• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 3 November, 2026

ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি আমলাতন্ত্র

ভারতের আমলাতন্ত্রে এখনও বহু সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান অফিসার রয়েছেন। তাঁদের কাজ প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখে। কিন্তু এই ধরনের অফিসার যেন ব্যতিক্রম হয়ে না থাকেন। তাঁদের যথাযথ সম্মান ও কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে। অসৎ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আধিকারিকদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি আমলাতন্ত্র

Photo: Pexels

ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি হল তার আমলাতন্ত্র। দেশের নীতি ও পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, আইন কার্যকর করা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব মূলত আমলাদের ওপরেই থাকে। তাই প্রশাসনের দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা ও সততা— এই তিনটি গুণের ওপর দেশের শাসনব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভরশীল। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সচিব টি ভি সোমনাথন আমলাদের কিছু খারাপ অভ্যাস ও আচরণের কথা তুলে ধরে তাঁদের কাজের মান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে আমলাদের দেরি করার প্রবণতা, অধস্তন কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সহকর্মীদের প্রতি অসম্মান এবং অপ্রয়োজনীয় বৈঠকের মতো বিষয় উঠে এসেছে। নিঃসন্দেহে এই অভ্যাসগুলি প্রশাসনের কাজের ক্ষতি করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আমলাতন্ত্রের আসল সমস্যাগুলি কি শুধু এই কয়েকটি আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সততার অভাব এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাব। অনেক সময় কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার কথা মাথায় রেখে। কোথাও অর্থের বিনিময়ে, কোথাও উপহার বা অন্য কোনও সুবিধার বিনিময়ে সরকারি কাজের গতিপথ বদলে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনও ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থা কোনও বিশেষ সুবিধা দিতে বাধ্য হয়। এই ধরনের দুর্নীতি শুধু প্রশাসনের ক্ষতি করে না, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকেও দুর্বল করে দেয়।

আমলাদের খারাপ ব্যবহার অবশ্যই নিন্দনীয়। অধস্তন কর্মীদের অপমান করা, মহিলা সহকর্মীদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা কিংবা নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন থাকা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু একজন আমলা ভদ্রভাবে কথা বলছেন, সময়মতো অফিসে আসছেন এবং দ্রুত ফাইলে সই করছেন— এতেই কি তাঁকে আদর্শ আমলা বলা যায়? যদি তাঁর সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করে, যদি তিনি প্রভাবশালীদের অন্যায় আবদার মেনে নেন, তাহলে তাঁর বাহ্যিক ভদ্রতা প্রশাসনের কোনও উপকারে আসে না। বরং দক্ষতার আড়ালে অসততা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন, দেশের আমলারা হবেন সৎ, দক্ষ, নির্ভীক এবং দায়িত্বশীল। তাঁরা কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, দেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে কাজ করবেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনও সিদ্ধান্ত ভুল হলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেও তাঁরা পিছপা হবেন না। অর্থাৎ একজন আমলার কাজ শুধু সরকারের নির্দেশ পালন করা নয়, প্রয়োজনে সরকারকে সঠিক পথ দেখানোও।

আজ সেই আদর্শ কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অনেক সময় দেখা যায়, যে অফিসার সৎভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে চান, তাঁকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। কখনও তাঁকে ঘন ঘন বদলি করা হয়, কখনও তাঁর কাজের মূল্যায়ন হয় রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠিতে। অথচ একজন অফিসারের যোগ্যতা বিচার করা উচিত তিনি কতবার বদলি হয়েছেন, তা দিয়ে নয়; বরং তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি পদে তিনি কী কাজ করেছেন, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা দিয়ে।

ভারতের আমলাতন্ত্রে এখনও বহু সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান অফিসার রয়েছেন। তাঁদের কাজ প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখে। কিন্তু এই ধরনের অফিসার যেন ব্যতিক্রম হয়ে না থাকেন। তাঁদের যথাযথ সম্মান ও কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে। অসৎ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আধিকারিকদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

মনে রাখতে হবে, সরকারি পদ কোনও ব্যক্তিগত ক্ষমতা ভোগের সুযোগ নয়, এটি জনসেবার দায়িত্ব। তাই আমলাতন্ত্রের সংস্কার করতে হলে শুধু কাজের গতি বাড়ানোর কথা বললে চলবে না, সততা ও নৈতিকতার প্রশ্নটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষতা প্রশাসনকে দ্রুত চালায়, কিন্তু সততা তাকে সঠিক পথে চালিত করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে এই দ্বিতীয় গুণটির গুরুত্ব কোনও অংশেই কম নয়।