স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ মানবসেবার আদর্শেই ‘ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ’ গড়ে তোলেন

Written by SNS June 14, 2024 6:58 pm

স্বপনকুমার মণ্ডল

আধুনিক শিক্ষার সোপানে ধর্মীয় চেতনা নানাবিধ জিজ্ঞাসার সামনে এসে পড়ে। শুধু তাই নয়, সেখানে ভক্তি বনাম যুক্তির দ্বন্দ্বই অনিবার্য হয়ে ওঠে না, আস্থা-অনাস্থার দ্বৈরথও সন্দেহ ও অশ্রদ্ধার পথকে সুগম করে তোলে। সেখানে রক্ষণশীল সমাজেও আশ্রম-মঠ ও মিশনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলাটাই স্বাভাবিকতা লাভ করে। অন্যদিকে আত্মত্যাগের সোপানে সেবার চেতনাই যেখানে পরিষেবায় আত্মগোপন করে। সেখানে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে সেবানিকেতনের বাসিন্দা হয়ে ওঠাটা আকর্ষণীয় না হওয়াটাই দস্তুর। সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি ভক্তির নেপথ্যে শুধু ধর্মীয় পরিসরই প্রাধান্য লাভ করে না, সেই সঙ্গে তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমাও শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। সেক্ষেত্রে প্রদর্শিত ভক্তিতেই সেই শ্রদ্ধাবোধ অন্তর্হিত হয়। তার সহযাত্রী হয়ে ওঠার বিষয়টি আপনাতেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। সেদিক থেকে ধর্মভীরু গুরুবাদী জনমানসে ধর্মীয় পরিসর যতই আবেদনক্ষম হোক না কেন, তাতে সংগঠন গড়ে তুলে ত্যাগ ও সেবার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে জনসমাদর লাভ করাটা সহজসাধ্য নয়। রাজনৈতিক বৃত্তে ক্ষমতায়নের স্বার্থে যেখানে সংগঠনের সক্রিয় অভিমুখ অনেক বেশি আকর্ষক হয়ে ওঠে, সেখানে পরাধীন দেশে শুধুমাত্র ত্যাগের সোপানে জনসেবার নিঃস্বার্থ পরিসরে মহত্ত্বের আদর্শ প্রদর্শিত হলেও সাধারণ্যে তার আবেদন অপ্রাপ্তিবোধে ব্রাত্য হয়ে পড়ে।

একদিকে পরাধীন দেশে রাজনৈতিকভাবে যেখানে মানুষের স্বাধিকার অর্জনের পথ সক্রিয় হয়ে ওঠে, সেখানে ধর্মীয় চেতনায় আধ্যাত্মিক পথে সাংগঠনিকভাবে সেবাশ্রমের ধারণাটি প্রশ্নপীড়িত মনে হয়। মানুষের বেঁচে থাকার বাস্তবতাই সেক্ষেত্রে মুখর হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে আবিশ্ব সাধারণের অধিকারবোধ রাজনৈতিক চেতনায় প্রাণিত হওয়ায় ধর্মীয় বাঁধন স্বাভাবিকভাবেই শিখিল হয়ে পড়ে। সেখানে চৈতন্যদেবের সময় থেকে ধর্মীয় চেতনাতেও ক্রমশ আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বাস্তবতার অভিমুখ প্রকট হয়ে ওঠে। উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতিজাত আধুনিকতার সোপানে ধর্মীয় পরিসরে শিক্ষার আবেদন অধিক গুরুত্ব লাভ করে। খ্রিষ্টধর্মের বিস্তারে এদেশে মিশনারিদের শিক্ষা প্রসরের অভিমুখটি সেদিক থেকে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তার প্রভাব নবগঠিত ব্রাহ্মসমাজেও লক্ষণীয়। হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দ তো ধর্মীয় চেতনাকে মানুষ গড়ার শিক্ষায় সামিল করেছেন।

