বিশ্বজিৎ সরকার
‘যাত্রা শোনে ফাত্রা লোকে’— এই কুপ্রবাদের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য দিয়ে প্রবন্ধ শুরু করা যাক। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস বলছে, আশির দশকের আগে পর্যন্ত বাংলার বিনোদন জগতের অনুষ্ঠানে কোনো সংগীত শিল্পী, কোনো চলচ্চিত্র শিল্পী বা নাট্যশিল্পীকে হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়ার সম্মানদক্ষিণা দেওয়া হয়নি। রাজ্যের দূরবর্তী বা দুর্গম অঞ্চলে অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য চার চাকার ব্যবস্থাই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের মাধ্যম। কিন্তু যাত্রাবিমুখ উন্নাসিক শহুরে বাবুদের নাক সিঁটকানো যাত্রাশিল্পের ললাটেই উঠেছে এই গর্বিত সম্মান। আর সেই গৌরবের অধিকারী যাত্রা সম্রাট স্বপন কুমার। সুন্দরবনের হিজলগঞ্জের সাহেবখালির যাত্রা অনুষ্ঠানে ছয় আসনের বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে।
Advertisement
এই যাত্রাশিল্পে এসেছিলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, বসন্ত চৌধুরী, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, সুখেন দাস, সন্তু মুখোপাধ্যায়ের মতো দীক্ষিত শিল্পীজন। না, এঁরা কেউ পরিযায়ী ছিলেন না, যাত্রার সঙ্গে ছিল আত্মিক সর্ম্পক, মাটির টানে যাওয়ার জীবনবীক্ষা। ‘যাত্রা করে ফাত্রা লোকে’ কিম্বা ‘যাত্রা না, ফাত্রা’ এমন কুবচনের বিরুদ্ধে তাঁদের সক্রিয় যোগদান যেন এক বিরাট চপেটাঘাত।
Advertisement
আর একটি তথ্য। যাত্রার ছোটফণী তথা ফণিভূষণ মতিলাল যাত্রা করতে এসেছেন রাঢ়বঙ্গে। খবর পেয়ে রাঢ়বঙ্গের অন্যতম যাত্রাশিল্পী অশ্বিনী বন্দ্যোপাধ্যায় দেখা করতে এসেছেন তাঁর সঙ্গে। অশ্বিনীকে দেখে গুরু ফণী বলে উঠলেন— ‘তুই কী হয়েছিস রে অশ্বিনী। ‘কোহিনুর’ বইয়ে গোলাম কাদের আবার ‘রামপ্রসাদে’ রামপ্রসাদ! এ যে আমার বাপ চোদ্দপুরুষেও পারবে না রে। আমি তোর গুরু! না, তুই আমার গুরু। তোর জন্য যে আমার বাঁকুড়া মেদিনীপুর ঢোকা দায় হয়ে পড়ল রে অশ্বিনী।’— বলেই জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। পেশাগত দ্বন্দ্বে যখন বর্তমানে চারদিকে একে অপরকে হেয় করার অবিরাম চেষ্টা, সেখানে এমন হৃদয়ের অভিব্যক্তি ওই কুবচনের বিরুদ্ধে বলিষ্ট ছবি।
তবে এ অতীতের ইতিহাস। এই শতাব্দীর প্রথম থেকেই যাত্রার সেই গৌরব ম্লান। বিশ্বায়ন সৃষ্ট সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলা যাত্রাশিল্পের নাভিশ্বাস উঠেছে। যাত্রার এই দুরবস্থায় অনেক সমালোচকই নামী দামী পত্রপত্রিকায় সেই শোক বিলাপও গেয়ে আসছেন। কিন্তু যাত্রার এই এপিটাফ কি নিরাপদ দূরত্বে বসে শৌখিনের সমীক্ষা নয়! কেন না এই মাঘ-ফাগুনের রাতেও কান পাতলে শোনা যায় যাত্রার সংলাপ। যাত্রাশিল্পের গলা টেপা হলেও মরেনি এখনও। ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে সেই জমি আস্তে আস্তে ফিরে পাচ্ছে যাত্রা।
