• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 28 October, 2026

শ্রেয় ও প্রেয়: কাকে বেছে নেব আমরা?

অ্যারিস্টটল মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, মানুষের পরম কল্যাণ ভোগে নয়, নিজের শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনাকে বিকশিত করায়। ব্যক্তি-নির্মাতাদের গাল দিয়ে লাভ নেই। অনেকের কাছে এটা রুজি, আর অনেকে এই মাধ্যমেই বিজ্ঞান শেখাচ্ছেন। প্রশ্নটা তাঁদের নিয়ে নয়, আমরা কাকে মাথায় তুলি তা নিয়ে। দামটা দেশকেই দিতে হচ্ছে। গবেষণায় খরচ জাতীয় আয়ের এক শতাংশও ছোঁয়নি, তাই মেধাবীরা হয় দেশ ছাড়ছেন, নয় বিজ্ঞান ছাড়ছেন। তবু চন্দ্রযান-৩ চাঁদে নামার দিন চায়ের দোকান থেকে গ্রামের উঠোন পর্যন্ত মানুষ হাততালি দিয়েছিল একদল বিজ্ঞানীর জন্য। টানটা মরেনি, শুধু তাকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টাটা আমরা করি না।

শ্রেয় ও প্রেয়: কাকে বেছে নেব আমরা?

Photo: Statesman

কঠোপনিষদের গল্পটা ছোটবেলায় অনেকেই ঠাকুমার মুখে শুনেছি। বালক নচিকেতা দাঁড়িয়ে আছে যমের দুয়ারে, আর যম তাকে সোনাদানা, দীর্ঘ আয়ু, রথ, অপ্সরাদের নাচগান, যা চায় সব দিতে চাইছেন। নচিকেতা শান্ত গলায় বলে, এসব তোমার কাছেই থাক, আমি জীবনের সত্যটা জানতে চাই। উপনিষদ আমাদের জন্য দুটো শব্দ রেখে গেছে, শ্রেয় আর প্রেয়। প্রেয় হল যা এখনই ভালো লাগে, আর শ্রেয় হল যা শেষ পর্যন্ত মঙ্গল করে। আড়াই হাজার বছর পরে সেই যম আবার ফিরে এসেছেন, এবার আমাদের হাতের পাঁচ ইঞ্চির পর্দায়। গীতার তৃতীয় অধ্যায়ে কৃষ্ণ আরেকটা কথা বলেছিলেন, যা এই লেখার আসল প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়। শ্রেষ্ঠ মানুষ যেমন আচরণ করেন, সাধারণ মানুষ তাই অনুসরণ করে। তিনি যাকে মাপকাঠি বলে মানেন, লোকে সেটাকেই মাপকাঠি করে। তাহলে একটা জাতির ভবিষ্যৎ শেষমেশ একটা প্রশ্নের উত্তরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: সমাজ কাকে শ্রেষ্ঠ বলে মানছে? আজ আমরা সেই প্রশ্নের ভুল উত্তর দিচ্ছি, আর দিচ্ছি জেনেশুনেই।

২০১৯ সালের নভেম্বরে পাটনার এক হাসপাতালের বাইরে স্ট্রেচারে সাদা কাপড়ে ঢাকা পড়ে ছিলেন গণিতজ্ঞ বশিষ্ঠ নারায়ণ সিং, অ্যাম্বুল্যান্সের অপেক্ষায়। বার্কলের এই ডক্টরেট দীর্ঘদিন স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় ভুগে প্রায় বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ তাঁর গবেষণার বিষয় রিপ্রোডিউসিং কার্নেল তত্ত্ব আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম ভিত।

নিউটন বলেছিলেন, তিনি দূর পর্যন্ত দেখতে পেয়েছেন দৈত্যদের কাঁধে চড়ে। আমরাও দৈত্যদের কাঁধে চড়ে বসে আছি, শুধু একবারও নিচে তাকিয়ে দেখি না কাঁধগুলো কাদের। তাহলে কাদের আমরা আদর্শের আসনে বসিয়েছি? মার্কিন ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল বুরস্টিন ষাটের দশকে একটা ধারালো তফাত টেনেছিলেন। নায়ক পরিচিত হন তাঁর কাজের জন্য, আর সেলিব্রিটি পরিচিত শুধু পরিচিত হওয়ার জন্যই। এই তফাতটাই আমরা গুলিয়ে ফেলেছি। যার ফলোয়ার বেশি, তাকে ধরে নিচ্ছি সফল। যে বেশি দামি গাড়ি দেখায়, তাকে ধরে নিচ্ছি যোগ্য। অর্থনীতিবিদ থর্স্টাইন ভেবলেন যাকে বলেছিলেন দেখনদারি ভোগ, সেটাই আজ চরিত্রের সার্টিফিকেট। আমরা কাউকে সম্মান করছি না সে কী গড়েছে তার জন্য, করছি সে কত খরচ করছে তা দেখে। এটা নিছক রুচির বিকৃতি নয়, মূল্যবোধের উল্টোযাত্রা। আর এর দায় পর্দার ওপারের মানুষগুলোর চেয়ে আমাদের অনেক বেশি। কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা হয় ইনফ্লুয়েন্সারের বিয়ের ছবি, আর বিজ্ঞানীর আবিষ্কার পড়ে থাকে ভেতরের পাতার কোণে। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন ভাইরাল তারকা।