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তাতেও ধর্মীয় পরিসরটি অস্বীকার করা যায় না। তাঁর ১৯০১-এ শান্তিনিকেতনে গড়ে তোলা ‘ব্রহ্মাচর্যাশ্রম’ থেকে ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ তারই পরিচয়বাহী। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিসরেই শিক্ষার মুখে মানুষের বেঁচে থাকার মান ও উন্নত জীবনের হাতছানি যেখানে তীব্রভাবে আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে, সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মীয় সংগঠনের ত‍্যাগ ও সেবার আদর্শ সেভাবে আকর্ষক না হওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া উনিশ শতকে আধুনিক শিক্ষার সোপানে ধর্মীয় পরিসর উচ্চকিত হওযায় সেই শিক্ষা কতটা মুক্ত চিন্তা ও জীবনের সহায়ক, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। তবে শিক্ষার বুনিয়াদি চেতনায় মুক্ত চিন্তার আবহ যে তখনও বিষিয়ে যায়নি, তা হিন্দু স্কুল থেকে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের স্বচ্ছ ভাবমূর্তিতেই প্রতীয়মান। অবশ্য তাই বিশ শতকে ধর্মীয় চেতনায় গড়ে তোলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উগ্র মৌলবাদের আঁতুড় ঘরে পরিণত করার প্রয়াস স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ককে আমন্ত্রণ জানায়। সেই পরিসরে রাজনৈতিক সচেতনতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে জনমানসকে উদ্দীপ্ত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্থিরতার পরিসরে মূল্যবোধের অবক্ষয় ত্বরান্বিত হয়ে যেমন অনিশ্চয়তা ও হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে, তেমনই তার মধ্যেই ১৯১৭-এর রুশ বিপ্লবোত্তর পরিসরে সাম্যবাদের সোপানে সাধারণের অধিকারবোধে ধর্মীয় পরিসর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সেই ১৯১৭-তেই স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ(১৮৯৬-১৯৪১) তাঁর ধর্মীয় সংগঠন গড়ে তোলেন। যা ১৯২৩-এ ‘ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। সেদিক থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের পর এরূপ ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে সেবার আদর্শ দিয়ে দেশ বা জাতিগঠনের প্রয়াস সহজসাধ্য ছিল না। অথচ স্বামী প্রণবানন্দ তাঁর সংগঠনটিকে স্বকীয় আদর্শে যেভাবে সাধারণ্যে আবেদনক্ষম করে তুলেছেন, তা শুধু ধর্মীয় নামাবলিতে কখনওই সম্ভব ছিল না। নানা প্রতিকূল আবহের মধ্যে দিয়ে তিনি যেভাবে সংগঠনের ভিত গড়ে তুলেছেন, তাঁর অবর্তমানে তার স্থিতিই সেকথা প্রত্যয়সিদ্ধ করে ভোলে।

আসলে প্রণবানন্দ প্রথম থেকেই তাঁর ধর্মীয় সংগঠনটির মানবিক অভিমুখটি শুধু স্পষ্ট করে তোলেননি, তার একক লক্ষ্যকেও স্থিরবদ্ধ করে দেন। সেখানে তাঁর সঙ্ঘকে ‘দ্বিতীয় বুদ্ধদেবের সঙ্ঘ’ বললেও ‘বুদ্ধ শঙ্কর চৈতন্যের মতো নূতন আদর্শ ও তপঃশক্তিতে’ ‘সমগ্র দেশ ও জাতিকে’ ‘সঞ্জীবিত করতে’ চাওয়ার কথা স্মরণে সক্রিয় করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর লক্ষ্য যে দেশসেবা, তা তিনি ‘জাতিগঠন’-এর বার্তায় বারবার তুলে ধরেছেন। স্বামী প্রণবানন্দের কল্যাণকামী জনহৈতেষী চেতনায় আসলে ধর্মীয় আধারে মানবসেবার বর্তিকাকেই প্রজ্জ্বলিত করতে চেয়েছেন। এজন্য তাঁর লক্ষ্যে ধর্মীয় শরীরের স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথমেই চিকিৎসার প্রয়োজনবোধ করেন। সন্ন্যাস নেওয়ার পূর্বে বিনোদ ব্রহ্মাচারী রূপে ১৯১৩-তে গয়ায় পাণ্ডা-পুরোহিতদের অত্যাচার-অনাচারে শোষিত-শাসিত তীর্থযাত্রীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে তিনি তীর্থ-সংস্কারের ব্রত নিয়ে একক উদোগে যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন, তা ছিল রীতিমতো ধর্মধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানো। তাঁর সেই সফলকাম প্রয়াস আজ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। অন্যদিকে সন্ন্যাসী জীবনে সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি যেভাবে সেবার আদর্শকে দেশসেবায় সামিল করেছেন, তার মধ্যেই রয়ে গেছে তাঁর প্রগাঢ় মানবিক চেতনা ও সুগভীর দূরদৃষ্টি। যে-কারণে শিক্ষা বিস্তারে বা অধ্যাত্মিকতার উৎকর্ষের পথে অন্যান্য সংগঠনের মতো সফলকাম না হয়েও শুধুমাত্র সেবার আদর্শে তাঁর সঙ্ঘকে সাধারণ্যে আবেদনক্ষম করে তুলতে পেরেছেন তিনি। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ধর্মীয় পরিসরে আধ্যাত্মিক জীবনের উৎকর্ষমুখর প্রকৃতি আপনাতেই সজীবতা লাভ করে।

