রাতের আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে আমাদের মনে কখনও না কখনও এই প্রশ্ন অবশ্যই জেগেছে যে, কতকাল ধরে তারা এভাবে জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে? মধুসূদন দত্তর ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?’ কথাটা কি ধ্রুব সত্যি? জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুমান, কোনও নক্ষত্র ১০ লক্ষ কোটি বছর ধরে স্থায়ী হয়, আবার কোনও নক্ষত্র মাত্র ১০ লক্ষ বছর পরেই তার জীবন শেষ করে! একটি নক্ষত্রের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি মহাবিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘটনা। আর এই অপার রহস্যের বশবর্তী হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সর্বদা হিসাব কষে নজর রেখে চলেছেন।
আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ব্যাস প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার আলোকবর্ষ। এই বিশাল গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার কোটি নক্ষত্র রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক নক্ষত্র থাকার পরও গ্যালাক্সির প্রায় ৯৯.৯% অংশই ফাঁকা! অর্থাৎ, সেই বিশাল অঞ্চলে কোনও নক্ষত্র নেই। শুধুমাত্র আকাশগঙ্গাই নয়, মহাবিশ্বেরও অধিকাংশ অংশই প্রায় শূন্যের মতো ফাঁকা। তবে এই ফাঁকা জায়গাকে পুরোপুরি শূন্য বলা যায় না। সেখানে খুব অল্প পরিমাণে গ্যাস ও ধূলিকণা ছড়িয়ে রয়েছে। নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী এই গ্যাস ও ধূলিকণায় ভরা অতি পাতলা মাধ্যমকে বলা হয় আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম। এই মাধ্যমের প্রায় ৯৯% গ্যাস এবং মাত্র ১% আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণা দিয়ে তৈরি।
আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস অনেক হালকা এবং তাপমাত্রা পরমশূণ্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের ভৌত বিন্যাসও সুষম নয়। এরা মহাকাশে বিক্ষিপ্তভাবে বিন্যস্ত। কালক্রমে, আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণা এবং গ্যাসের সমন্বয়ে হয় আনবিক মেঘ। গতিশীল এই মেঘখণ্ডের ভর অনেক সময় আমাদের সূর্যের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ পর্যন্ত ভারী হতে পারে। এভাবে ঘন থেকে ঘনতর হতে হতে গ্যাস বা ধূলিমেঘ যখন ক্রান্তি ভর অর্জন করে তখন মেঘের ঘনতর অংশগুলো অভিকর্ষ বলের প্রভাবে আরও সংকুচিত হতে থাকে। এই সংকোচন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছায় যখন মেঘের ঘনতর অংশগুলো একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং আরো ঘন অঞ্চল গঠন করে। এই প্রক্রিয়া চলে প্রায় কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে। পরিশেষে এই গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল মেঘ মহাকর্ষের কারণে সংকুচিত হয়ে যখন একটি উত্তপ্ত, ঘন বস্তু তৈরি করে তাকে প্রোটোস্টার বা নবজাত নক্ষত্র বলে। এই সময় প্রোটোস্টারের চারপাশে গ্যাস ও ধূলিকণার একটি চাকতির মতো অঞ্চল তৈরি হতে পারে, যাকে অ্যাক্রিশন ডিস্ক বলা হয়। এই ডিস্ক থেকে আরও পদার্থ প্রোটোস্টারের মধ্যে জমা হতে থাকে। ফলে প্রোটোস্টারের ভর ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
২০২১ সালে ২৫ ডিসেম্বর নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ও কানাডার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা একসঙ্গে হাত মিলিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলে বিষুবরেখার কাছে ফরাসি গায়ানার কুরু শহরে গায়ানা মহাকাশ কেন্দ্র থেকে ফরাসি বাণিজ্যিক রকেট উৎক্ষেপণ কোম্পানি আরিয়ানেস্পাসের তত্ত্বাবধানে একটি ‘আরিয়ান ৫’ রকেটের মাধ্যমে অতি শক্তিশালী ‘জেমস ওয়েব’ টেলিস্কোপ সফলভাবে মহাকাশে স্থাপন করে। উল্লেখ্য, নাসা তাদের ‘স্পিৎজার এবং হাবল স্পেস’ টেলিস্কোপের মাধ্যমে বহু বছর আগে থেকেই প্রোটোস্টারের বিভিন্ন ইনফ্রারেড ছবি তুলে আসছে। তবে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে তোলা একটি প্রোটোস্টারের সবচেয়ে বিখ্যাত, নিখুঁত এবং বহুল আলোচিত রঙিন ছবিটি নাসা ১৬ নভেম্বর, ২০২২ তারিখে প্রকাশ করে । ‘এল ১৫২৭’ নামের একটি অন্ধকার গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই প্রোটোস্টারটির ছবি জেমস ওয়েবের ‘নিয়ার-ইনফ্রারেড ক্যামেরা’ দিয়ে তোলা হয়। ছবিটিতে একটি জ্বলন্ত মহাজাগতিক বালিঘড়ির মতো অবয়ব দেখা গিয়েছিল।
প্রোটোস্টারের কেন্দ্রে একসময় কেন্দ্রের তাপমাত্রা এত বেশি হয়ে যায় যে, সেখানে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের মধ্যে পারমাণবিক সংযোজন শুরু হয়। হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। এই শক্তিই নক্ষত্রকে আলো ও তাপের উৎসে পরিণত করে। এই পর্যায়ে প্রোটোস্টার একটি প্রকৃত নক্ষত্রে পরিণত হয় এবং তার জীবনের প্রধান পর্যায় বা ‘মেইন সিকোয়েন্স’ শুরু করে। একদিকে তীব্র মহাকর্ষবল নক্ষত্রের সমস্ত পদার্থকে কেন্দ্রের দিকে টেনে সংকুচিত করতে চায়, অন্যদিকে নিউক্লীয় সংযোজন থেকে উৎপন্ন শক্তি ও চাপ নক্ষত্রকে বাইরে প্রসারিত হতে সাহায্য করে। এই দুই শক্তির ভারসাম্যের কারণে নক্ষত্র দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। আমাদের সূর্য বর্তমানে এই মেইন সিকোয়েন্স পর্যায়ে রয়েছে। তবে কোনও নক্ষত্রই চিরকাল একই অবস্থায় থাকে না। একসময় কেন্দ্রে থাকা হাইড্রোজেনের পরিমাণ কমে আসে। তখন নক্ষত্রের অভ্যন্তরের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে। কেন্দ্র সংকুচিত ও উত্তপ্ত হয় এবং বাইরের স্তরগুলো প্রচণ্ডভাবে প্রসারিত হয়ে যায়। ফলে নক্ষত্রটি একটি বিশাল লালচে নক্ষত্রে পরিণত হয়, যাকে বলা হয় ‘রেড জায়ান্ট’ বা লোহিত দানব। ভবিষ্যতে আমাদের সূর্যও এই পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
নক্ষত্রদের পৃষ্ঠের বর্ণ নির্ভর করে এদের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার উপর। সাধারণত অপেক্ষাকৃত বেশী তাপমাত্রায় এদের বর্ণ থাকে নীল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের তাপমাত্রা কমতে থাকে এবং অপেক্ষাকৃত শীতল নক্ষত্রের পৃষ্ঠবর্ণ লাল হয়ে থাকে। নক্ষত্রের জন্ম যেমন মহাবিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, তেমনি তার মৃত্যুও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নক্ষত্র কতদিন বেঁচে থাকবে এবং তার শেষ পরিণতি কী হবে, তা মূলত তার ভরের ওপর নির্ভর করে। ছোট ও মাঝারি ভরের নক্ষত্রের মৃত্যু একরকম, আবার অত্যন্ত বড় ভরের নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে অনেক বেশি বিস্ফোরণে (যা সুপারনোভা নামে পরিচিত)। অনেক সময় অত্যন্ত ভারী নক্ষত্রের কেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে, নক্ষত্রটি নিজের মহাকর্ষের চাপে ভেঙে পড়তে শুরু করে। যদি তার অবশিষ্ট কেন্দ্রের ভর এত বেশি হয় যে, কোনও পরিচিত চাপ তাকে আর ঠেকাতে না পারে, তাহলে কেন্দ্রটি অত্যন্ত ঘন অবস্থায় সংকুচিত হয়ে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে একটি সীমানা থাকে, যার নাম ইভেন্ট হরাইজন। এই সীমানা অতিক্রম করার পর মহাকর্ষ এতটাই প্রবল যে, আলোর গতিতেও কোনও কিছু কৃষ্ণগহ্বর থেকে বাইরে বের হতে পারে না। তাই কৃষ্ণগহ্বরকে সরাসরি দেখা যায় না।
তবে নক্ষত্রের মৃত্যু মানেই তার অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সমাপ্তি নয়। বরং একটি নক্ষত্রের মৃত্যু ভবিষ্যতে নতুন নক্ষত্র ও গ্রহের জন্মের পথ তৈরি করে। নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হওয়া কার্বন, অক্সিজেন, লোহা এবং অন্যান্য ভারী মৌল যখন মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেগুলো গ্যাস ও ধূলিকণার সঙ্গে মিশে যায়। দীর্ঘ সময় পরে এই পদার্থগুলো একত্রিত হয়ে নতুন গ্যাসের মেঘ তৈরি করতে পারে। সেই মেঘ থেকেই আবার নতুন নক্ষত্র ও গ্রহের জন্ম হয়।
এইভাবে মহাবিশ্বে নক্ষত্রের জন্ম, জীবন ও মৃত্যুর একটি বিশাল চক্র চলতে থাকে। একটি নক্ষত্রের মৃত্যু থেকেই পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির উপাদান সৃষ্টি হয়। তাই বলা যায়, নক্ষত্রের মৃত্যু আসলে মহাবিশ্বের শেষ নয়; বরং নতুন সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।




