মধ্য আফ্রিকায় নতুন করে ইবোলা সংক্রমণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যে দ্রুততার সঙ্গে ‘পাবলিক হেলথ এমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন’ ঘোষণা করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। সাধারণত এই ধরনের ঘোষণার আগে বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত নেওয়া হয়। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত প্রক্রিয়া এড়িয়ে আগেভাগেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। অনেকের কাছে এটি অস্বাভাবিক মনে হলেও, বর্তমান পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিচার করলে এই সিদ্ধান্তকে যথেষ্ট বিচক্ষণ বলেই মনে হয়।
এই নতুন সংক্রমণের পেছনে রয়েছে ইবোলার অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ‘বুন্ডিবুগিও’ (Bundibugyo) স্ট্রেন। অতীতে এই স্ট্রেন খুব কমবার সংক্রমণ ঘটিয়েছে। ফলে এর আচরণ, সংক্রমণক্ষমতা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে এখনও অনেক অজানা দিক রয়ে গেছে। ইবোলার সবচেয়ে পরিচিত জায়ের (Zaire) স্ট্রেনের বিরুদ্ধে যে টিকা ও চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর, সেগুলি এই নতুন স্ট্রেনের ক্ষেত্রে কতটা কাজ করবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এই অনিশ্চয়তাই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে কঙ্গোর ইটুরি প্রদেশ এবং প্রতিবেশী উগান্ডার সীমান্তবর্তী এলাকায় এই সংক্রমণ সীমাবদ্ধ বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার মূলে রয়েছে ওই অঞ্চলের অস্থিরতা— দীর্ঘদিনের সংঘর্ষ, মানুষের স্থানচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা। এই পরিস্থিতিতে অনেক সংক্রমণই ধরা পড়ছে না, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। WHO-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে একাধিক নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালাতেও সংক্রমণের খবর বিশেষভাবে চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে, কারণ এটি সংক্রমণের বিস্তার ঘটাতে পারে।
Advertisement
ইবোলা এমন একটি রোগ, যার সংক্রমণ দ্রুত এবং মারাত্মক। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। মৃত্যুহারও অত্যন্ত বেশি— কখনও ২৫ শতাংশ, আবার কখনও ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কথা এখনও স্মরণীয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে WHO-র সিদ্ধান্তকে ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখা উচিত। যখন একটি রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি জানা নেই, তখন দেরি না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আন্তর্জাতিক স্তরে সতর্কবার্তা জারি করার ফলে বিভিন্ন দেশ, সংস্থা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত প্রস্তুতি নিতে পারবেন। প্রয়োজনীয় অর্থ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মানবসম্পদ জোগাড় করাও সহজ হবে।
তবে শুধু সতর্কবার্তা জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, সংক্রমিত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’ ঠিকমতো না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্তদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, মৃতদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দাহ বা সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করতে হবে, কারণ এই পর্যায়েও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
এছাড়া জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষকে সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে, কীভাবে রোগটি ছড়ায় এবং কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। অনেক সময় ভয়, গুজব এবং কুসংস্কার পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। তাই সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান অস্ত্র।
সবশেষে বলা যায়, ইবোলা আবারও বিশ্বকে সতর্ক করছে— স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কোনও এক দেশের বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এক দেশের অবহেলা বা অক্ষমতা অন্য দেশগুলোকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর বাস্তবায়ন—এই তিনের সমন্বয়েই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
WHO যে আগেভাগেই সতর্কতার পথ বেছে নিয়েছে, তা ভবিষ্যতের বড় বিপদ এড়ানোরই চেষ্টা। এখন দেখার, বিশ্ব কতটা দ্রুত এবং একসঙ্গে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারে।
Advertisement