শুধু তাই নয়, দূরূহ হলেও আধ্যাত্মিকতার পথে জীবন ধন্য করার বাতিক অতীব সক্রিয়। সেখানে উন্নত জীবনের হাতছানি স্বাভাবিক মনে হয়। অরবিন্দ ঘোষের মতো মনীষীর দেশপ্রেমী বিপ্লবীর পথ ছেড়ে পণ্ডিচেরিতে আধ্যাত্মিক জগতের সোপান গড়ে তুলে যেভাবে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তা অচিরেই ধর্মীয় আবর্তে নবদিগন্তের সূচনা করেছিল। অথচ সেই পণ্ডিচেরির প্রভাবও রুশ বিপ্লবোত্তর পরিসরে প্রশ্নের সামনে চলে আসে। রাজনৈতিক আবর্তে মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রাথমিক চাহিদায় রক্ত-মাংসের বাস্তব জীবনের পাশে পণ্ডিচেরির আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতিতুলনার অবকাশ আপনাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে ‘আত্মশক্তি’, ‘নবশক্তি’ প্রভৃতি পত্রিকায় এ নিয়ে মস্কো বনাম পণ্ডিচেরির দ্বৈরথ স্বাভাবিকভাবেই নতুন দিশা দান করে। রসসাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর তারুণ্যের সহজাত স্পর্ধায় তর্কবিতর্কসূত্রে লেখা প্রবন্ধের মাধ্যমে সেসময়ে রুশ বিপ্লবের সাফল্যের দিকটি আলোকিত করেছেন । তাঁর ‘আজ এবং আগামীকাল’ (১৯২৯)-এর শোরগোল ফেলে দেওয়া প্রবন্ধগুলি সেই সময়ের দলিল হয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, শিবরামের ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’ (১৯৪৩) বইটি যেই জনপ্রিয়তার স্বাক্ষরবাহী। সেই পরিসরে ধর্মীয় সংগঠনের প্রতি অবিশ্বাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তার পরিচয় শিবরামের প্রবন্ধগুলিতে বিদ্যমান। ‘সুপারম্যানিয়া’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: ‘সেকালের মহাপুরুষেরা সঙ্ঘ, মঠ প্রভৃতি গড়তেন, একালের মহাত্মারা গড়েন আশ্রম, আড্ডা, আসোসিয়েশন ইত্যাদি। নানা আকারে ও প্রকারে বিচিত্র তাঁদের এই আশ্রম-রচনার মূলে কী ? নানান তত্ত্বকধার আড়ালে—নামান্তরে আর রূপান্তরে—সেই মৌলিক ক্ষুধা। স্রেফ্ ক্যানিবল-ইনস্টিঙ্কট। শিকারের সন্ধানে বাইরে না গিয়ে আশ্রম-মৃগয়া করার সুপারম্যানুভার ! ক্যানিবল মানুষকে উদরসাৎ করে, সুপারম্যান করেন আত্মসাৎ।’ সেক্ষেত্রে শিবরামের কথায় ‘সঙ্ঘ মানেই সাঙ্ঘাতিক’ হয়ে ওঠে। আসলে রুশ বিপ্লবোত্তর সাম্যবাদী চেতনার আলোয় ধর্মীয় সংস্কারাচ্ছন্ন পরিসরটি নানাভাবে বিতর্কের অবকাশ তৈরি করে। সেখানে ধর্মের আত্মিক উন্নতির চেয়ে সাধারণ্যে আর্থিক উন্নতির সোপানটি আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। তার ফলে সাধারণ মানুষের আত্মগত অস্থিত্ব-সংকটের মধ্যে আধ্যাত্মিক উন্নত জীবনের হাতছানি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শ্রীঅরবিন্দের পণ্ডিচেরির আশ্রম স্থানিক পরিসরেই আলো বিস্তার করলেও তার পরিসর ছড়িয়ে না পড়াটা সেক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়। অথচ সেই প্রতিকূল আবহের মধ্যেই স্বামী প্রণবানন্দের সঙ্ঘ শুধুমাত্র সেবার মাধ্যমে আত্মপ্রতিষ্ঠাই লাভ করেনি, ছড়িয়ে পড়েছে তীর্থক্ষেত্র থেকে আমজনতার সঙ্গমক্ষেত্রে।

