দিল্লি নয়, গুজরাতের জামনগর— মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর ভারত সফরের এই ব্যতিক্রমী গন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কি এখন কূটনৈতিক সৌজন্যের চেয়ে জ্বালানি-স্বার্থের উপর বেশি নির্ভরশীল?
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনও রাষ্ট্রনেতা কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তার প্রতিটি পদক্ষেপেরই বিশেষ তাৎপর্য থাকে। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ভারত সফরও তার ব্যতিক্রম নয়। মুম্বাইয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি গেলেন গুজরাতের জামনগরে, যেখানে অবস্থিত মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়্যান্সের বিশাল তেল শোধনাগার। অথচ দেশের রাজধানী দিল্লি তাঁর সফরসূচিতে জায়গা পেল না। এই সিদ্ধান্ত নিছক সময়ের অভাব, নাকি এর পিছনে রয়েছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হিসাব? বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিচার করলে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়।
রুবিওর এই সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তেল। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ও অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহণ, খাদ্যপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ এসে পড়ে সাধারণ ভোটারের উপর। ফলে জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখা শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, রাজনৈতিক প্রয়োজনও।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের জামনগর শোধনাগার ওয়াশিংটনের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রিলায়্যান্সের এই শিল্পকেন্দ্র প্রতিদিন প্রায় ১৪ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলকে ডিজেলসহ বিভিন্ন ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করার এই ক্ষমতা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। আমেরিকার নিজস্ব শোধন পরিকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করা সহজ নয়। তাই অন্য দেশের শোধনক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানির জোগান বাড়ানো ওয়াশিংটনের কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে।
রুবিও প্রকাশ্যেই ভারতকে ‘রিফাইনিং সুপারপাওয়ার’ বা তেল শোধনে অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষেত্রে রিলায়্যান্সের অভিজ্ঞতার কথা তিনি বলেছেন। অতীতে ভেনেজুয়েলার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ছিল এই ভারতীয় সংস্থা। এখানে আমেরিকার লক্ষ্য স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলার তেলকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি করে নিয়ে আসা গেলে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং দামের উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। রিলায়্যান্সের মতো সংস্থা সেই তেল পরিশোধন করে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ করলে আমেরিকারও লাভ। তবে এই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত চুক্তি বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। জামনগরে বৈঠক হয়েছে, বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ঠিক কত তেল কেনা হবে বা কত জ্বালানি সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও নির্দিষ্ট অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়নি।
রুবিওর সফরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রাশিয়ার তেল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পর পশ্চিমি দেশগুলি রাশিয়ার উপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ভারত তুলনামূলক সস্তায় রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। ভারতের যুক্তি, ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং সাশ্রয়ী দাম— দুটিই জরুরি।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল কেনার প্রশ্নে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল রুশ তেল কেনার শাস্তি হিসেবে। এর ফলে বহু ভারতীয় পণ্যের উপর মোট শুল্কের হার ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও রাশিয়ার তেল নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য দূর হয়নি।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই আমেরিকা নিজেও রুশ ডিজেলের উপর সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জ্বালানি নিয়ে নীতির প্রশ্নে আদর্শের চেয়ে বাস্তব প্রয়োজন অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। আমেরিকা নিজের স্বার্থে যে ছাড় দিতে পারে, ভারতের কাছেও একই ধরনের বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করা উচিত। ভারতের উচিত, কোনও দেশের চাপের মুখে নয়, নিজের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিচার করে জ্বালানি নীতি নির্ধারণ করা।
তাহলে দিল্লি এড়িয়ে জামনগরে যাওয়ার তাৎপর্য কী? একদিকে, দিল্লি হল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক মতপার্থক্য এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতার কেন্দ্র। অন্যদিকে, জামনগর হল এমন একটি শিল্পকেন্দ্র, যেখানে আলোচনার ফলাফল সরাসরি বাণিজ্যিক সহযোগিতায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দিল্লিতে রাজনৈতিক প্রশ্নে মতবিরোধ থাকলেও জামনগরে তেল কেনা, শোধন এবং সরবরাহ নিয়ে দুই পক্ষের স্বার্থ মিলতে পারে। তবে রাজধানী সফর না করার ঘটনাকে ভারতকে অপমান করার প্রচেষ্টা বলে ব্যাখ্যা করাও অতিসরলীকরণ হবে। রুবিও মুম্বাইয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ একেবারে এড়িয়ে যাওয়া হয়নি।
এই সফরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আমেরিকার টেক্সাসে নতুন তেল শোধনাগার তৈরির সম্ভাবনাও। ট্রাম্প মার্চ মাসে টেক্সাসের ব্রাউনসভিল বন্দরে একটি বড় শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। প্রস্তাবিত প্রকল্পে রিলায়্যান্সের আগ্রহ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হয়ে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। যদিও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন, অর্থায়ন কিংবা নির্মাণের সময়সীমা নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য নেই। ফলে এটিকে নিশ্চিত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, এই সফর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের একটি মৌলিক সত্য সামনে এনেছে। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। ভারতের পণ্য রপ্তানি ও আমদানি, উভয় ক্ষেত্রেই আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা সেই অনিশ্চয়তা কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু তার ফলে বাণিজ্যচুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হবেই— এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভারতের সামনে তাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হল ভারসাম্য বজায় রাখা। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা প্রয়োজন, কিন্তু তার জন্য রাশিয়া বা অন্য কোনও দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অকারণে বিসর্জন দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। একইভাবে, রিলায়্যান্সের মতো বৃহৎ সংস্থার বাণিজ্যিক সাফল্যকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক হবে না। কোনও চুক্তি ভারতের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিল্পোন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে কতটা কার্যকর, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের মাপকাঠি।
রুবিওর জামনগর সফর তাই শুধু একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শনের ঘটনা নয়। এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে জ্বালানি হয়ে উঠেছে অর্থনীতি, কূটনীতি এবং নির্বাচনী রাজনীতির সংযোগস্থল। আমেরিকা তার অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে, ভারত চাইছে সাশ্রয়ী তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং দুই দেশই বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা খুঁজছে। এই স্বার্থের মিল সাময়িক সমঝোতার পথ খুলতে পারে। কিন্তু স্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, নীতির ধারাবাহিকতা এবং একে অন্যের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। শেষ পর্যন্ত জামনগরের তেল যদি দিল্লি ও ওয়াশিংটনের দূরত্ব কমাতে পারে, তবে তার সুফল শুধু দুই দেশের সরকার নয়, সাধারণ মানুষও পাবে কি না— সেই প্রশ্নের উত্তরই হবে এই সফরের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।




