• facebook
  • twitter
Wednesday, 13 May, 2026

বলিউডে রবীন্দ্রসংগীত

১৯৪৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দো ভাই’ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় ‘রোদন ভরা এ বসন্তে’ গানটির অনুকরণে ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গায়া’ গানটি করেছিলেন শচীন দেববর্মন।

ফাইল চিত্র

অভিজিৎ রায়

ভারতীয় সংস্কৃতির মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন কোনও বিষয় বা পর্যায় নিয়ে গান লেখেননি যা মানুষের ভাবনায় আসতে পারে। তাই ভাষা ও সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে রবীন্দ্রসংগীত চিরন্তন। শুধুমাত্র বাংলা ছবিতেই নয়, যুগের পর যুগ হিন্দি ছবিতেও ব্যবহৃত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের লেখা একাধিক গান। এদের অনেকগুলিই জনপ্রিয়তার সীমানা ছুঁয়েছে।

Advertisement

তবে সব গানই যে হুুবহু রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর ধরে ধরে গাওয়া হয়েছে, তা কিন্ত নয়। মন দিয়ে শুনলেই বোঝা যায়, হিন্দি গানগুলি যেন সংশ্লিষ্ট রবীন্দ্রসংগীগুলিকে লতার মতো জড়িয়ে ধরে ধরে গীত হয়েছে। আর সেখানেই সেই সব সুরকারদের মুন্সিয়ানা। তাই সেগুলি শেষ অবধি তাঁদের গান হয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গান হিন্দি ছবিতে প্রথম আনেন সুরকার ও গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। ১৯৪২ সালে নির্মিত জলজলা সিনেমাতে। ‘খর বায়ু বয় বেগে চারিদিক চায় মেঘে’-র সুরে গান ‘পাওয়ান চালে জোর’। সঙ্গীত পরিচালক— পঙ্কজ মল্লিক, গায়ক কে এল সায়গল।

Advertisement

১৯৪৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দো ভাই’ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় ‘রোদন ভরা এ বসন্তে’ গানটির অনুকরণে ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গায়া’ গানটি করেছিলেন শচীন দেববর্মন। সুরের সঙ্গে শতভাগ মিল থাকলেও নতুন কথা নিয়ে গানটি করেছিলেন শচীন।

ঠিক পরের বছর ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অফসর’ ছবিতে শচীন দেববর্মন আবার আশ্রয় নিলেন রবীন্দ্রনাথের। ওই ছবিতে ‘নায়েন দিবানি এক নাহি মানে’ গানটির সুর পুরোপুরি ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’ গানের অনুকরণে করেছেন।

‘প্যার কিয়া তো ডরনা কেয়া’র স্রষ্টা নওশাদ আলীকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম সেরা সংগীত পরিচালক বলা হয়ে থাকে। বলিউডের সবচেয়ে হিট বেশ কিছু ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। মেলোডি সুরকার হিসেবে তিনি অতুলনীয়৷ এই সুরকার রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন তাঁর অন্যতম আলোচিত গান ‘বচপন কে দিন ভুলা না দেনা’ গানটিতে। ১৯৫১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিদার’ ছবির এই গানটি পুরোপুরি কবিগুরুর ‘মনে রবে কিনা রবে আমারে’ গানটির অনুকরণ।

১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ ছবিতে ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ গানটি রূপান্তর করেন ‘যায়ে তো যায়ে কাঁহা’ শিরোনামে। তালাত মাহমুদের কণ্ঠে গানটি দেব আনন্দের ঠোঁটে দেখা গেছে। সুরকার সেই শচীন কর্তা।
১৯৫৪ সালের ছবি বিরাজ বহু-তে ‘মেরে মন ভুলা ভুলা কাহে দোলে’… গাইলেন হেমন্ত কুমার। সেটি রবীন্দ্রনাথের ওই গানের সুরেই গাওয়া। গেয়েছিলেন আমাদের হেমন্তকুমার। গানটির কথা প্রেম ধাওয়ানের এবং ছবিটির সুরকার ছিলেন সলিল চৌধুরি। বিমল রায় পরিচালিত এ ছবির সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন হৃষিকেষ মুখোপাধ্যায়।

একই বছর সুরকার অনিল বিশ্বাস বিখ্যাত ‘ওয়ারিশ’ ছবিতে ‘রাহি মাতওয়ালি’ গানটি পুরোপুরি করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’ গানের অনুকরণে। এ গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন দু’জন বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তালাত মাহমুদ ও সুরাইয়া জামাল শেখ।

অমিতাভ-জয়া জুটির ‘অভিমান’ ছবিটি দেখেননি, এমন বয়স্ক দর্শক খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ ছবির সব কটি গানই জনপ্রিয় হয়েছিল। সেখানেই অমিতাভ ও জয়া দু’জনেই সংগীতশিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এ ছবিতে জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে র‍্যায়না’ গানটি পুরোপুরিই ‘যদি তারে নাই চিনি গো’ গানের অনুকরণে। গানটির সুর নিলেও নতুন কথায় বেঁধেছিলেন শচীন দেববর্মন। কণ্ঠ দিয়েছিলেন কিশোরকুমার ও লতা মঙ্গেশকর। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৩ সালে।

১৯৭৭ সালে মুক্তি ‘টুটে খিলোনে’ মুক্তি পায়। এ ছবিতে বাপ্পি লাহড়ি রবীন্দ্রনাথের ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি’ অনুকরণে করেন ‘নানহা সা পাঞ্ছি রে তু’ গানটি। গানে কণ্ঠ দেন কিশোর কুমার।

‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’ গানটি বহুশ্রুত রবীন্দ্রসংগীত। এ গানের সুরের অনুকরণে করা ‘ছুঁ কর মেরে মন কো’ বলিউডে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারে আরেক মাইলফলক। ১৯৮১ সালে রাজেশ রোশনের সংগীতায়োজনে ‘ইয়ারানা’ ছবির এই গানে কণ্ঠ দেন কিশোরকুমার। অমিতাভ ঠোঁট মিলিয়েছেন রোমান্টিক এই গানের সঙ্গে।

১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া নানা পাটেকর ও মনীষা কৈরালা অভিনীত ‘যুগপুরুষ’ দারুণ হিট হয়। ওই ছবিতে ‘বন্ধন খুলা পাঞ্ছি উড়া’ গানের সঙ্গে মনীষার নাচ বেশ লেগেছিল দর্শকের। রাজেশ রোশনের ‘বন্ধন খুলা পাঞ্ছি উড়া’ সুর নেওয়া হয় ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ থেকে। মূল কথার সঙ্গে কোনও মিল না থাকলে ভিডিও দেখলে মনে রবীন্দ্রনাথের কথার সঙ্গে মিল আছে দৃশ্যায়নে।

‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গানের ছায়ায় ‘পিয়ু বলে পিয়া বলে’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পরিণীতা’ নিয়ে প্রদীপ সরকারের চলচ্চিত্র ‘পরিণীতা’তেও আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গানের ছায়া অবলম্বনে শান্তনু মৈত্র সুর করেন ‘পিয়ু বলে পিয়া বলে’ গানটি। সোনু নিগম ও শ্রেয়া ঘোষাল কণ্ঠ দিয়েছেন এই গানে। অভিনয় করেছেন বিদ্যা বালান ও সাইফ আলী খান।

(ঋণ স্বীকার : দৈনিক প্রথম আলো ও ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম)

Advertisement