• facebook
  • twitter
Thursday, 26 March, 2026

মধ্যরাতের তালিকা

নির্বাচন কমিশনের একাংশ অবশ্য দাবি করেছে যে, নাম অন্তর্ভুক্ত বা বর্জনের সিদ্ধান্তে তাদের সরাসরি ভূমিকা নেই। কিন্তু এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?

প্রতীকী চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, তার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া এবং সম্প্রতি প্রকাশিত প্রথম সম্পূরক তালিকা। এই তালিকা প্রকাশের সময়, পদ্ধতি এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি, সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি তালিকা গভীর রাতে প্রকাশ করা হল কেন। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে স্বচ্ছতা, সময়নিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতা প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তালিকা প্রকাশের সময় নিয়ে অযথা রহস্য তৈরি হয়েছে। ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’-র যুক্তি দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় যে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের অভাব কি এর পেছনে কাজ করেনি?

Advertisement

এই দেরিতে প্রকাশের ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে যাঁরা ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর আওতায় ছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। কতজনের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ গেল, কতজন অন্তর্ভুক্ত হলেন, এই মৌলিক তথ্যও দীর্ঘ সময় ধরে স্পষ্ট করা যায়নি। অনুমানভিত্তিক সংখ্যা ঘুরপাক খেয়েছে, অথচ সরকারি স্তরে পরিষ্কার ব্যাখ্যার অভাব আরও জটিল করেছে পরিস্থিতিকে।

Advertisement

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও স্বাভাবিকভাবেই তীব্র হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেছেন এবং ‘হয়রানি’-র অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক তরজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ১৫০ জন ভোটারের মৃত্যুর খবর, যা এই অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি, পরিস্থিতির গভীরতা, সংবেদনশীলতা ও সেইসঙ্গে ভোটারদের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তারই পরিচয় দেয়। একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যদি নাগরিকের মানসিক স্থিতি নষ্ট করে দেয়, তবে তা নিছক ‘রুটিন’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

নির্বাচন কমিশনের একাংশ অবশ্য দাবি করেছে যে, নাম অন্তর্ভুক্ত বা বর্জনের সিদ্ধান্তে তাদের সরাসরি ভূমিকা নেই। কিন্তু এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য? একটি প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, তার সময়সীমা, তথ্যপ্রকাশের ধরন, এসবই তো কমিশনের আওতায় পড়ে। সেই জায়গায় যদি সংবেদনশীলতার অভাব দেখা যায়, তবে দায় এড়ানো যায় না। বরং এই ঘটনাপ্রবাহ কমিশনের প্রতি ‘অহংকার’ বা ‘জবাবদিহিতার অভাব’-এর অভিযোগকে আরও জোরদার করছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বা যাঁরা আপত্তির মুখে পড়েছেন, তাঁদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কতটা কার্যকর হবে? আদালতের তত্ত্বাবধানে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন যখন দ্বারপ্রান্তে, তখন এই আপিল প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ভোট হয়ে গেলে সেই নাগরিকের ভোটাধিকার কার্যত খর্ব হবে না কি? গণতন্ত্রে ভোটাধিকার কেবল আইনি অধিকার নয়, এটি নাগরিক সত্তার মূল ভিত্তি।

এসআইআর প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই বিতর্কিত। আদালতের হস্তক্ষেপ এবং নির্দেশ ছাড়া এটি এগোতে পারেনি— এটাই প্রমাণ করে যে প্রক্রিয়ার ভিত কত দুর্বল ছিল। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া হল না। বরং একটি নিয়মিত প্রশাসনিক কাজকে এমনভাবে পরিচালনা করা হল, যাতে তা সাধারণ মানুষের মনে ভয়, সন্দেহ এবং ক্ষোভের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তির। একটি নিরপেক্ষ, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার যে বিশ্বাসযোগ্যতা, তা আজ প্রশ্নের মুখে। ‘পক্ষপাতদুষ্টতা’-র ভাবনা ও আলোচনা যদি জনমনে জায়গা করে নেয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থা হারালে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই সন্দেহের আবর্তে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে জরুরি হল দ্রুত স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা। কতজন ভোটার তালিকায় রয়েছেন, কতজন বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের আইনি প্রতিকার কীভাবে ও কত দ্রুত নিশ্চিত করা হবে— এই সমস্ত তথ্য স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো অপরিহার্য।

সময় কিন্তু দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ভোটার এবং প্রশাসন— উভয়ের কাছেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল বিশ্বাস পুনর্গঠন। নির্বাচন কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়, এটি গণতন্ত্রের আত্মা। সেই আত্মাকে আঘাত করা হলে তার প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য।

Advertisement