কিন্তু কেন এই আশাবাদ! প্রথমত, যাত্রার দীর্ঘপথে আছে সুমহান লড়াই— পরিবর্তনের ইতিহাস। একদা কৃষ্ণযাত্রা রাসলীলার হাত ধরে যে নাটমন্দিরে যাত্রার পরিক্রমা, খোলা মাঠে যার বিস্তৃতি, মাই-টেপ-আলো সংযোগে প্রসেনিয়াম মঞ্চে যার স্বর্ণযুগ, সেই সবেরই পিছনে আছে মাটি মানুষের নিবিড় টান। যাত্রাশিল্পের রূপান্তরের পিছনে আছে সৃষ্টিশীল জনমুখী প্রয়াস। দ্বিতীয়ত, যাত্রার সঙ্গে যুক্ত এখনও এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা এই শিল্পকে কেবলমাত্র মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে দেখেন না। যাত্রাই তাঁদের জীবন। যাত্রা শেষ না হয়ে যাওয়ার এঁরাই কর্ণধার। যাত্রার দীনেশ নন্দী, মাখনলাল নট্টরা না থাকলেও তাঁদের দেখানো পথ ঢাকা পড়েনি এখনও— এমনই অভিমত দিয়েছিলেন যাত্রা-অন্তপ্রাণ রমেন পালিত। তাঁরই কথার প্রতিধবনি আকাশবাণী যাত্রা সংস্থার জনৈক কর্তার মুখে। তাঁর কথায় ২০০৫-১০ সালে জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টিভি সংস্কৃতির প্রভাবে ৪০-৪৫টাতে নেমে এসেছিল। বিগত কয়েকটি বছরে তা আরো কমে যায়, কিন্তু এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে।’ আসলে এমন কিছু প্রযোজক আছেন যাঁদের সঙ্গে যাত্রার নাড়ির টান।
যাত্রার আকর্ষণ কমে যাওয়ার পিছনে যে কারণগুলি চিৎপুর থেকে ভেসে এসেছে তার অগ্রভাগে আছে টিভির আকর্ষণ। বিখ্যাত গায়ক শিল্পী খোকন ব্যানার্জী (নট্ট কোম্পানিখ্যাত) এক দশক আগে সোচ্চারভাবে এই ভাবনা জানিয়েছিলেন প্রতিবেদককে। অন্যদিকে টিভির প্রভাবকে অন্যতম কারণ মানতে নারাজ ছিলেন যাত্রাসম্রাট ত্রিদিব ঘোষ (অধুনাপ্রয়াত)। তাঁর মতে ভালো পালাকার এবং যোগ্য শিল্পীর অভাব এর অন্যতম কারণ। কথাটা যে সত্যি তার অন্যতম উদাহরণ অনল-কাকলির বর্তমান সফল মঞ্চায়ন। এই জুটি মানেই প্যান্ডেল ফুল, মরশুমভর বুকিং। যাত্রা যে এখন দক্ষ শিল্পীর অভাবেই পিছিয়ে পড়ছে, মেনে নিলেন আকাশবাণীর ম্যানেজার চন্দন প্রধান আনন্দভারতীর রবীন্দ্রনাথ হালদার বিনোদ সাউরা। শেখর গাঙ্গুলি, শিবদাস মুখার্জী, ইন্দ্র লাহিড়ি, শান্তিগোপাল প্রয়াত, যাদের নামের টানেই প্যান্ডেল ভর্তি হয়ে যেত। ছন্দা চ্যাটার্জি, বর্ণালী ব্যানার্জী, বীণা দাসগুপ্ত, বেলা সরকারের মতো অভিনেত্রীর অভাব প্রকট।
আর পালাকার! বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যাত্রাকে উন্নীত করেছিলেন পালা সম্রাট ব্রজেন দে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ, বিটি, করে যাত্রায় এসেছিলেন তিনি। তাঁর ‘বাঙালী’ যাত্রাপালা এক ইতিহাস। ময়মনসিংহ গীতিকাকে অবলম্বন করে তাঁর সোনাই দীঘি পালা শুধু মঞ্চে সাড়া ফেলেনি, তার রেকর্ডও বের হয়। পরবর্তী ক্ষেত্রে সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে যাত্রাকে জনপ্রিয় করেছিলেন ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ‘অচল পয়সা’, ‘মা মাটি মানুষ’ অমর সৃষ্টি বলা যেতে পারে। ছিলেন আনন্দময় বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যপ্রকাশ দত্ত, পুরানো পারদর্শী দুলাল চট্টোপাধ্যায়। উৎপল দত্তের যোগদানে ঘটে ব্যাপক পরিবর্তন। তাঁর লেখা ‘রাইফেল’, ‘নীলরক্ত’, ‘দিল্লী চলো’, ‘মুক্তিদীক্ষা’, ‘সন্ন্যাসীর তরবারি’, ‘স্বাধীনতার ফাঁকি’— যাত্রাশিল্পে নিয়ে আসে রাজনৈতিক জনচেতনার উণ্মেষ। ছিলেন শম্ ভুবাগের মত নাট্যকার। শম্ভু বাগ–শান্তি গোপাল জুটির সাফল্য ছড়িয়ে পড়েছিল বিদেশেও। শান্তিগোপালকে নিয়ে গিয়েছিল রাশিয়া সরকার। বলা বাহুল্য এই সব সাফল্যের পিছনে ছিল পালাকারদের অনন্য ভুমিকা। কিন্তু বর্তমান যাত্রা শিল্পে সেই সব গুণী নাট্যকার নেই। একটি সফল পালা রচনা করতে গেলে যে অধ্যবসায়, জীবনবীক্ষা এবং মননচর্যার প্রয়োজন, তা আজ নেই বললেই চলে। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে, বছর আঠারো আগেকার কথা, গ্রামের আসরে অনল চক্রবর্তী বলে চলেছেন যাত্রার ডায়ালগ। কয়েকটি সিন চলার পরই সামনের সারি থেকে একজন উঠে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলে চললেন যাত্রার পরবর্তী ঘটনা, যা একটা হিন্দি সিনেমার হুবহু নকল। এ অপমান তাঁর ছিল না, ছিল সমগ্র যাত্রাশিল্পের অপমান, আর তখন থেকেই এই অনুভবী শিল্পী নিজেই পালাকার। এগুলো সবই যাত্রা পিছিয়ে পড়ার কারণ। তবে এই দশার মধ্যেও জানা গেল কিছু শুভ সংবাদ।
চিৎপুর যাত্রা জগতের হাল হকিকত থেকে জানা যাচ্ছে যে, গত তিন বছর করোনাকাল থেকে অন্যান্য শিল্পের মতই যাত্রারও দুর্দিন গিয়েছে, তবে এবারে পরিস্থিতি অনেক ভালো। যাত্রাকর্মী ইউনিয়নের সম্পাদক হারাধন রায়ের (যিনি যাত্রা দলের প্রযোজকও) কাছে শোনা গেল এক নতুন আশাব্যঞ্জক তথ্য। মফস্বল ও গ্রাম বাংলার প্রত্যেকটি মেলায় ‘বসেছে নাকি যাত্রার আসর’। অবশ্যই যাত্রার পক্ষে এ এক শুভ সংবাদ। তাঁর কথায় চিৎপুরের বর্তমানে ৪৮টি দলেরই ব্যবসা যথেষ্ট ভালো, এসআইআরের ঝামেলা সত্বেও অনেক দল ১০০টির বেশি শো করে ফেলবে। তাঁর কথায়, বর্তমান সরকার যাত্রাশিল্পের পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী। পুরনো দুঃস্থ শিল্পীদের অনুদানের সঙ্গে সঙ্গে, হয়েছে যাত্রা অ্যাকাডেমি। গ্রামাঞ্চলে যাত্রার অনুমতি পাওয়া এখন অনেক সুবিধাজনক। এখন প্রয়োজন ভালো পালা এবং ভালো অভিনয়। লোকসংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম যাত্রার সঙ্গে মানুষের আত্মিক টান। তাই ব্যবসার নিরিখে এই শিল্প কিছুটা পিছু হঠলেও, জীবন ও মাটির টানেই এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যান পূর্বস্থলীর বিধায়ক তথা মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ, দুর্গাপুরের ফরিদপুরের সনৎ মণ্ডলের মত নিখাদ যাত্রাপ্রেমী ও শিল্পীরা। লোকসংস্কৃতির পূর্ণ চেতনার ঘাটে যাত্রা থেমে নেই, কয়েক বছর আগে যাত্রাশিল্পী অশ্বিনী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আরামবাগের বাসুদেবপুর মোড়ে বসেছে আবক্ষ মূর্তি— তাঁর নামে একটি রাস্তাও হয়েছে। তবুও বলব আমাদের যাত্রা শেষ নয়, যাত্রা চলছে, চলবে।
Advertisement



