প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়, নেপালের সাম্প্রতিক হড়পা বান আবার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে কাদা, জল ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত মুছে দিতে পারে রাস্তা, ঘরবাড়ি, যোগাযোগব্যবস্থা, এমনকি মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের ধারণাটুকুও। কিন্তু সেই ভয়াবহতার মধ্যেই নয় দিন ধরে একটি সুড়ঙ্গের অন্ধকারে প্রাণ ধরে রেখে দুই শ্রমিকের ফিরে আসার ঘটনা আমাদের অন্য একটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়— জীবনকে রক্ষা করার মানুষের আকাঙ্ক্ষা কত গভীর, কত দুর্বার।
সঞ্জয় শাহ এবং কবীর মহারাজনের জীবিত উদ্ধার নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ ঘটনা। নয় দিন ধরে অন্ধকার সুড়ঙ্গে আটকে থাকা, বাইরে বেরোনোর পথ না থাকা, পর্যাপ্ত আলো ও খাবারের অভাব—সব মিলিয়ে তাঁদের পরিস্থিতি ছিল মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই। আন্তর্জাতিক টানেল বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স ঘটনাটিকে ‘অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক’ বলেছেন। সত্যিই, কখনও কখনও বাস্তবের কিছু ঘটনা যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে মানুষের বিস্ময়কে স্পর্শ করে।
এই কাহিনির সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক মুহূর্তটি সঞ্জয়ের নিজের বক্তব্যে— অন্য শ্রমিকদের প্রাণ বাঁচানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করেছিলেন। বিপদের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর অন্যদের বের করে দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই সুড়ঙ্গে আটকে পড়েন। একজন শ্রমিকের এই আত্মনিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপর্যয়ের সময় মানুষের প্রকৃত পরিচয় অনেক সময় তার পদমর্যাদায় নয়, অন্যের জন্য সে কতটা ঝুঁকি নিতে পারে তাতেই প্রকাশ পায়।
তারপর শুরু হয় অপেক্ষা। দেওয়াল ও পাইপে শব্দ করে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা, আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্র জপ— এসব যেন মৃত্যুর অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষুদ্র অথচ অবিচল প্রতিরোধ। সুড়ঙ্গের একটি অংশ পুরোপুরি জলে ডুবে না যাওয়ায় তৈরি হওয়া ‘এয়ার পকেট’ তাঁদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল; দেওয়াল থেকে চুঁইয়ে পড়া জল হয়তো তৃষ্ণা মেটানোর সামান্য অবলম্বন হয়েছিল। জীবনের কাছে তখন এতটুকুই যথেষ্ট— একটু বাতাস, কয়েক ফোঁটা জল এবং পাশে আর একজন মানুষের অস্তিত্ব।
কিন্তু এই অলৌকিক উদ্ধারের আনন্দ যেন আমাদের বৃহত্তর দায়িত্বের প্রশ্নটি আড়াল না করে। বিপর্যয়ের পর উদ্ধার অভিযান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিপর্যয়ের আগে প্রস্তুতি। বিশেষত সুড়ঙ্গ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, খনি বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা কোনও আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে না। প্রকল্পের গতি, উৎপাদনের লক্ষ্য কিংবা অর্থনৈতিক লাভ— কোনও কিছুই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় নয়।
দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে আগাম সতর্কবার্তা, দ্রুত ও বাধ্যতামূলক ‘ইভাকুয়েশন প্রোটোকল’, বিকল্প বেরোনোর পথ, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মহড়া থাকা আবশ্যক। প্রতিটি বড় প্রকল্পে এমন নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একজন শ্রমিককে অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করতে না হয়। এর জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।
আরও একটি নির্মম সত্য আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। যখন দুই শ্রমিক জীবন ফিরে পেয়েছেন, তখনও বহু পরিবার নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায়। কোথাও প্রতীকী শেষকৃত্য শুরু হয়েছে। সাদা চাদরে ঢাকা কুশপুতুলে আগুন জ্বলছে— কিন্তু সেই আগুনের মধ্যেও পরিবারের মনে হয়তো শেষ আশাটুকু বেঁচে আছে। সঞ্জয় ও কবীরের প্রত্যাবর্তন সেই আশাকেই আরও শক্তিশালী করে।
তাই এই মুহূর্তে উদ্ধার অভিযান থামার কোনও কারণ নেই। সুড়ঙ্গের আরও গভীরে যদি কেউ আটকে থাকেন, তাঁদের সন্ধানে শেষ সম্ভাবনাটুকু পর্যন্ত চেষ্টা চালাতে হবে। কারণ একজন মানুষের জীবনও পরিসংখ্যান নয়।
নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের কাছে তাই একই সঙ্গে শোকের, সতর্কতার এবং আশার বার্তা। প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ অসহায় হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রাণশক্তি অসহায় নয়। নয় দিনের অন্ধকার পেরিয়ে সঞ্জয় ও কবীরের ফিরে আসা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ধ্বংসস্তূপের নিচেও জীবন কখনও কখনও নিঃশব্দে বলে যায়, এখনও শেষ হয়নি।
আর সেই বিশ্বাসই দুর্যোগ মোকাবিলার নৈতিক ভিত্তি হওয়া উচিত—উন্নয়ন মানুষের জন্য, মানুষের জীবনের বিনিময়ে নয়।




