সৈয়দ হাসমত জালাল: সুরের জগৎ আজ যেন একটু নিঃশব্দ। এক কোমল, স্বচ্ছ, বিনয়ী কণ্ঠস্বর চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। সুমন কল্যাণপুর আর নেই। গত ৩১ মে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। ৮৯ বছরের দীর্ঘ জীবনের শেষে তিনি পাড়ি দিলেন সেই অনন্তের দিকে, যেখানে সুর আর নীরবতার মধ্যে কোনো ভেদরেখা থাকে না। রেখে গেলেন অসংখ্য গান, স্মৃতি, আর এক অনন্য মাধুর্যের ঐতিহ্য— যা আজও শ্রোতার হৃদয়ে নিবিড়ভাবে বেজে চলে।
ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে সুমন কল্যাণপুরের নাম উচ্চারিত হয় এক বিশেষ আবেগে। তিনি ছিলেন না প্রচারের আলোয় ঝলমলে কোনো তারকা, ছিলেন না প্রতিযোগিতার মঞ্চের আক্রমণাত্মক উপস্থিতি। তিনি ছিলেন নীরব, সংযত, কিন্তু গভীর— একটি নদীর মতো, যার স্রোত কখনও উচ্ছ্বসিত নয়, কিন্তু চিরকাল প্রবহমান।
১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি সুমন কল্যাণপুরের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায়। তাঁর পিতা শঙ্কর রাও হেমাডি ছিলেন কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোর শহরের এক বনেদি পরিবারের মানুষ। কর্ণাটকের উদুপি জেলার কুন্দপুর তালুকের একটা গ্রাম হল হেমাডি। তিনি ছিলেন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার এক পদস্থ আধিকারিক এবং চাকরিসূত্রে দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন। ১৯৪৩ সালে তাঁরা চলে আসেন বম্বেতে। সেখানেই বেড়ে ওঠা সুমনের। সুমন খুব অল্প বয়স থেকেই সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত স্বচ্ছতা, এক অনাবিল সজীবতা, যা শ্রোতাকে আপন করে নিত। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজের গানের ভুবন— যেখানে ছিল মাধুর্য, সংযম, আর নিখুঁত উচ্চারণের এক অপূর্ব সমন্বয়।
ষাট ও সত্তরের দশকে হিন্দি চলচ্চিত্র সঙ্গীতের যে সোনালি যুগ, সেখানে সুমন কল্যাণপুর নিজের একটি স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করেছিলেন। যদিও সেই সময়ে সুরের আকাশ ভরা ছিল মহাতারকাদের দীপ্তিতে, তবু তিনি নিজের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিলেন নিঃশব্দে। তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে প্রায়শই তুলনা করা হত লতা মঙ্গেশকরের। এই তুলনা কখনও তাঁকে আড়াল করেছে, আবার কখনও তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু তিনি নিজে কখনও এই তুলনায় বিচলিত হননি। বরং তিনি সবসময় লতাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে ছিল মহম্মদ রফির সঙ্গে। লতা মঙ্গেশকর ও রফির মধ্যে যখন রয়্যালটি সংক্রান্ত মতভেদ চরমে পৌঁছয় এবং তাঁরা একসঙ্গে গান গাওয়া বন্ধ করেন, তখন চলচ্চিত্র জগৎ যেন কিছুটা সঙ্কটে পড়ে। সেই সময়ই সুমন কল্যাণপুর হয়ে ওঠেন সেই শূন্যস্থানের এক মধুর তারকা। তাঁর কণ্ঠের সাদৃশ্য, তাঁর গায়কির কোমলতা— সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন রফির অন্যতম প্রিয় সঙ্গীশিল্পী। ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’ কিংবা ‘না না করতে প্যায়ার’— এইসব গান আজও শ্রোতার মনে অমলিন।
তবে তাঁর সাফল্যের গল্প কেবলই কোনো ‘বিকল্প’ হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি এক আত্মনির্ভর শিল্পীর ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার গল্প। শচীন দেব বর্মণের সুরে ‘না তুম হমে জানো’— এই গানটি তাঁর জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভেবেছিলেন এটি লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ। কিন্তু আসলে সেটি ছিল সুমনেরই মধুর সুরের স্বাক্ষর। এই ঘটনাই যেন তাঁর শিল্পীজীবনের এক প্রতীক— তিনি ছিলেন, কিন্তু তাঁকে অনেক সময় চিনতে দেরি হয়েছে।
হিন্দি গানের পাশাপাশি বাংলা গানেও তাঁর অবদান গভীর। ‘রঙের বাসরে যদি’, ‘মনে করো আমি নেই’, ‘দূরাশার বালুচরে’, ‘কাঁদে কেন মন’, ‘দূরে থেকো না, আরও আরও কাছে এসো’— এইসব গান বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে’ কোনদিনই ভোলা যাবে না। তাঁর উচ্চারণে ছিল এক অনন্য স্বচ্ছতা, আর আবেগে ছিল সংযমের সৌন্দর্য। বাংলা গানের জগতে তিনি কখনও বহিরাগত ছিলেন না— বরং হয়ে উঠেছিলেন এক আত্মীয়।
সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠে ছিল না কোনো অতিরঞ্জন, ছিল না নাটকীয়তার বাড়াবাড়ি। তাঁর গানে ছিল এক অন্তর্মুখী আবেগ—যা শ্রোতাকে নিজের ভেতরে টেনে নেয়। তিনি কখনও গানের উপর নিজের উপস্থিতি চাপিয়ে দেননি; বরং গানকেই সামনে এনে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। এই বিনয়ই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত ও নিরহংকারী। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও তিনি কখনও অহংকারে ভেসে যাননি। সহশিল্পীদের প্রতি তাঁর আচরণ ছিল সৌজন্যময় ও আন্তরিক।
লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতার আড়ালে যে মানবিকতা থাকে, সুমন কল্যাণপুর তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।আজ যখন তিনি নেই, তখন তাঁর গানগুলিই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবন্ত উপস্থিতি। প্রতিটি সুর, প্রতিটি শব্দ যেন তাঁর স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তিনি যেন চলে গিয়েও থেকে গেছেন— আকাশে ভেসে থাকা এক মৃদু সুরের মতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নাম মুছে যায়, অনেক কণ্ঠ হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। কিন্তু কিছু কণ্ঠ থাকে— নিঃশব্দে, নিরন্তর।
সুমন কল্যাণপুর সেইরকমই এক কণ্ঠ, যা কখনও উচ্চকিত নয়, কিন্তু চিরকাল বেজে চলে হৃদয়ের গভীরে।
তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীত জগতের এক অধ্যায়ের অবসান হল বটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আলো নিভে যায়নি। আজ তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা কেবল শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক কৃতজ্ঞতা— এক শিল্পীর প্রতি, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নীরব থেকেও গভীরভাবে কথা বলা যায়, কীভাবে বিনয়ী থেকেও অমর হওয়া যায়।
সুমন কল্যাণপুর নেই, কিন্তু তাঁর সুর আছে। সেই সুরের সৌন্দর্যই তাঁর প্রকৃত পরিচয়, তাঁর অমরত্ব।
Advertisement