হীরক কর
পশ্চিমবঙ্গ কি এই মুহূর্তে কোনো অদৃশ্য যুদ্ধের ময়দান, নাকি এক পরিকল্পিত শ্মশান? যে রাজ্যে শান্তির অতন্দ্র প্রহরী হয়ে আড়াই লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেই রাজ্যেই চারশো পার্টি অফিস জ্বলে ছাই হয়ে যায় কীভাবে? স্রেফ রাজনীতির রং দেখে কি মানুষের রক্তের দাম বদলে যায়? একদিকে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ককে প্রকাশ্যে খুন, অন্যদিকে হিংসার আগুনের লেলিহান শিখা শুধু ঘর পোড়াচ্ছে না, পুড়িয়ে মারছে আমাদের গণতন্ত্র আর বিবেককেও। ক্ষমতার এই রক্তক্ষয়ী দাবার চালে বোড়ে হচ্ছেন আপনি আর আমি। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই আগুনের শেষ কোথায়?
Advertisement
নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আড়াই দিন আগে, বুধবার রাতে কলকাতার উপকণ্ঠ মধ্যমগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে খুন করা হল। গুরুতর জখম তাঁর গাড়ির চালক বুদ্ধদেব বেরা হাসপাতালে।
Advertisement
পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কী হচ্ছে? কারা এই হিংসার কারিগর, আর কাদের প্রশ্রয়ে এই তাণ্ডব চলছে? ৪ মে ফলাফল ঘোষণার পর থেকে যে আগুনের লেলিহান শিখা আমরা দেখছি, তার দায় কার? শান্তিপূর্ণ ভোট করিয়ে প্রশংসা কুড়োনো পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে কি কার্যত দর্শকের ভূমিকায়? হ্যাঁ, সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা এখানেই,— রাজ্যে যখন আড়াই লাখ কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন, কাশ্মীর থেকে আনা সাঁজোয়া গাড়ি রাস্তায় চক্কর কাটছে, সেই অবস্থায় রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহায়ক খুন হন কী করে? এত সশস্ত্র বাহিনীর সামনেও কারা এত সাহস পায়? একটা গোটা রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য আড়াই লক্ষ সংখ্যাটা বিশাল। তাহলে এই বাহিনীর নাকের ডগায় বসে দিনের পর দিন হিংসা চলছে কীভাবে? কার ইশারায় এই ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে? যদি এই জওয়ানদের কাজই হয় শান্তি বজায় রাখা, তবে ব্যর্থতার দায় কেন তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বর্তাবে না? আমরা জানি, এই দায়বদ্ধতা কেউ নেবে না। কারণ, ব্যবস্থাটাই এখন দর্শকের ভূমিকায়।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিউজ চ্যানেল— সব জায়গায় হিংসার উত্তেজক ভিডিওর ছড়াছড়ি। অপরাধীদের মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের এক্স হ্যান্ডেল থেকে এমন কিছু ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, নরেন্দ্র মোদীর মুখোশ পরা এক ব্যক্তি একজন অনেকটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শাড়ি পরিয়ে, তার কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের ভায়োলেন্ট এক্সপ্রেশনের বহিঃপ্রকাশের মানে কী? কোনও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বুলডোজার নিয়ে দোকানপাট, শোরুম ভাঙচুর করা হচ্ছে। এই সব বীভৎস ভিডিও বারবার দেখা মানে নিজেকে এক চরম অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাই এগুলো স্রেফ খবর নয়, একটা মানসিক আঘাত।
শোনা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও তৃণমূল কর্মীরাই হাতে বিজেপির পতাকা নিয়ে নিজেদের দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালাচ্ছে! অর্থাৎ, বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ এতটাই অবারিত যে, মানুষ স্রেফ পোশাক বদলে নিজের ঘরেই আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি এখন এমন এক গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে, যেখানে কে কার লোক চেনা দায়। বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার টুইট করে দাবি করছেন— তৃণমূল কর্মীরাই নাকি নিজেদের নেতাদের ওপর এত ক্ষুব্ধ যে, ফল বেরোতেই বিজেপির পতাকা হাতে নিজেদের পার্টি অফিস পোড়াতে নেমে পড়েছে! ভাবা যায়? এই যে নিয়ন্ত্রনহীনতা, এই যে দায়বদ্ধতার অভাব— এটাই কি তবে পশ্চিমবঙ্গের ভবিতব্য?
সহায়ক-খুনের ঘটনার আগেই সন্ধ্যায় শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, ‘২০২১-এর বিধানসভা ও ২০২৩-এর পঞ্চায়েতের তুলনায় বড় অশান্তি হয়নি। শান্তি বজায় রাখুন।’ বঙ্গবাসীর উদ্দেশে বলেছিলে্ন, ‘আইন হাতে তুলবেন না। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী চোর, খুনি, ডাকাত, অত্যাচারীদের ব্যবস্থা হবে। বিজেপির সরকার দল-মত নির্বিশেষে, ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে গুন্ডা-দমন করবে।’
সাধারণত সরকার বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের গাড়ির সাইরেন নতুন সরকারের সুর ধরে। কিন্তু এখানে তো আড়াই লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে। তবে কি এ-রকম বেলাগাম হিংসার পেছনে অন্য কোনো চিত্রনাট্য আছে? রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য একটি চাঞ্চল্যকর ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কোনো বিজেপি কর্মী যদি হিংসায় জড়িয়ে পড়ে, তবে তাকে দল থেকে বের করে দেওয়া হবে। এমনকি তিনি মুখ্যসচিবকে অনুরোধ করেছেন, অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে যেন গ্রেফতার করা হয়।
শমীকবাবু আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেউ গালি দিলে তাকেও দল রেয়াত করবে না। প্রশ্ন হলো, এ কি স্রেফ সৌজন্য?
