• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 3 July, 2026

ঋত্বিক ঘটক ১০০, সুবর্ণরেখা ৬০

লেখক হয়ে ওঠার স্বপ্ন মিলিয়ে যায়। চাকরিও জোটে না। সীতা ঠোঙা বানিয়ে সংসারের খরচ জোগাড় করে। অনেক পরে স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাস ড্রাইভারের চাকরি জোটে অভিরামের।

ঋত্বিক ঘটক ১০০, সুবর্ণরেখা ৬০

ফাইল চিত্র

পঙ্কজকুমার চট্টোপাধ্যায়

১৯২৫ সালে জন্মেছিলেন দিকপাল চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক এবং ১৯৬৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল তাঁর পরিচালিত ’সুবর্ণরেখা’ (নির্মিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে)। একই সময় ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় আরেক দিকপাল পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘মহানগর’। বাংলা চলচ্চিত্রের এই দুই বরেণ্য পরিচালকের এই যে দু’টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল, তাদের প্রেক্ষাপট ছিল প্রায় একই ১৯৫০ দশকে দেশবিভাগের পরে শরণার্থী মানুষের আর্থসামাজিক এবং নৈতিক জীবনে অস্তিত্বের কঠিন সংগ্রাম। ‘মগানগর’-এর স্থানিক প্রেক্ষাপট মহানগর কলকাতা আর সুবর্ণরেখাতে চলচ্চিত্রের শেষভাগে কলকাতা এলেও সাধারণভাবে প্রধান ঘটনাপ্রবাহ সুবর্ণরেখার নদীর তীরবর্তী ছাতিমপুর। আর একটি লক্ষণীয় মিল হল দুই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র এবং নায়িকা বলিষ্ঠ অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। বলতে গেলে তিনি একাই দুই ছবিকে টেনে নিয়ে গেছেন পরিণতির দিকে।

মাধবীর প্রসঙ্গ যখন এলই তখন উল্লেখ করি আনন্দলোক পত্রিকাতে প্রকাশিত কবিতা সিংহের নেওয়া মাধবী মুখোপাধোয়ের সাক্ষাৎকারের একটি অংশ: ‘মগানগর’ তখন শেষ করেছি। ‘সুবর্ণরেখা’ তখনও রিলিজ হয়নি। সত্যজিৎ রায় গেছেন ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ দেখতে। আমি দু’জনেরই নায়িকা। সঙ্গে বসে আছি। সুবর্ণরেখা দেখা শেষ হল। চা এল। চা খেতে খেতে ঋত্বিক ঘটক বললেন, যাই বলো তোমার মহানগরের থেকে মাধু সুবর্ণরেখায় অনেক ভালো কাজ করেছে। সত্যজিৎ রায় বললেন, আমি তা মনে করি না। মাধবী মহানগরেই বেশি ভালো কাজ করেছে।’ মাধবী দু’জনের মাঝখানে পড়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছিলেন, তবে গর্বও হয়েছিল। সত্যি কথা বলতে কি দুই চলচ্চিত্রের মধ্যে তুলনা না করেই সহজেই বলা যায় মাধবী দুই চরিত্রকেই দুই অসামান্য পরিচালকের চাহিদা মিটিয়ে নিজের অভিনয় ক্ষমতার গুণে এক সু-উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।

যেখানে বলা যায় মহানগরে মাধবী একমেবাদ্বিতীয়ম, সেখানে সুবর্ণরেখায় মাধবীর পাশাপাশি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ঈশ্বর চক্রবর্তী’র চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন অভি ভট্টাচার্য। ঈশ্বর চক্রবর্তী বালিকা বোন সীতা এবং মায়ের কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক বালক অভিরামকে নিয়ে চলে আসে ঘাটশিলার কাছাকাছি সুবর্ণরেখার তীরবর্তী ছাতিমপুরে বন্ধুর বদান্যতায় পাওয়া ফাউন্ড্রি মিলে চাকরি করতে। অভিরামকে ঝাড়গ্রামে হোস্টেলে রেখে পড়ায় ঈশ্বর। সে স্কুলের শেষ পরীক্ষার পর অভিরামকে জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে পাঠাবার ব্যবস্থা করে। কিন্তু, অভিরাম তখন ঠিক করেছে সে লেখক হবে। আর তখন এও বুঝতে পারে সীতাকে সে ভালোবাসে। জানতে পেরে ঈশ্বর অভিরামকে কলকাতাতে চলে যেতে বলে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্রুত সীতার বিবাহের বন্দোবস্ত করে ফেলে। বিবাহের রাতেই সীতা অভিরামের সঙ্গে রওনা দেয় কলকাতা। দুই স্বামী-স্ত্রী মহানাগরিক সমস্যাদীর্ণ সমাজের দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। প্রকাশকের কাছেও অভিরাম প্রত্যাখ্যাত হয়। লেখক হয়ে ওঠার স্বপ্ন মিলিয়ে যায়। চাকরিও জোটে না। সীতা ঠোঙা বানিয়ে সংসারের খরচ জোগাড় করে। অনেক পরে স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাস ড্রাইভারের চাকরি জোটে অভিরামের। কিন্তু তার বাসে চাপা পড়ে এক বালিকা মারা গেলে, উন্মত্ত জনতা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। খবর পেয়ে চোখ বুজে চরম মানসিক আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সীতা। এই দৃশ্যের সঙ্গে তুলনীয় মহানগর চলচ্চিত্রে স্বামী সুব্রতর চাকরি চলে যাবার খবর পেয়ে আরতির চোখ বুজে আঘাত সহ্য করার দৃশ্য। অভিরামের জার্মানি না যাওয়া এবং বোন সীতা অভিরামের সঙ্গে পলায়নের পর থেকে ঈশ্বর রক্তমাংসের মানুষে অবস্থান করে না। একদিন চরম হতাশার পরিণতিতে সে আত্মহত্যা করতে গেলে, নাটকীয়ভাবে তাকে উদ্ধার করে বন্ধু হরপ্রসাদ, যাকে ছেড়ে সে রিফিউজি কলোনি থেকে ছাতিমপুরে এসেছিল।

