জুড়ে গড়ে তুলেছিল তর্ক আলোচনার আবহ। তবে আধুনিক রাজনীতির তর্কযুদ্ধ বলে যেটা জানা যায়, যাকে কেন্দ্র করে সংসদীয় বিতর্ক ও প্রথার সূচনা, তার মূল ধারাটি এসেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে। ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স বা নিম্নকক্ষের অধিবেশনে আয়োজিত তর্কালোচনা সংসদে বিতর্ক পর্বের সূচনা ঘটায়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে এই ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

Advertisement

স্বাধীনতার পর ৭৮ বছর পেরিয়ে এসেছি। রাজনীতির অনেক পালাবদল ঘটেছে। অনেক দল ক্ষমতায় এসেছে বলে অনেক রকম ঝান্ডার রঙও আমরা দেখেছি। প্রথম তিরিশ বছর রাজনীতি একটা সিরিয়াস ব্যাপার ছিল। ভোটে দাঁড়ানো, জনগণের সমর্থন চাওয়া সবকিছুর মধ্যে একটা সৌজন্য ছিল। ষাট-সত্তর দশকে এসেছিল ভোটের রাজনীতি। ছিল ন-পার্টি ছ-পার্টি। তবুও অনেক নেতাই কথায় চরিত্রে সমীহ আদায় করতেন। তখন রাজনীতির মূলে ছিল আদর্শ। এখন সামাজিক অবক্ষয় মানুষের চরিত্রকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। এখন ক্ষমতার জন্য রাজনীতি। মতাদর্শ থেকে আদর্শ বিযুক্ত হয়ে এখন মতটাই প্রধান। যে মত শুধু স্বার্থরক্ষার জন্য আবর্তিত। তাই রাজনীতি এখন শুধুই ক্ষমতার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজনীতির সুস্থ ক্ষমতায়ন আর নেই।

জনাদেশে যিনি ক্ষমতার সিংহাসন পেয়েছেন তাঁর হাতে ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার কই। তা না হলে ক্ষমতাকে সামনে রেখে এত দুর্নীতি, এত প্রতারণা, এত আইনের অপব্যবহার হয় কী করে? গণতন্ত্রের সংকটের যুগে আজ এটা বড় প্রশ্ন। আজকের ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার আস্বাদন করতে গিয়ে মানুষের কল্যাণ কতটুকু করবেন। তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে এখন ক্ষমতার বড়াই, ক্ষমতার দম্ভ। কতটা প্রভাবশালী হতে পেরেছি, দাম্ভিকতার মধ্যে দিয়ে এখন সেটাই দেখাতে হবে। এখন শুধুই দলীয় রাজনীতির পাশাখেলা। এর প্রতিফলন ঘটছে মিডিয়ার বিতর্ক সভায়। বিতর্কের তার্কিকরা হয় কে নয় করা এবং প্রতিপক্ষকে নয়ছয় করার জন্য বহুবিধ কৌশল ব্যবহার করছেন। নিজেদের ঢাকতে, আড়াল করতে দাম্ভিকতাই এখন অস্ত্র। অনেকে সত্যকে ঢাকতে মিথ্যে যুক্তি খাড়া করার হোমওয়ার্ক করে আসেন তর্কসভায়।

দুর্নীতি তো আজ রাষ্ট্র ও সমাজের শেকড়ে গেঁথে বসে আছে। এই শেকড় গণতন্ত্রের গভীরে ঢুকে পড়েছে। ঘুণ ধরাচ্ছে গণতন্ত্রের আদর্শে। নিজেদের গুণগান যাঁরা গাইছেন তাঁদের দাম্ভিকতা সাধারণের মানসিকতাকে কোণঠাসা করছে। উন্নত ভাবনা, সাহস থেকে তাঁরা আলাদা হয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা হীনমন্যতায় ভুগছেন। দম্ভের আঁচকে সয়ে সয়ে মানুষ ভেবে নিচ্ছেন জীবনে অবহেলাটাই বুঝি ভবিতব্য। জীবনের যন্ত্রণা, অন্যায়বোধ এইভাবেই সহনীয় হয়ে উঠছে। আসলে শাসকের বুলি মানুষের সম্মানের বোধটাকেই দখল করে রাখছে। তাঁদের দাম্ভিকতা মানুষের কাছে চাইছে আরও স্তাবকতা, আরও আনুগত্য। এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রতিটি তর্কে-বিতর্কে। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ তাঁর জীবনযুদ্ধে অনেকটাই হেরে যাচ্ছে। জীবন-জীবিকা ঘিরে জীবনে ছেয়ে যাচ্ছে এক অনিশ্চয়তা। কোনও রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ সংগ্রাম কোনও স্থিতি আনতে পারছে না। রাজনীতিতে এখন একদিকে পাইয়ে দেওয়া আর একদিকে আদায় করা। রাজনীতি না দিতে পারছে আস্থা, না গড়ে তুলতে পারছে মূল্যবোধ। রাজনীতি এখন অনীহার ব্যাপার। তাই অপরাধ দেখে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি দেখেও মানুষ প্রতিবাদে টানটান হয়ে উঠছে না। তাই তো মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগে আদর্শের ঝুলি ধুলোয় ফেলে দাম্ভিক মানুষরা তাদের ফানুসকে শূন্যে ওড়াতে পারছে।

গণতন্ত্রে নানা মতের দ্বন্দ্ব চলে। একনায়কতন্ত্রে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ দ্বন্দ্ব বিরোধাত্মক দ্বন্দ্ব নয়, তা হবে মিলনাত্মক। মিলনাত্মক দ্বন্দ্ব একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। যেখানে বিভিন্ন চিন্তার আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য মত পাওয়া যায়। আর যেখানে শুধুই বিরোধিতা, সেটা তো অন্যকে দাবিয়ে রাখার কৌশল। তাই আলোচনা হোক পারস্পরিক ভিত্তিতে। এ সহযোগিতার যে বৃত্ত তৈরি হয়, তাতে আমাদের বুদ্ধির আলোকিত পরিধি বাড়বে। গণতন্ত্র তো মানুষের এই সচেতনতাই কামনা করে। এতে মানুষ রাজনীতি বুঝবে, গণতন্ত্রের মূল্যকেও নির্ধারণ করতে পারবে। মিডিয়ায় যথার্থভাবে বিতর্ক ও আলোচনা হোক। তা যেন সমবেত আলোচনার দম্ভভরা কণ্ঠস্বরের বিপণন না হয়ে ওঠে। কারণ কোটি কোটি মানুষ টিভির পর্দায় চোখ রাখে। যুক্তি তো চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে, একটা মতাদর্শকে সামনে আনে। রাজনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে মানুষকে নিমগ্ন করে। তাই আজকের দিনে যাঁরা রাজনীতির আলোচনা করতে চান, তাঁরা তাঁদের দম্ভ ছেড়ে, কু-কথায় পঞ্চমুখ না হয়ে মানুষকে সচেতন করার দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করবেন এটাই কাম্য। আমরা তো কলহপ্রিয় নই, আমরা তর্কপ্রিয়, তাই আলোচনা হোক কোনও পথ খোঁজার, আলোচনা হোক কোণে। অন্বেষণের, আলোচনা হোক সঠিক নির্ণয়ের।

Advertisement