• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 30 July, 2026

সদয় হল ইতিহাস, কয়লাকাণ্ডে কলঙ্কমুক্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে কয়লা

সদয় হল ইতিহাস, কয়লাকাণ্ডে কলঙ্কমুক্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে কয়লা বরাদ্দ সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ‘ক্লিন চিট’ প্রদান। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা বিতর্ক, অভিযোগ এবং আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে শীর্ষ আদালত সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করেছে। এর ফলে শুধু একটি মামলা শেষ হয়নি— বরং উঠে এসেছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রশ্ন।
এই ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে গেলে আমাদের একটু পিছনে ফিরে দেখতে হবে। ২০০৫ সালে ওড়িশার তালবিরা-২ ও ৩ কয়লাখনি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল হিন্ডালকো ইন্ডাস্ট্রিজ-সহ কয়েকটি সংস্থাকে। সেই সময় কেন্দ্রের ক্ষমতায় ছিল ইউপিএ সরকার এবং কয়লা মন্ত্রকের দায়িত্ব ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের হাতে। পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে, এই বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং স্ক্রিনিং কমিটির সুপারিশ অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই তদন্ত শুরু করে এবং ২০১৪-১৫ নাগাদ বিষয়টি আদালতের সামনে আসে। সেই সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— যদি এই বরাদ্দে অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে দায় কার? প্রশাসনিক স্তরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি তার দায় এড়াতে পারে? বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই ছিল?
২০১৫ সালে একটি ট্রায়াল কোর্ট মনমোহন সিংহকে তলব করার নির্দেশ দেয়। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোড়ন তোলে। কারণ, একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ নজিরবিহীন ঘটনা। যদিও সিবিআই তখনই একটি ক্লোজার রিপোর্ট জমা দিয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু ট্রায়াল কোর্ট সেই রিপোর্ট খারিজ করে দেয়।
এই জায়গাতেই শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। মনমোহন সিংহ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং সমনের ওপর স্থগিতাদেশ পান। প্রায় এক দশক ধরে বিষয়টি বিচারাধীন থাকে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর প্রায় দু’বছর পরে এসে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার নিষ্পত্তি করল এবং সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে জানিয়ে দিল— এই মামলায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি দায় প্রমাণিত হয়নি।
এই রায়ের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত, আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ট্রায়াল কোর্টের কাছে এমন কোনও জোরালো কারণ ছিল না, যার ভিত্তিতে সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট খারিজ করা যায়। অর্থাৎ, তদন্তকারী সংস্থা যখন বলে যে, যথেষ্ট প্রমাণ নেই, তখন আদালতকে তা খারিজ করতে হলে শক্তিশালী যুক্তি দেখাতে হবে। এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের মামলাগুলির ক্ষেত্রেও একটি অভিমুখ দেখায়।
দ্বিতীয়ত, এই রায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ফৌজদারি দায়ের মধ্যে পার্থক্যকে সামনে আনে। মনমোহন সিংয়ের পক্ষে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, কয়লাখনি বরাদ্দ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সে সময়ে এমন কোনও আইন ছিল না যা এই ধরনের বরাদ্দকে বেআইনি ঘোষণা করে। ফলে, কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হলে তার পেছনে স্পষ্ট দুর্নীতি বা বেআইনি উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের রায় এই যুক্তিকেই কার্যত স্বীকৃতি দিয়েছে।
তৃতীয়ত, এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলগুলি ‘কয়লা কেলেঙ্কারি’কে একটি বড় দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে যাওয়াটা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু আদালতের এই রায় সেই রাজনৈতিক বয়ানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আইনি দায়মুক্তি এবং রাজনৈতিক দায়মুক্তি এক নয়। কোনও ব্যক্তি আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, তার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্যায়ন আলাদা হতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল সিবিআইয়ের ভূমিকা। তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে সিবিআইয়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এই মামলায় তারা প্রথম থেকেই বলেছিল যে, মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু ট্রায়াল কোর্ট সেই মতামত গ্রহণ করেনি। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইয়ের অবস্থানকে সঠিক বলে মেনে নেওয়ায় প্রশ্ন ওঠে— তদন্তকারী সংস্থার মূল্যায়ন কি প্রথম থেকেই যথাযথ ছিল? যদি তাই হয়, তাহলে এত বছর ধরে মামলা চলল কেন? এই প্রসঙ্গে বিচারব্যবস্থার ধীরগতিও আলোচনার দাবি রাখে। একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে যদি দশ বছরেরও বেশি সময় লাগে, তাহলে তা শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্যই নয়, গোটা বিচারব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন এই দীর্ঘসূত্রিতার ফলে আরও বেশি প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
তবে এই ঘটনার আরেকটি মানবিক দিকও রয়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শেষ সাংবাদিক সম্মেলনে মনমোহন সিং বলেছিলেন— ‘সমসাময়িক সংবাদমাধ্যম ও সংসদের বিরোধীদের চেয়ে ইতিহাস আমার প্রতি বেশি সদয় হবে।’ সেই উক্তি আজ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জীবদ্দশায় যিনি নানা সমালোচনা, অভিযোগ এবং রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন, মৃত্যুর পরে তিনি আদালতের কাছ থেকে নির্দোষ ঘোষিত হলেন। অনেকের কাছে এটি ইতিহাসের ন্যায়বিচার বলেই মনে হতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই ধরনের মামলায় দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া কীভাবে আরও স্বচ্ছ এবং দ্রুত করা যায়? প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা কীভাবে নির্ধারিত হবে? রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কোথায় শেষ হবে এবং আমলাতন্ত্রের ভূমিকা কোথায় শুরু হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে, কয়লা বরাদ্দ বা পরিবেশগত ছাড়পত্র সংক্রান্ত অন্যান্য অভিযোগও আমাদের মনে রাখতে হবে। হিন্ডালকো সংক্রান্ত পরিবেশ ছাড়পত্রের মামলায় সিবিআইয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে দেখা যায় যে, এই খাতে অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট মামলায় ক্লিন চিট পাওয়া মানেই পুরো ব্যবস্থাকে নির্দোষ বলা যায় না।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়— আইনের চোখে সকলেই সমান, এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে হলে তদন্ত, বিচার এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত, মনমোহন সিংয়ের ক্ষেত্রে ইতিহাস হয়তো কিছুটা হলেও সদয় হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির দায়মুক্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার প্রতিফলন— যেখানে আইন, রাজনীতি এবং প্রশাসন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর করে তোলাই এখন বিশেষ প্রয়োজন।