• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 2 August, 2026

মুদ্রায় বৃহত্তর নেপালের মানচিত্র, দিল্লি-কাঠমান্ডু কূটনৈতিক টানাপোড়েন

নেপালের এক টাকার নতুন মুদ্রাকে ঘিরে যে বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে দানা বেঁধেছে, তা নিছক একটি কয়েনের নকশা সংক্রান্ত বিতর্ক নয়

মুদ্রায় বৃহত্তর নেপালের মানচিত্র, দিল্লি-কাঠমান্ডু কূটনৈতিক টানাপোড়েন

প্রতীকী ছবি (Photo: iStock)

নেপালের এক টাকার নতুন মুদ্রাকে ঘিরে যে বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে দানা বেঁধেছে, তা নিছক একটি কয়েনের নকশা সংক্রান্ত বিতর্ক নয়— বরং এর গভীরে রয়েছে বহু পুরনো ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ার সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন। কাঠমান্ডুর সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র মুদ্রায় বহাল রাখা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যখন শোনা যাচ্ছিল, নেপাল সরকার সেই মানচিত্র সরানোর পথে এগোচ্ছে, তখন হঠাৎ অবস্থান বদল অনেকের কাছেই কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি— হিমালয়ের কোলে অবস্থিত প্রায় ৩৭০ বর্গকিলোমিটারের একটি কৌশলগত অঞ্চল। এই অঞ্চলটি ভারত, নেপাল এবং চিনের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত হওয়ায় এর গুরুত্ব বহুমাত্রিক। সামরিক, বাণিজ্যিক এবং ধর্মীয়— তিন ক্ষেত্রেই এই অঞ্চলের তাৎপর্য অপরিসীম। ফলে মানচিত্রের রেখা এখানে শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ভারত ও নেপালের এই বিরোধের শিকড় পৌঁছে যায় ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তিতে। ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে নেপালের সেই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সীমান্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘মহাকালী’ বা কালী নদীকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত নদীর উৎস নির্ধারণ নিয়ে। নেপালের দাবি, নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা থেকে, যা পশ্চিম দিকে অবস্থিত। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান, কালী নদীর উৎস কালাপানির কাছাকাছি একটি ঝরনা। এই ভিন্ন ব্যাখ্যার ফলে সীমান্তের দাবিতেও ফারাক তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু ২০২০ সালে তা নতুন মাত্রা পায়। ভারত যখন উত্তরাখণ্ডের ধারচুলা থেকে লিপুলেখ পাস পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উদ্বোধন করে, তখন নেপাল তীব্র আপত্তি জানায়। নেপালের অভিযোগ ছিল, ওই রাস্তা তাদের দাবিকৃত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এর পরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার একটি সংশোধিত রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানিকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। সেই মানচিত্র শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পায়। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় প্রতীক, পাঠ্যপুস্তক এবং এমনকি মুদ্রাতেও এই মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একজন তরুণ নেতা হিসেবে তাঁর উত্থান হয়েছিল জাতীয়তাবাদী আবেগকে সামনে রেখে। কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন তিনি ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র প্রদর্শন থেকে শুরু করে ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মতো পদক্ষেপে আলোচনায় এসেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর নীতিতে একটি বাস্তববাদী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকেও তিনি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ভারতও তাঁর নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেয়। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে নেপালের অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য ভারতের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভারতের উপর নেপালের নির্ভরতা অনস্বীকার্য।
কিন্তু এই বাস্তববাদী কূটনীতির মাঝেই জাতীয়তাবাদী আবেগ বার বার সামনে চলে আসছে। মুদ্রার মানচিত্র পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তারই একটি উদাহরণ। প্রথমে বলা হয়েছিল, বিতর্কিত মানচিত্র সরিয়ে সেখানে মুস্তাংয়ের একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের ছবি রাখা হবে। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ, সরাসরি ভূখণ্ডগত দাবি থেকে সরে না এসে প্রতীকী স্তরে একটি নমনীয়তা দেখানো হচ্ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। বিরোধী দল এবং জনমতের চাপে সরকার পিছু হটে। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে যায়, নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ এখনও একটি শক্তিশালী ফ্যাক্টর। যে কোনও সরকারই এই আবেগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারে না। ফলে বালেন্দ্র শাহের মতো নেতাকেও কূটনৈতিক বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি বরাবরই এই অঞ্চলকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে এসেছে এবং একতরফা মানচিত্র পরিবর্তনকে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে ভারত এই সমস্যার সমাধান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে করতে চায়। তবে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের যে কোনও প্রচেষ্টাকে ভারত স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে। লিপুলেখ ইস্যুতে নেপাল যখন চিন বা অন্য দেশের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দেয়, তখন ভারত কড়া বার্তা দেয়— এটি দুই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
চিনের ভূমিকাও এখানে উপেক্ষা করা যায় না। নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও চিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো প্রকল্পে অংশগ্রহণ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। উচ্চ সুদের ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক সহায়তাকে গুরুত্ব দেওয়া, বা অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলার চেষ্টা— এসবই নেপালের কৌশলগত পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়। তবে ভারত-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে দাঁড়িয়ে নেপালের জন্য এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়।
মুদ্রার মানচিত্র নিয়ে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই একাধিক বার্তা বহন করে। প্রথমত, এটি দেখায় যে নেপাল তাদের ভূখণ্ডগত দাবিতে কোনও আপস করতে রাজি নয়, অন্তত প্রতীকী স্তরেও নয়। দ্বিতীয়ত, এটি প্রমাণ করে যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ অনেক সময় কূটনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তৃতীয়ত, এটি ভারত-নেপাল সম্পর্কের জটিলতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল সীমান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ— সব মিলিয়ে ভারত-নেপাল সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। উন্মুক্ত সীমান্ত, পারিবারিক সম্পর্ক, শ্রমবাজারে পারস্পরিক নির্ভরতা— এই সবকিছুই দুই দেশকে একটি বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। ফলে কোনও একটি ইস্যু পুরো সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।
বরং বলা যেতে পারে, এই ধরনের বিতর্ক দুই দেশের জন্যই একটি পরীক্ষা। কীভাবে তারা মতপার্থক্যকে সামলে সহযোগিতার পথ বজায় রাখবে, সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ। নেপালের জন্য চ্যালেঞ্জ হল— জাতীয়তাবাদী আবেগকে সম্মান জানিয়ে কীভাবে বাস্তববাদী কূটনীতি চালানো যায়। আর ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ— প্রতিবেশীর সংবেদনশীলতা বুঝে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— মুদ্রার মানচিত্র সরানো বা না সরানোই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হল, দুই দেশ কি এই বিতর্ককে আলোচনার টেবিলে এনে একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোতে পারবে? নাকি প্রতীকী সংঘাতই বার বার সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলবে?
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে ছোট দেশগুলির জন্য বৃহৎ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক সবসময়ই সংবেদনশীল, সেখানে নেপালের পদক্ষেপকে শুধুমাত্র একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত হিসাবের অংশ, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজন— সবকিছুই জড়িয়ে রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র নিয়ে এই বিতর্ক শুধু অতীতের বিরোধকে নতুন করে সামনে আনেনি, বরং ভবিষ্যতের কূটনৈতিক পথও নির্ধারণ করছে। দিল্লি ও কাঠমান্ডু— দুই রাজধানীকেই এখন বুঝতে হবে, প্রতীকী অবস্থানের বাইরে গিয়ে বাস্তব সমাধানের দিকে এগোনোই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। না হলে একটি ছোট্ট কয়েনই দুই দেশের সম্পর্কের বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থাকবে।