ভারতের শহুরে অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে অসংগঠিত খাতের উপর। এই খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলেন রাস্তার হকার, ক্ষুদ্র বিক্রেতা বা স্ট্রিট ভেন্ডররা। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করে এসেছেন— পুঁজির স্বল্পতা, ঋণ পাওয়ার অসুবিধা, আর্থিক নিরাপত্তার অভাব এবং সামাজিক স্বীকৃতির ঘাটতি। এই বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২০ সালে কেন্দ্র সরকার ‘প্রধানমন্ত্রী স্বনিধি যোজনা’ (PM SVANidhi) চালু করে, যা গত ছয় বছরে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগ শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি স্ট্রিট ভেন্ডরদের আত্মনির্ভর করে তোলার একটি বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ৭৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় এসেছেন এবং ১.১২ কোটিরও বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়— এটি লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনের পরিবর্তনের গল্প।
স্বনিধি যোজনার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। আগে যাঁরা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিতে বাধ্য হতেন, তাঁরা এখন স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন। ফলে তাঁদের ব্যবসা আরও স্থিতিশীল হচ্ছে এবং আয়ও বাড়ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অনেকেই ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাঁদের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি। স্বনিধি যোজনার মাধ্যমে অনেক স্ট্রিট ভেন্ডর প্রথমবার ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এর ফলে তাঁদের ব্যবসা আরও আধুনিক হয়েছে এবং স্বচ্ছতা বেড়েছে। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁরা অতিরিক্ত প্রণোদনাও পাচ্ছেন, যা তাঁদের আরও উৎসাহিত করছে।
এই প্রকল্পের সামাজিক গুরুত্বও কম নয়। স্ট্রিট ভেন্ডরদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও উপেক্ষার জায়গা থেকে তুলে এনে তাঁদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
তাঁরা এখন শুধুমাত্র ‘রাস্তার বিক্রেতা’ নন, বরং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এই স্বীকৃতি তাঁদের আত্মসম্মান বাড়িয়েছে এবং সমাজে তাঁদের অবস্থানও মজবুত করেছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলেও এই প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানে লক্ষাধিক ঋণ বিতরণ হয়েছে এবং শত শত কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা পৌঁছে গেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে। এর ফলে ওই অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে, এই প্রকল্পকে আরও কার্যকর করতে কিছু দিকের প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। যেমন— সকল যোগ্য ভেন্ডরের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, সচেতনতা বাড়ানো এবং ঋণ ব্যবহারের সঠিক দিশা দেওয়া। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা এবং সহজ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি।তবে এ কথা বলাই যায়, প্রধানমন্ত্রীর স্বনিধি যোজনা একটি দূরদর্শী উদ্যোগ, যা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার পথ দেখাচ্ছে।
এই প্রকল্প যদি একইভাবে এগিয়ে চলে এবং আরও বিস্তৃত হয়, তবে আগামী দিনে ভারতের শহুরে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে এর ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্ট্রিট ভেন্ডরদের হাত ধরে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাবে—এই আশাই করা।
Advertisement