• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 2 July, 2026

যে আদালত নিজের আসামি নিজেই বেছে নেয়

সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের নিযুক্ত কমিশন গাজা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর নৃশংসতা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সরকারের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির দায়িত্বের কথাও বলা হয়েছে।

যে আদালত নিজের আসামি নিজেই বেছে নেয়

Photo: SNS

ভারতীয় বিদেশ পরিষেবায় তিন দশকেরও বেশি সময় কাজ করার সুযোগে বিশ্বের নানা প্রান্তে দায়িত্ব পালন করেছি। ব্রাসেলস, ঢাকা, মেক্সিকো সিটি, প্যারিস ও ম্যানিলা থেকে শুরু করে পরে মঙ্গোলিয়া, হাঙ্গেরি, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে হাই কমিশনার হিসেবে কাজ করেছি। এছাড়া ইউনেস্কোর নির্বাহী পর্ষদের সদস্য হিসেবেও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপ্রণালী খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূল্যায়ন তার সনদে লেখা আদর্শ বা জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য দিয়ে নয়, বরং সবচেয়ে কঠিন ও বিতর্কিত পরিস্থিতিতে তার আচরণ দেখে করতে হয়।

আজকের জাতিসংঘকে বাইরে থেকে এখনও আদর্শবাদী ও ন্যায়বিচারের প্রতীক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে স্পষ্ট হয়, এই প্রতিষ্ঠান তার প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্দেশ্য থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। আমার বিশ্বাস, যে বিশ্বব্যবস্থাকে সামনে রেখে এই সংস্থার জন্ম হয়েছিল, সেই বিশ্ব আর নেই। ফলে বর্তমান রূপে জাতিসংঘও আর কার্যকর নয়। এখন সময় এসেছে নতুন বাস্তবতার উপযোগী একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার।

সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের নিযুক্ত কমিশন গাজা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর নৃশংসতা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সরকারের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির দায়িত্বের কথাও বলা হয়েছে।

ইসরায়েল কীভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু যে প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যায় না, তা হলো কেন শুধু ইসরায়েলই এমন তদন্তের মুখোমুখি হলো? একই সময়ে সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা সুদানের মতো সংঘাতে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। অথচ সেসব ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিষদের একই ধরনের সক্রিয়তা দেখা যায়নি। তাহলে কি এক অঞ্চলের মানবিক দুর্ভোগ অন্য অঞ্চলের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ?

এই বৈষম্যের উত্তর লুকিয়ে আছে জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যেই। নিরাপত্তা পরিষদ এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শক্তির ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় আট দশক পরেও বিশ্বের নিরাপত্তা ও সংঘাতের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কয়েকটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের হাতেই কেন্দ্রীভূত। এশিয়া ও আফ্রিকার বাস্তবতা আজও সেই পুরোনো কাঠামোর বাইরে থেকে যায়।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর যথার্থই বলেছেন, ইউরোপের সমস্যা বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পায়, কিন্তু বিশ্বের অন্য অংশের সমস্যা একই গুরুত্ব পায় না। এই মন্তব্য বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে।

অনেকে যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে ইসরায়েলকে রক্ষা করে। তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিশন গঠিত হলো কীভাবে?

উত্তরটি সহজ। এই কমিশন নিরাপত্তা পরিষদ নয়, মানবাধিকার পরিষদ গঠন করেছে। সেখানে কোনো ভেটো নেই। সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। ৪৭ সদস্যের পরিষদে ২৪টি ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়, ৯টি দেশ বিরোধিতা করে এবং ১৪টি দেশ বিরত থাকে।

কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২১ সালের ওই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল পাকিস্তান, এমন একটি রাষ্ট্র যার বিরুদ্ধে বহু দশক ধরে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তাহলে যে দেশ নিজেই গুরুতর অভিযোগের মুখে, সে কীভাবে অন্য দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিচারক হয়ে ওঠে?

একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা গেছে যখন ইরানকে জাতিসংঘের সামাজিক উন্নয়ন কমিশনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। যে কমিশনের কাজ গণতন্ত্র, লিঙ্গসমতা, সহনশীলতা ও অহিংসার মতো মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করা। এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। অনেক সময় মনে হয়, অভিযুক্তরাই যেন বিচারকের আসনে বসে অন্যদের বিচার করছে।

বাস্তবতা হলো, বহু রাষ্ট্র গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক তদন্তের বাইরে থেকে যায়। আবার যেসব রাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য বা তাদের প্রত্যক্ষ সুরক্ষা পায়, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

ভারতের অভিজ্ঞতাও এই দ্বৈত মানদণ্ডের সাক্ষী। জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সেই গুরুত্ব কখনও পায়নি, যা অন্য অনেক বিষয়ে দেখা যায়। স্বাধীনতার পর আইনসম্মতভাবে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কাশ্মীর নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তে রাজনৈতিক অবস্থানই বহু সময় আন্তর্জাতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করেছে।

অনেকে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠানহীনতার চেয়ে ভালো। কিন্তু এই যুক্তি তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন সেই প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত কিছু দেশের বিরুদ্ধেই সক্রিয় হয় এবং অন্যদের ক্ষেত্রে নীরব থাকে। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার তখন আর নিরপেক্ষ থাকে না, বরং রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

গাজার তদন্ত কমিশনকে ঘিরে বিতর্কও সেই বৃহত্তর সমস্যারই অংশ। এমন একটি কাঠামো, যার ভিত্তি ১৯৪৫ সালের ক্ষমতার বাস্তবতায় নির্মিত, আজকের বহুমেরু বিশ্বের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ভেটো-বিহীন রাষ্ট্রগুলোকে সহজেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়, কিন্তু ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয় না।

এর অর্থ এই নয় যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হওয়া উচিত নয়। বরং বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত, তবে তা হতে হবে সবার জন্য একই মানদণ্ডে, একই নীতিতে এবং একই নিরপেক্ষতার সঙ্গে।

ভারত, যে নিজেও বহুবার এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, তার উচিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবিতে নেতৃত্ব দেওয়া। এমন একটি বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলার সময় এসেছে, যা নির্বাচিত কয়েকটি দেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে সমানভাবে জবাবদিহি করবে।

লেখক পরিচিতি: ড. গৌরী শঙ্কর গুপ্ত ১৯৮১ ব্যাচের ভারতীয় বিদেশ পরিষেবার (আইএফএস) একজন বিশিষ্ট সাবেক কূটনীতিক ও লেখক। তিনি হাঙ্গেরি, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং মঙ্গোলিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, পাশাপাশি ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে ভারতের হাই কমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন।