একটা বাঁ-হাতি ব্যাট উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। তারপর বল ছুটে গেল কভারের ওপর দিয়ে। মাঠের সবুজ ঘাস পেরিয়ে, সীমানার দড়ি পেরিয়ে। গ্যালারি থেকে উঠল উল্লাস।
এ দৃশ্য ক্রিকেটে নতুন নয়। কিন্তু স্মৃতি মান্ধানা যখন এমন শট খেলেন, তখন দৃশ্যটির মধ্যে একটা আলাদা সৌন্দর্য এসে যায়। মনে হয়, ব্যাট দিয়ে তিনি শুধু বলকে আঘাত করছেন না, ছবিও আঁকছেন।
ক্রিকেটের অভিধানে ‘কভার ড্রাইভ’ একটি সাধারণ শব্দ। কিন্তু স্মৃতির ব্যাটে সেই সাধারণ শব্দটি কখনও কখনও কবিতার মতো হয়ে ওঠে। তাঁর শরীরের ভারসাম্য, সামনের পায়ের নিখুঁত অবস্থান, ব্যাটের মসৃণ গতি— সব মিলিয়ে মনে হয়, বলটিকে তিনি মারলেন না, যেন তাকে পথ দেখিয়ে দিলেন।
এই সৌন্দর্যের আড়ালে অবশ্য রয়েছে দীর্ঘ পরিশ্রমের গল্প। রয়েছে ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখার সাহস। রয়েছে ব্যর্থতা, চোট, চাপ, প্রত্যাশা এবং আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। স্মৃতি মান্ধানার গল্প আসলে একটি ক্রিকেটারের গল্পের চেয়ে অনেক বেশি। এটি এমন এক মেয়ের গল্প, যে ব্যাট হাতে নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করতে করতে ভারতীয় ক্রীড়াঙ্গনে অসংখ্য মেয়ের জন্য নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে।
মহারাষ্ট্রের সাংলিতে তাঁর বেড়ে ওঠা। ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচয় খুব ছোটবেলাতেই। বাড়ির পরিবেশেও ক্রিকেটের ছোঁয়া ছিল। ভাই শ্রবণ ক্রিকেট খেলতেন। তাঁর খেলা দেখতে দেখতে ছোট্ট স্মৃতির মনেও ব্যাট-বলের পৃথিবীটা জায়গা করে নেয়। তখন কি কেউ ভেবেছিল, এই মেয়েটিই একদিন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম বড় নাম হবে? সম্ভবত না।
কিন্তু বড় স্বপ্নের শুরু তো এমনই হয়— কেউ প্রথমে তার ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। শুধু স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটি দেখতে পান। স্মৃতি দেখেছিলেন। ব্যাট হাতে অনুশীলন করতে করতে, মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে কাটাতে, ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিলেন তিনি। ক্রিকেটে প্রতিভা অবশ্যই দরকার, কিন্তু প্রতিভাকে সাফল্যে পরিণত করার জন্য যে নিষ্ঠা দরকার, সেটিও তাঁর ছিল। মাত্র ষোলো বছর বয়সে ভারতের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক।
ষোলো! যে বয়সে অধিকাংশ মেয়ে স্কুল, বন্ধু, পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে, সেই বয়সে স্মৃতি দাঁড়িয়ে গেলেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের সামনে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তাঁকে অবশ্য কোনও ছাড় দেয়নি। তাঁকেও অন্যদের মতোই বলের গতি, সুইং, স্পিন, চোট, ব্যর্থতা এবং মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন— এই মেয়েটি দীর্ঘ পথ হাঁটার জন্যই এসেছে।
স্মৃতি মান্ধানার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত তার স্বাভাবিকতা। আর এই সৌন্দর্য হয়ে ওঠে কবিতা। অনেক ক্রিকেটারের ব্যাটিংয়ে শক্তির প্রদর্শন থাকে। স্মৃতির ব্যাটিংয়ে থাকে সময়জ্ঞান। যেন তিনি জানেন, কোন বলকে কতটা জোরে মারতে হবে, আর কোন বলকে শুধু একটু ছুঁয়ে দিলেই সে নিজেই সীমানার দিকে ছুটবে। বিশেষ করে তাঁর কভার ড্রাইভ ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ। তাঁর ব্যাটিং দেখতে দেখতে কখনও কখনও মনে হয়, ক্রিকেটের কঠিন অঙ্কটা তিনি খুব সহজে সমাধান করে ফেলেছেন।
কিন্তু এই সহজতার পেছনে রয়েছে কঠিন অনুশীলন। একজন শিল্পীর ছবির মতোই একজন বড় ক্রিকেটারের সৌন্দর্যের পেছনে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য খসড়া। স্মৃতির প্রতিটি নিখুঁত শটের পিছনেও রয়েছে সেই অগণিত অনুশীলনের ঘণ্টা, যা দর্শক কখনও দেখতে পান না।
এরপর এলো তাঁর রেকর্ডের রাত। দুবাইয়ের রাতটি তাই শুধু আর একটি ক্রিকেট ম্যাচের রাত ছিল না। মহিলা এশিয়া কাপে হংকংয়ের বিরুদ্ধে ভারত ব্যাট করতে নেমেছে। ওপেন করতে নেমেছেন স্মৃতি। শুরু থেকেই ব্যাটে তাঁর পরিচিত ছন্দ। একটি চার। তারপর আর একটি। তারপর ছক্কা। স্কোরবোর্ডে সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত বাড়ছে দর্শকদের প্রত্যাশা। শেষ পর্যন্ত ৬৪ বলে ১২৪। ভারতের স্কোর ১৯৩। হংকংয়ের ব্যাটিং শেষ ৫৬ রানে। ভারতের জয় ১৩৭ রানে।
কিন্তু আসল বিস্ফোরণ ঘটেছে স্কোরবোর্ডের অন্য একটি কোণে। স্মৃতি মান্ধানা পেরিয়ে গেছেন মিতালি রাজকে। মিতালির ১০,৮৬৮ আন্তর্জাতিক রান এতদিন ছিল মহিলা ক্রিকেটে সর্বোচ্চ। স্মৃতির সংগ্রহ দাঁড়াল ১০,৮৮০। একটি সংখ্যা আর একটি সংখ্যাকে পেরিয়ে গেল— বাইরে থেকে ঘটনাটি এইটুকুই। কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে এর অর্থ অনেক গভীর। মিতালি রাজ ছিলেন একটি যুগের প্রতীক। তাঁর ব্যাট হাতে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট বড় হয়েছে, আত্মবিশ্বাস পেয়েছে, মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছেছে। আর সেই মিতালির রেকর্ড ভাঙলেন স্মৃতি— পরের প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে। মজার ব্যাপার, সেই ঐতিহাসিক ইনিংস খেলার সময় স্মৃতি নিজেই জানতেন না যে, তিনি ইতিহাসের এত কাছে এসে গেছেন। পরে তিনি জানিয়েছেন, ঠিক কত রান করেছেন কিংবা কোন রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তা তিনি জানতেন না।
এই সরলতাটাই যেন স্মৃতির আসল শক্তি। তিনি রেকর্ডের দিকে তাকিয়ে ব্যাট করেন না। তিনি বলের দিকে তাকিয়ে ব্যাট করেন।
স্মৃতির সাফল্যে মিতালি রাজের অভিনন্দন যেন মুহূর্তটিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। একজন কিংবদন্তি তাঁর উত্তরসূরিকে দেখে বললেন, তরুণ ক্রিকেটার থেকে ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাটারে স্মৃতির বেড়ে ওঠা তিনি দেখেছেন এবং তাঁর রেকর্ড পেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে তিনি গর্বিত। ক্রীড়াক্ষেত্রে উত্তরাধিকার বলে যদি সত্যিই কিছু থাকে, তাহলে তার চেয়ে সুন্দর ছবি আর কী হতে পারে? একজনের হাতে যে প্রদীপ জ্বলেছিল, অন্যজন সেটি নিয়ে আরও দূরে এগিয়ে গেলেন।
২০২৫ সাল স্মৃতির জীবনে আরেকটি বড় বাঁক। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের সামনে তখন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। দলের সহ-অধিনায়ক স্মৃতি। তাঁর ব্যাটেও ছিল দায়িত্বের ভার। বিশ্বকাপের পুরো প্রতিযোগিতায় তিনি করেন ৪৩৪ রান। কিন্তু বিশ্বকাপের গল্প শুধু ব্যক্তিগত রান দিয়ে লেখা যায় না। দল যখন বড় স্বপ্নের দিকে এগোয়, তখন প্রত্যেক ক্রিকেটারকে নিজের চেয়ে বড় কিছু ভাবতে হয়। স্মৃতিও তাই করেছেন। শেষ পর্যন্ত ভারত বিশ্বকাপ জিতল। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে সেই জয় একটি নতুন অধ্যায় খুলে দিল। আর সেই অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে থাকলেন স্মৃতি মান্ধানা।
একটি স্বপ্ন, যা একদিন হয়তো তাঁর নিজের ছিল, সেই স্বপ্ন তখন হয়ে গেল কোটি মানুষের। বিশ্বকাপ জয়ের পর এল আরেকটি সম্মান। স্মৃতি নির্বাচিত হলেন ‘বিবিসি ইন্ডিয়ান স্পোর্টসউওম্যান অফ দ্য ইয়ার ২০২৫’। তাঁর সঙ্গে পুরস্কারের দৌড়ে ছিলেন দেশের আরও কয়েকজন অসাধারণ ক্রীড়াবিদ— হরমনপ্রীত কৌর, দাবা তারকা দিব্যা দেশমুখ, শুটার সুরুচি সিং এবং অ্যাথলেট জ্যোতি ইয়ারাজি। শেষ পর্যন্ত সম্মানটি গেল স্মৃতির হাতে।
কিন্তু পুরস্কার হাতে নিয়েও তাঁর কথায় ছিল না ব্যক্তিগত কৃতিত্বের উচ্ছ্বাস। বরং তিনি বললেন, ২০২৫ ছিল মহিলা ক্রিকেটের জন্য একটি বিশেষ বছর এবং ভারতকে ম্যাচ জিততে সাহায্য করতে পেরে তিনি খুশি। এই ‘আমি’র বদলে ‘আমরা’ বলার অভ্যাসই হয়তো একজন ক্রিকেটারকে ধীরে ধীরে নেতায় পরিণত করে। তবে স্মৃতির জীবন শুধু আলোয় ভরা নয়। একজন জনপ্রিয় ক্রিকেটার হওয়ার অর্থ হল প্রত্যাশার ভারও বহন করা। একটি ম্যাচে রান না করলে প্রশ্ন ওঠে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থ হলে সমালোচনা আসে। ভালো খেললেও পরের ম্যাচে একই সাফল্য দেখানোর দাবি থাকে। তার ওপর মহিলা ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের অবহেলার ইতিহাসও রয়েছে।
স্মৃতির প্রজন্ম সেই অবহেলার সময়কে পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছে। আজ মহিলা ক্রিকেটের ম্যাচ দেখতে দর্শক মাঠে আসেন, গ্যালারি পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, অসংখ্য মানুষ টেলিভিশনে খেলা দেখেন, ক্রিকেটারদের নিয়ে আলোচনা করেন। মহিলা প্রিমিয়ার লিগের মতো মঞ্চ তাঁদের পেশাদার ক্রিকেটকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে। স্মৃতিও সেই পরিবর্তনের অন্যতম মুখ। তিনি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে মহিলা প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন এবং দুটি শিরোপা জয়ের অংশ হয়েছেন। অর্থাৎ ভারতের জার্সি হোক কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট— দুই ক্ষেত্রেই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন।
তবু স্মৃতি মান্ধানার সবচেয়ে বড় রেকর্ড হয়তো কোনও রেকর্ডই নয়। ভারতের কোনও প্রত্যন্ত শহরে, কোনও ছোট মাঠে, কোনও কিশোরী হয়তো ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে টেলিভিশনে স্মৃতিকে দেখেছে। দেখেছে তাঁর কভার ড্রাইভ। দেখেছে তাঁর শতরান। দেখেছে তিনি পুরস্কার নিচ্ছেন। দেখেছে ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে তাঁকে মাঠে নামতে। সেই মেয়েটি হয়তো মনে মনে বলছে— ‘আমিও পারব।’ একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্য তখনই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর সাফল্য অন্য কারও স্বপ্নের কারণ হয়। স্মৃতি মান্ধানা সেই কাজটি করেছেন।
৩০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে স্মৃতির গল্প শেষ হয়ে যায়নি। বরং মনে হয়, গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলি এখনও সামনে। ১০,৮৮০ আন্তর্জাতিক রান, ১৮টি শতরান— এসব আজ তাঁর নামের পাশে লেখা সংখ্যা। একদিন হয়তো কেউ এগুলিও পেরিয়ে যাবে। ক্রিকেটের ইতিহাস এমনই। রেকর্ড তৈরি হয়, আবার ভাঙে। কিন্তু ইতিহাসে কিছু নাম সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে যায়। স্মৃতি মান্ধানা তেমনই একটি নাম। কারণ তিনি শুধু রান করেননি। তিনি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের বদলে যাওয়া সময়কে নিজের ব্যাটে ধারণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভা ও পরিশ্রম একসঙ্গে থাকলে একটি ছোট শহরের মেয়েও পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রিকেটমঞ্চে নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
আর তাই দুবাইয়ের সেই রাতে ১২৪ রানের ইনিংস শেষ হয়ে গেলেও গল্পটি শেষ হয়নি। হয়তো পরের গল্পটি লেখা হবে অন্য কোনও মাঠে। অন্য কোনও সকালে। অন্য কোনও বড় ম্যাচে। আবার হয়তো দেখা যাবে— একটি বাঁ-হাতি ব্যাট উঠেছে, শরীর সামান্য এগিয়ে গেছে, বল ব্যাটের মাঝখানে এসে লেগেছে। তারপর— সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে বল ছুটে যাচ্ছে। গ্যালারি উঠে দাঁড়াচ্ছে। আর ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতায় নিঃশব্দে লেখা হচ্ছে আর একটি লাইন— স্মৃতি মান্ধানা এখনও ব্যাট করছেন। তাঁর গল্পও এখনও চলছে।




