• facebook
  • twitter
Friday, 27 February, 2026

শুল্ক-রাজনীতি

ট্রাম্পের কূটনীতি প্রায়শই ব্যক্তিনির্ভর ও আকস্মিক। তিনি চাপ সৃষ্টি করে দরকষাকষিতে বাড়তি সুবিধা আদায় করতে অভ্যস্ত।

বিশ্ব বাণিজ্যের ময়দানে আবার অস্থিরতার সুর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বিভিন্ন দেশকে সতর্ক করে বলেছেন, বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কেউ যেন তাঁর সঙ্গে ‘খেলা’ না করে। এর মধ্যেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক আরোপ সংক্রান্ত এক সিদ্ধান্তে প্রশাসনের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, হোয়াইট হাউস কি আইনগত সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে অন্য উপায়ে আরও কড়া শুল্কনীতি গ্রহণের পথ খুঁজবে?

এই অনিশ্চয়তার আবহেই বহু দেশ নিজেদের অবস্থান নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি অনুমোদনের প্রক্রিয়া সাময়িক স্থগিত রেখেছে। ভারতও ওয়াশিংটনে নির্ধারিত বাণিজ্য বৈঠক পিছিয়ে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ দিল্লিও বুঝতে পারছে, বিষয়টি কেবল অর্থনীতির নয়— রাজনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Advertisement

প্রশ্ন হল, ভারতের করণীয় কী? যদি মনে করা হয়ে থাকে যে ট্রাম্পের শুল্ক-আক্রমণ কংগ্রেসে সর্বসম্মত সমর্থন পায়নি, তা হলে হয়তো মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষা করা যেত। আবার যদি মনে হয়ে থাকে, দীর্ঘসূত্রিতা ভারতের স্বার্থে নয়, তবে যে পথে হাঁটা শুরু হয়েছে, তা দৃঢ়তার সঙ্গেই এগোনো উচিত। মাঝপথে দ্বিধা বা দোদুল্যমানতা আন্তর্জাতিক পরিসরে আস্থাহানির কারণ হতে পারে।

Advertisement

বিদেশনীতি কখনও আবেগের জায়গা নয়; এটি স্বার্থের নিরিখে নির্মিত বাস্তববাদী নীতি। একটি অ-সুপারপাওয়ার দেশের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমত, জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা; দ্বিতীয়ত, নীতিগত পূর্বানুমান। হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন বা বারবার কৌশল বদল সহযোগীদের মনে সংশয় তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা এক অমূল্য সম্পদ।

সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখেছি, ট্রাম্প ভারতীয় অর্থনীতিকে ‘ডেড ইকোনমি’ বলার পর মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিয়েছিল দিল্লি। আবার বাণিজ্যচুক্তির প্রস্তাব আসতেই সুর নরম হয়েছে। যদি আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিবাসন-বিরোধী আবেগ উস্কে দেয়, তখন ভারতের অবস্থান কী হবে? আবার কি পুরনো সঙ্গীদের দিকে ঝুঁকবে? আর তারা কি সহজে বিশ্বাস করবে?

নরেন্দ্র মোদী সরকারের তরফে মার্কিন চুক্তিকে ‘সেরা’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদি সত্যিই তা ভারতের পক্ষে অনুকূল হয়, তবে মার্কিন আদালতের রায়ে তার মৌলিক চরিত্র বদলে যাওয়ার কথা নয়। আর যদি চুক্তির শর্তাবলীতে এমন কিছু থেকে থাকে, যা আদালতের রায়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে শুরুতেই তার যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি? এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর হলেও এড়ানো যায় না।

অবশ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। বিরোধী দল বা বিভিন্ন সংগঠনের আপত্তি থাকলে সরকার তা খতিয়ে দেখতেই পারে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আগে কি পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা হয়েছিল? সংসদে বিস্তৃত আলোচনা, শিল্পমহল ও কৃষিক্ষেত্রের মতামত, রাজ্যগুলির উদ্বেগ— এসব কি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল? নাকি দ্রুত সাফল্যের ঘোষণাই হয়ে উঠেছিল প্রধান লক্ষ্য?

ভারতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ; অন্যদিকে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রশ্ন। শুল্ক কমানোর বিনিময়ে যদি অভ্যন্তরীণ উৎপাদকদের ক্ষতি হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হবে। আবার অতিরিক্ত রক্ষণশীলতাও রপ্তানির সম্ভাবনাকে সীমিত করতে পারে। তাই প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত।

ট্রাম্পের কূটনীতি প্রায়শই ব্যক্তিনির্ভর ও আকস্মিক। তিনি চাপ সৃষ্টি করে দরকষাকষিতে বাড়তি সুবিধা আদায় করতে অভ্যস্ত। সেই কৌশলের মোকাবিলায় আবেগ নয়, প্রয়োজন ঠান্ডা মাথার কূটনৈতিক দৃঢ়তা। প্রকাশ্যে বাকযুদ্ধ বা নাটকীয় প্রতিক্রিয়া অনেক সময় পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। ভারতের উচিত আলোচনার দরজা খোলা রেখে, প্রয়োজনে বিকল্প বাণিজ্য অংশীদারিত্ব জোরদার করা— কিন্তু তা যেন হঠাৎ দিকবদল বলে মনে না হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের বিদেশনীতি যেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল না হয়। সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও স্পষ্ট অগ্রাধিকার— এই তিন স্তম্ভেই গড়ে উঠতে পারে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান কেবল শক্তির জোরে নয়, স্থিরতা ও নির্ভরযোগ্যতার মাধ্যমেও অর্জিত হয়। এই মুহূর্তে প্রয়োজন আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া নয়, বিচক্ষণ পুনর্মূল্যায়ন। ট্রাম্প-পর্ব হয়তো একদিন শেষ হবে, কিন্তু ভারতের কূটনৈতিক সুনাম ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দীর্ঘস্থায়ী। তাই স্বল্পমেয়াদি চাপের কাছে নতি স্বীকার নয়, আবার অহেতুক দম্ভও নয়— জাতীয় স্বার্থে সুস্পষ্ট, পূর্বানুমেয় ও দায়িত্বশীল নীতিই হোক ভারতের পথপ্রদর্শক।

Advertisement