একালে সেবার বনেদি চেতনায় সমাজসেবার বিষয়টি বহুচর্চিত । ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রকট প্রভাবে যেখানে সমাজের ভূমিকা ক্রমে অস্তমিত সূর্যের মতো নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে, সেখানে তার সেবার আনুকূল্য প্রদানের বিষয়টি আপনাতেই ভাবিয়ে তোলে। শুধু তাই নয়, সেক্ষেত্রে ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজমানসের বিচ্ছিন্ন প্রকৃতিতে সেবার চেতনাই যেখানে পরিষেবার অন্তরালে ব্রাত্য হয়ে রয়েছে, সেখানে সমাজসেবার আভিজাত্য তার আধারেই ধোঁয়াশা তৈরি করে। তাতে গালভরা শব্দাড়ম্ভরের মতো তার ব্যতিক্রমী আভিজাত্য সমাজমানসকে সেভাবে উদ্দীপ্ত করে না। কেননা তার সেবার প্রকৃতিটি সমাজের মানবিক দায় অপেক্ষা সামজিক কাঠামো বজিয়ে রাখার মধ্যে সজীবতা লাভ করে। সমাজের যেকোনো কাজে সামিল হলেই বা সমাজের অস্তিত্ব নানাভাবে বিকাশে সক্রিয় রাখলেই সমাজসেবার পরিসরটি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, সেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিপদে-আপদে পাশে থাকার মধ্যেও সমাজসেবার খ্যাতি অনায়াসলব্ধ। সেক্ষেত্রে আত্মপরিচয়ের সোপানে সমাজসেবীর আত্ম-সংকট মোচনের ক্ষেত্রে সমাজকর্মীর পরিচয়টি লাগসই হয়ে ওঠে। তাতে অবশ্য সেবকের স্থলে কর্মীর উৎকর্ষ বৃদ্ধি পেলেও সেবার সর্বজনীন আবেদনের দৈন্য তীব্র মনে হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেবী চৌধুরাণী'(১৮৮৪) উপন্যাসের শেষে ‘কাজ’ ও ‘কাম’-এর পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলেছেন। কামের ব্যক্তিগত পরিসর কাজে সর্বজনীনতা লাভ করে। সেখানে নিঃস্বার্থভাবে আত্মীয়তাবোধে সমাজের সর্বজনীন সেবার মানসিকতার বড়ই অভাব। আসলে যেখানে মানুষের আত্মিক অস্তিত্বই বিপন্ন, সেখানে আত্মীয়তাবোধের অন্তরায স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

স্বাভাবিকভাবেই তাতে সেবার মানসিকতাই উবে যায়। সেদিক থেকে স্বামী প্রণবানন্দ মানুষের আত্মিক উন্নতির সোপানে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির কথাই শুধু বলেননি, সেইসঙ্গে অন্তস্থিত সত্তার জাগরণের উপরেও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর সঙ্ঘে সকলের অবাধ আশ্রয়। এভাবে দীন-হীন অসহায় আর্ত-পীড়িত মানুষের আশ্রয়ে তিনি যেমন তাঁর সঙ্ঘে সকলের জন্য সেবার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তেমনই ত্যাগ ও সেবার আদর্শে সেবক তৈরিতেও আত্মনিয়োগ করেছেন। তার ফলে তাঁর অবর্তমানে সঙ্ঘে সেবকের টান পড়েনি, সেবায় ভাটা আসেনি। সংগঠিত সঙ্ঘশক্তির আদর্শকে যেভাবে স্বামী প্রণবানন্দ গড়ে তুলতে চেয়েছেন, তাতে ধর্মীয় চেতনা আধারিত হলেও তার অভিমুখ যে মানবসেবা, তা সঙ্ঘের বনেদি অস্তিত্বের মধ্যেই প্রতীয়মান । তাঁর নেতৃত্বের অভাবেও সঙ্ঘের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে ওঠেনি। সেখানে শুধু সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির বৃহৎ শক্তির সোপানটি উন্মোচিত হয়নি, সেইসঙ্গে সেবাশক্তির মহত্ত্বও প্রস্ফুটিত হয়েছে। সময়ের খরায় সমাজবিচ্ছিন্ন ভোগবাদে আক্রান্ত জনমানসে পরিষেবারাজের আভিজাত্য ও একাধিপত্যের আগ্রাসী ক্ষুধায় বিপন্ন নিঃসঙ্গ অসহায় মানবাত্মার প্রাণশক্তির জাগরণে সেবার সর্বজনীন অবিস্মরণীয় পথটির কোনো বিকল্প নেই। আধুনিকতার সোপান মানুষের জন্য মানুষের মানবিক অভিমুখে তাই ‘ভারত সেবাশ্রম সঙ্গ’-এর ভূমিকা স্বভূমিতেই প্রতিভাত। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নগরলক্ষ্মী’র ছায়ায় শুধু প্রাণিত হওয়ার অবকাশ মেলে না, বিকল্প জীবনের পরম পরশের হাতছানিতে সামিল হওয়ার আমন্ত্রণ অসে। সে আমন্ত্রণ আত্মিক বন্ধনের, চিরন্তন মানবধর্মের, ভাবা যায়!