• facebook
  • twitter
Monday, 11 May, 2026

মমতার প্রস্তাব

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, নতুন চিন্তা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সৎ প্রচেষ্টা।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল শুধু একটি রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনাই নয়, বরং দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সমীকরণেরও পুনর্মূল্যায়ন। এই প্রেক্ষাপটে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বদলীয় জোটের আহ্বান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত বামপন্থী শিবিরের দৃঢ় প্রত্যাখ্যান এই আহ্বানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

মমতার বক্তব্যে এখন প্রধান সুর— বিজেপি-বিরোধিতা। তাঁর মতে, তৃণমূল কংগ্রেসই ছিল বিজেপির বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াইয়ের মুখ এবং এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলাই সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু এই আহ্বানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআইএম।

Advertisement

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কৌশল ছিল বামপন্থী শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে কোণঠাসা করা। সেই সময়ে বামপন্থীদের পার্টি অফিস দখল, কর্মীদের উপর আক্রমণ এবং সংগঠনিক ভাঙনের অভিযোগ বারবার উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মমতার আজকের ঐক্যের ডাক অনেকের কাছেই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের নিদর্শন বলে মনে হচ্ছে। বাম নেতারা তাই প্রশ্ন তুলছেন— যে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব একসময় বিরোধীদের রাজনৈতিক অস্তিত্বই মুছে দিতে চেয়েছিল, তার ডাকে কি সত্যিই বিশ্বাস রাখা সম্ভব?

Advertisement

এই প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছেন সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী। তাঁর মতে, বিজেপি অবশ্যই একটি বিপজ্জনক শক্তি, কিন্তু তাকে প্রতিরোধ করার জন্য যে বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারিয়েছেন। একই সুর শোনা গিয়েছে আরও এক সিপিআইএম নেতা গৌতম দেবের পুরনো মন্তব্যেও, যেখানে তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন যে, একদিন তৃণমূলকেই বামেদের দ্বারস্থ হতে হবে।

বামপন্থীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পথ তৈরি হয়েছে মমতার শাসনকালেই। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু রাজনীতির দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব— এই সবই বিজেপির পক্ষে মাটি তৈরি করেছে বলে তাঁদের দাবি। ফলে আজকের পরিস্থিতিকে তারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবেই দেখছেন।

এদিকে, নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মমতার এই আহ্বানকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাঁর মতে, মমতা এখন রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। এই মন্তব্য অবশ্য রাজনৈতিক সৌজন্যের প্রতি সুবিচার না করলেও, বর্তমান ক্ষমতার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।

তৃণমূল শিবির অবশ্য এখনও নিজেদের অবস্থান থেকে সরেনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁরা নির্বাচনী কারচুপি ও ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের অভিযোগে সরব থাকতে চান। কিন্তু এই অভিযোগগুলিও বিরোধীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না, কারণ অতীতে একই ধরনের অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধেই উঠেছে।

রাজনীতিতে স্মৃতি খুব দীর্ঘস্থায়ী না হলেও, পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মনে গত এক দশকের অভিজ্ঞতা এখনও তাজা। তাই হঠাৎ ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ তত্ত্বে ভর করে বৃহত্তর ঐক্যের ডাক অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ও অস্বস্তিকর। বিশেষ করে বামপন্থীরা মনে করছে, আদর্শগত লড়াইকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এই আহ্বান এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কি নতুন কোনও বিকল্প শক্তির উত্থান সম্ভব? নাকি বিজেপি বনাম তৃণমূলের দ্বৈরথই আগামী দিনের একমাত্র বাস্তবতা হয়ে উঠবে? বামপন্থীদের অবস্থান থেকে স্পষ্ট, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক লাইন বজায় রাখতে চায় এবং মমতার সঙ্গে আপস করতে রাজি নয়।

অতএব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই জোট-আহ্বান আপাতত রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েছে। এটি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে, শক্তিকে নয়। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা একবার হারালে তা পুনরুদ্ধার করা কতটা কঠিন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, নতুন চিন্তা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সৎ প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র কৌশলগত জোট বা স্লোগানে সেই আস্থা ফিরে আসবে না— এ কথা আজ আরও স্পষ্ট।

Advertisement