বাবা-মা ছেলেকে মোবাইলের জন্য বকেন, অথচ নিজেরাই সেই তারকার রিল পারিবারিক গ্রুপে পাঠান। শিশু আমাদের মুখের কথা শোনে না, দেখে আমাদের হাততালি কোন দিকে যাচ্ছে। তাহলে আদর্শ কে? একটা সহজ পরীক্ষা আছে। কোনো মানুষের জীবন যদি দেশের এক কোটি শিশু হুবহু অনুসরণ করে, দেশটা কেমন হবে? এই পরীক্ষায় পাস করেন বিদ্যাসাগর, যিনি চটি পায়ে, মোটা চাদর গায়ে নিজের উপার্জন বিলিয়ে দিয়েছিলেন বিধবা আর গরিব ছাত্রদের জন্য। পাস করেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যিনি বেতনের টাকা গবেষণায় দান করে বিজ্ঞান কলেজের একটা ছোট ঘরে জীবন কাটিয়েছিলেন। পাস করেন সুন্দরবনের সেই ডাক্তার, যিনি শহরের মোটা মাইনে ছেড়ে গ্রামে পড়ে আছেন, আর সেই প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারমশাই, যিনি নিজের পয়সায় গরিব ছাত্রের বই কিনে দেন। আর এক কোটি শিশু যদি ক্যামেরার সামনে দামি জিনিস দেখানোকেই জীবনের লক্ষ্য করে? তাহলে যে দেশ তৈরি হবে, সেখানে দর্শক থাকবে অগুনতি, কিন্তু কিছু গড়ার লোক একজনও থাকবে না।

ভুলটা কেন এত সহজে করি, তা প্লেটোর গুহার রূপক বুঝিয়ে দেয়। শিকলে বাঁধা মানুষ দেওয়ালে পড়া ছায়াকেই সত্য বলে মানে, আর আমাদের কালের সেই দেওয়াল হল আলো-জ্বলা পর্দা। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, অনিশ্চিত পুরস্কারেই মন সবচেয়ে বেশি আটকায়। স্কিনার তা দেখিয়েছিলেন, আর জুয়ার যন্ত্র আর অফুরন্ত স্ক্রোল দুটোই চলে এই নিয়মে। মস্তিষ্কের ডোপামিন পুরস্কারের চেয়ে তার প্রত্যাশাতেই বেশি সাড়া দেয়। যে মন রোজ পনেরো সেকেন্ডের উত্তেজনায় অভ্যস্ত, পনেরো বছরের সাধনা তার কাছে অসম্ভব ঠেকে। বাঙালি ঘরে কথা চালু আছে, লক্ষ্মী আর সরস্বতী এক ঘরে থাকেন না। আমরা যেন মেনেই নিয়েছি, সরস্বতীর সাধকের কপালে অভাবই লেখা। সাধক নিষ্কাম কর্মে বিশ্বাস করতে পারেন, কিন্তু সেই নির্লোভতার সুযোগ নিয়ে সমাজের তাঁকে ভুলে যাওয়াটা অপরাধ।

অ্যারিস্টটল মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, মানুষের পরম কল্যাণ ভোগে নয়, নিজের শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনাকে বিকশিত করায়। ব্যক্তি-নির্মাতাদের গাল দিয়ে লাভ নেই। অনেকের কাছে এটা রুজি, আর অনেকে এই মাধ্যমেই বিজ্ঞান শেখাচ্ছেন। প্রশ্নটা তাঁদের নিয়ে নয়, আমরা কাকে মাথায় তুলি তা নিয়ে। দামটা দেশকেই দিতে হচ্ছে। গবেষণায় খরচ জাতীয় আয়ের এক শতাংশও ছোঁয়নি, তাই মেধাবীরা হয় দেশ ছাড়ছেন, নয় বিজ্ঞান ছাড়ছেন। তবু চন্দ্রযান-৩ চাঁদে নামার দিন চায়ের দোকান থেকে গ্রামের উঠোন পর্যন্ত মানুষ হাততালি দিয়েছিল একদল বিজ্ঞানীর জন্য। টানটা মরেনি, শুধু তাকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টাটা আমরা করি না।

যম আজও রোজ সামনে এসে দাঁড়ান, রথের বদলে ঝলমলে পর্দা হাতে। আমরা কাকে হাততালি দিই, কাকে প্রধান অতিথি করি, খাবার টেবিলে সন্তানের সামনে কার নাম শ্রদ্ধা নিয়ে উচ্চারণ করি, এই ছোট ছোট বাছাইয়েই ঠিক হচ্ছে আগামী প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ কে। নচিকেতা শ্রেয়কে বেছেছিল। আমরা কাকে বাছব?