সবচেয়ে বড় ইঙ্গিতটা দিয়েছেন আরএসএস নেতা জিষ্ণু বসু। তিনি সংঘ কর্মীদের কাছে হিংসা না করার আবেদন জানিয়েছেন। কারণ হিসেবে বলছেন, হিংসা করলে রাজ্য আবার তৃণমূলের জঙ্গলরাজে ফিরে যাবে।
পশ্চিমবঙ্গে দলের ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গর্ব করে বলেছিলেন, এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কোনো প্রাণহানি হয়নি। কিন্তু সেই ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ছবিটা বদলে গেল। দুই পক্ষেরই রক্তের দাগ লেগেছে বাংলার মাটিতে:
বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক: তৃণমূলের এই পোলিং এজেন্টকে জনসমক্ষে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মারা হলো। পাশে মানুষ ছিল, কিন্তু ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি।
যাদব বর: হাওড়ার এই বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। বিজেপি আঙুল তুলছে তৃণমূল বিধায়ক সমীর পাঁজার দিকে। অন্যদিকে, সমীর পাঁজা আবার দাবি করছেন— বিজেপি সমর্থকরা তৃণমূল কর্মীদের ৯টি বাড়ি ভাঙচুর করেছে। পুলিশ বলছে, খুনের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকতে পারে, তবে রাজনীতির ছোঁয়াও স্পষ্ট। এই অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে বিচার। খুনিকে কি চেনা যাচ্ছে?
কলকাতার উপকণ্ঠ নিউ টাউনে বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডলের মৃত্যুর অভিযোগ উঠছে বিরোধীদের বিরুদ্ধে। আবার বীরভূমে তৃণমূল সমর্থক আবির শেখের হত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে আঙুল উঠছে বিজেপি সমর্থকদের দিকে। তবে বিজেপি যথারীতি সব অস্বীকার করে তদন্তের দাবি জানাচ্ছে।
এখানে দুই ধরনের ভিডিওর ছড়াছড়ি— একদল রাস্তায় নেমে সরাসরি তাণ্ডব চালাচ্ছে, আর অন্য দল সেই হিংসার ‘অভিনয়’ করে ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম, ট্রেন বোঝাই করে বুলডোজার আর জেসিবি মেশিন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ক্যাপশনে লেখা, বাংলার জন্য বুলডোজার রওনা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ কি তবে এতটাই মুখিয়ে ছিল যে, ফল বেরোতেই তারা হিংসাও করবে আবার সেই হিংসার নাটক করে উল্লাস করবে?
আমরা মাঝেমধ্যেই এআই-কে দোষ দিই যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে হিংস্র বানিয়ে দেবে। কিন্তু রাস্তায় নামা এই উন্মত্ত ভিড় আর ঘরে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই হিংসাকে সমর্থন জানানো মানুষগুলোর মগজ কারা ধোলাই করল?
পশ্চিমবঙ্গের এই হিংসাকে তাই কেবল একটা রাজ্যের গোলমাল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা আসলে সেই বৃহত্তর ব্যাধিরই একটা অংশ। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থে পুলিশ এখন ভিড়ের তাণ্ডবকে কার্যত ‘শিষ্টাচার’ বা স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে ধরে নিয়েছে। এটা শুধু পশ্চিমবঙ্গের একার গল্প নয়, ভারতের একাধিক রাজ্যে আজ এই ছবিটাই প্রামাণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই কি এখন ভারতীয় নাগরিকের পরম প্রাপ্তি? তাকে কি আর কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা উন্নত হাসপাতালের কথা ভাবায় না?
বিজেপি প্রথমবার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মভূমিতে জিতেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা দিতে চাইছিলেন না। যদিও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয় তার মুখ্যমন্ত্রীত্ব এমনিতেই ঘুচে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলেছেন, আমরাই জিতেছি। আমাদের জোর করিয়ে হারিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেন আমি রাজভবনে গিয়ে ইস্তফা দেব। তবে কি তিনি দাঙ্গাবাজদের উসকে দিতে চাইছিলেন?
জয়ের আনন্দ তো উৎসবের ভিডিওতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা দেখছি শুধু হিংসা, মলে ঢুকে ভাঙচুর, হুমকি ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা কি আসলে গোটা দেশকেই ভয় দেখানোর একটা চেষ্টা? মানুষের মনে এত ঘৃণা আর অস্থিরতা জমা ছিল যে, তারা জয়ের আনন্দটুকু পর্যন্ত উদযাপন করতে ভুলে গেল।
পশ্চিমবঙ্গের এই হিংসা একটা চরম সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল— মানুষ ‘পরিবর্তন’-এর আড়ালে আসলে ‘প্রতিশোধ’-এর নেশায় মত্ত ছিল। মনে রাখবেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মীর নিজের থেকে এতখানি সাহস হয় না যে সে একাই দাঙ্গাবাজ হয়ে উঠবে। দাঙ্গা কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে জ্যোতি বসু একবার বলেছিলেন, ‘সরকার চায় তাই হয়।’ এ কথার সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ একমত নই, তবু বলব, দাঙ্গা আসলে কখনও নিজে থেকে হয় না, বেদনাদায়ক ভয়ঙ্কর সত্যি হলো— গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে দাঙ্গা করানো হয়। প্রশাসন চাইলে মুহূর্তের মধ্যে যে কোনো অশান্তি থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু যখন দাঙ্গা চলতে দেওয়া হয়, বুঝতে হবে তার পেছনে কোনো বড় সমীকরণ কাজ করছে। আবার বলছি, সাধারণ মানুষ কখনও নিজে থেকে দাঙ্গাবাজ হয় না, তাদের উস্কে দিয়ে দাঙ্গার হাতিয়ার বানানো হয়।
Advertisement