তখন ফ্যাক্টরি ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার কারণে তার অনেক অর্থ। হরপ্রসাদ তাকে নিয়ে আসে কলকাতায়। কঠিন জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে উদ্ভ্রান্ত এই দুই বন্ধু পৌঁছে যায় রেসের মাঠে, বারে মদ্যপানের আসরে। মদ্যপ অবস্থায় এসে পৌঁছয় পতিতালয়ে, যেখানে দেহোপজীবী জীবনের প্রথম খদ্দের হিসেবে দাদা ঈশ্বরের মুখোমুখি হয় সীতা। দাদার এই চরম পরিণতি দেখে এবং এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বটি দিয়ে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করে সীতা। তারপর আসল ঘটনা বুঝতে পেরে ঈশ্বর নিজেকে দোষী প্রতিপন্ন করে। দুই বছর আইনি বিচারের পর সে নিরাপরাধ সাব্যস্ত হয়। ফিরে আসে আবার সেই ছাদিমপুরে সীতার একমাত্র বালক পুত্র বিনুকে সঙ্গে নিয়ে। ইতিমধ্যে স্টেশনেই সে খবর পায় বন্ধু তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। কিন্তু চরম হতাশার মধ্যেও অবশেষে এই বিনুকে কোলে নিয়েই সে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়। বিনুর মধ্যেই সে দেখে আশার আলো।

‘মহানগর’-এর নায়িকা আরতি কোম্পানির মালিকের কাছে সহকর্মীর অপমানের প্রতিবাদে চাকরিতে ইস্তফা দেয়। তকন স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই বেকার। সুবর্ণরেখা-র ঈশ্বরের মতো তারা দু’জনেও নতুন আশার উপর ভর করে ভবিষ্যৎ জীবনের দিকে পা বাড়ায়। সুবর্ণরেখায় এক আদর্শবাদী চরিত্র হরপ্রসাদ ঈশ্বরকে বলেছিল যে সমকালীন আর্থসামাজিক চরম সংকটের মধ্যে পড়ে মানুষ অনৈতিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে, নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মাধবী অভিনীত সীতা চরিত্র দাদার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘দাদা তুমি অন্যায় করছ।’ আর একইভাবে মাধবী অভিনীত আরতি মহানগরে মালিক মি. মুখার্জিকে বলেছিল, ‘এডিথের সঙ্গে আপনি অন্যায় করেছেন।’

প্রায় সমান্তরাল কাহিনির মহানগর দেখে ক্লান্ত লাগে না। কিন্তু, সমস্যাদীর্ণ সমাজের ভয়াবহ সংঘাতের দৃশ্যগুলি দেখে সুবর্ণরেখা মন ভারাক্রান্ত করে দেয়। কিন্তু ঋত্বিক যে এক আপসহীন গল্পকার এবং চলচ্চিত্রকার। উপরে উল্লিখিত সাক্ষাৎকারে মাধবী ঋত্বিক সম্বন্ধে বলেছেন, ‘…উনি একেবারে আলাদা ধাঁচের, কোনও নিয়মকানুনের গণ্ডী কখনও মানেন না।’ স্বীকৃতির দিক দিয়ে মহানগর, সুবর্ণরেখার থেকে এগিয়ে থাকলেও মেঘে ডাকা তারা এবং কোমল গান্ধা-এর সঙ্গে ট্রিলজির তৃতীয় চিত্র হিসেবে সুবর্ণরেখা দর্শকের হৃদয়ে চিরকাল থাকবে।