ভারতের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবার প্রশ্ন তুলেছে, এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কি আগের মতোই অটুট রয়েছে?
কলকাতায় বিধানসভা নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়ে এক বৈঠককে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে রাজ্য প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিকের কথোপকথনের ধরন নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ উঠেছে, বৈঠকে রাজ্যের ডিজি (ল অ্যান্ড অর্ডার) বিনীত গোয়েল এবং মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য-সহ কয়েকজন কর্মকর্তার প্রতি তিনি কঠোর ও প্রায় হুমকিসূচক ভাষায় কথা বলেছেন।
Advertisement
একটি প্রশাসনিক বৈঠকে দৃঢ়তা থাকা স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বই হল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া। কিন্তু সেই নির্দেশ যদি এমনভাবে দেওয়া হয় যাতে রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনে অপমান বা ভীতির অনুভূতি তৈরি হয়, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ নির্বাচন কমিশনের শক্তি শুধু আইনি ক্ষমতায় নয়, তার নৈতিক কর্তৃত্বেও নিহিত।
Advertisement
এই ঘটনার পর এসপ্ল্যানেডে নিজের ধরনা কর্মসূচি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। এই অভিযোগ নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বেড়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তাদের সমস্ত পদক্ষেপই আইন ও বিধি মেনে নেওয়া হয়। ভোটার তালিকা সংশোধন করা একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এতে ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগও থাকে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক পক্ষপাতের চোখে দেখা শুরু হয়। তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভোটার তালিকার পর এবার ইভিএম বা গণনা প্রক্রিয়ায় কারচুপির চেষ্টা হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, গণনার দিন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই সব আসনের ফলাফল আগে দেখানো হতে পারে যেখানে বিরোধী দল এগিয়ে থাকবে, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। যদিও এই ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি, তবু এই আশঙ্কা প্রকাশ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি বিশ্বাসেরও প্রশ্ন। ভোটাররা বিশ্বাস করেন যে তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে এবং তার প্রতিফলনই ফলাফলে দেখা যাবে। সেই বিশ্বাস যদি নষ্ট হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কমিশনকে শুধু নিরপেক্ষ থাকতে হবে তা-ই নয়, তাদের কাজকর্মে সেই নিরপেক্ষতার স্পষ্ট প্রতিফলনও থাকতে হবে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ভাষা ও আচরণ— সব ক্ষেত্রেই এমন সতর্কতা দরকার যাতে কোনও রাজনৈতিক পক্ষই পক্ষপাতের অভিযোগ তুলতে না পারে।
ভারতের গণতন্ত্র বহু কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। সেই ইতিহাস দেখায় যে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে। নির্বাচন কমিশনও সেই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের শক্তি কেবল আইনের ধারা বা সাংবিধানিক মর্যাদায় নয়, তা নির্ভর করে মানুষের বিশ্বাসের উপর।
এই কারণেই বর্তমান বিতর্ককে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক তর্ক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা— গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষা করা আজ আগের যে-কোনও সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের উচিত সেই আস্থা পুনর্গঠনের জন্য আরও স্বচ্ছ, সংযত এবং সংবেদনশীল ভূমিকা নেওয়া। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে বিশ্বাসের উপরই।
Advertisement



