• facebook
  • twitter
Wednesday, 21 January, 2026

গরিবের রাজা : প্রথম সাম্যবাদী

যিশু শ্বেতাঙ্গ না কৃষ্ণাঙ্গ,এই প্রশ্ন অবান্তর ! যিশু পাশ্চাত্যের নয় প্রাচ্যের, ইউরোপের নয় এশিয়ার। ক্ষমার খ্রিস্ট সমগ্র বিশ্বের।

সুরঞ্জন মিদ্দে

‘যিশুই প্রথম সাম্যবাদী’— এই দাবি করেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ। খ্রিস্টের জীবন ও সংগ্রাম পর্যালোচনা করলে সে কথায় প্রতিফলিত হয়। প্রায় দু-হাজার বছর আগে প্যালেস্টাইন দেশের গালীল রাজ্যের নাজারথ গ্রামের ছুতোর মিস্ত্রির ঘরে জন্মেছিলেন ও বেড়ে উঠেছিলেন। দেশের অধিকাংশ ইহুদিরা দরিদ্র, নিপীড়িত ও অন্ত্যজ শ্রেণি। যিশুর সঙ্গী-শিষ্যরা ছিল মাছধরা জেলে, রাখাল, কৃষক, আর প্রান্তিক নারী-সহ সমাজের নিচু তলার কিছু মেহনতী মানুষ। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন— সমাজের ব্রাত্য, উপেক্ষিত মানুষের মাঝে। কর কালেক্টর থেকে বারবনিতা যাদেরকে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় অচ্ছ্যুত,অবজ্ঞার পাত্র, তাদের আতিথ্য তিনি গ্রহণ করেছেন, একই পঙক্তির শরিক হয়ে, তাদের সাথে খেয়েছেন।

Advertisement

ইহুদিসমাজের ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক, মৌলবাদী পুরোহিতদের সঙ্গে যিশুর তীব্র বিরোধ শুরু হয়। কিন্তু অসম সাহসে তিনি রুখে দাঁড়ালেন; শোষন,বঞ্চনা ও ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে। দারিদ্র্য ছিল যিশুর কাছে মানব সভ্যতার কাছে একটি অশুভ সংবাদ। তাই তিনি নিষ্পেষিত মানুষের মুক্তির জন্য সুসমাচার প্রচার করলেন। দারিদ্র্য দূরীকরণে সর্বস্ব পণ করলেন। নিজে একজন ছুতোর মিস্ত্রীর দোকানের শ্রমক্লান্ত মানুষদের একজন হয়ে, তিনি বললেন— ‘হে শ্রমক্লান্ত মানুষ আমার কাছে এস, আমি বিশ্রাম দেব। যাদের খাবার আছে, তা যাদের নেই তাদের সঙ্গে ভাগ করে খাও’। এর থেকে স্পষ্ট হয়, যিশু চেয়েছিলেন এক শোষনহীন ভয়হীন সমাজব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, তিনি সঞ্চয় ও একচেটিয়া পুঁজিবাদ সমর্থন করেননি।

Advertisement

একদিকে পর্যাপ্ত খাদ্য সম্ভার, অন্যদিকে অনাহার— এই অর্থনৈতিক অসাম্য মানুষের সাথে মানুষের মানবিক সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে। যিশু বললেন— ‘তোমরা পৃথিবীতে সম্পদ সঞ্চয় করো না বরং স্বর্গলোকে সঞ্চয় করো’। একজন ধনবান মানুষ যিশুর শিষ্যত্ব নিতে এলে, তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন— আগে তোমার সম্পদ দরিদ্রদের দান করে এস। যে যিশুর এই আহ্বান গ্রহণ করতে পারেননি— তাই যিশু মন্তব্য করেছিলেন— ধনবানের পক্ষে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করার চেয়ে, উটের পক্ষে সুঁচের ছিদ্র দিয়ে যাওয়া বরং সহজ। প্রকৃতপক্ষে যিশু ধনবানদের হতাশ করতে চাননি।

আসলে ধন আছে, ধনতৃষ্ণা নেই— এমন মানুষের মাধ্যমেই জগতের মঙ্গল হতে পারে। ‘ধনবান ও লাজারাস্’ শীর্ষক উপমায় যিশু ধনী ও গরীব— দুই শ্রেণির বৈষম্যকে স্পষ্ট করেছেন। নিঃস্বদের সামনে প্রাচুর্য একটা সামাজিক অপরাধ। মানুষের শ্রমে উৎপন্ন খাদ্য সম্পদ বন্টনের অভাবে— সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে যাচ্ছে। তাই তিনি ধনবানদের সতর্ক করেছেন— এমন একদিন আসবে যেদিন ধনবানরাও ক্ষুধার্ত হবে।

যিশু সাম্যবাদের মূল ভিত্তি হোল পিতা ঈশ্বর এবং ভালোবাসা। সমস্ত মানুষই এক ঈশ্বরের সন্তান। সব মানুষই ভাই-ভাই। পিতা ঈশ্বররের দৃষ্টিতে সমস্ত মানুষ সমান। ঈশ্বর মানুষকে দরিদ্র করে সৃষ্টি করেননি। দারিদ্র্য একশ্রেণির মানুষের শোষণ ও বঞ্চনা। যিশু তাই দরিদ্রদের পক্ষেই ছিলেন। তিনি নিজে উদ্বাস্তু হয়ে জন্মেছিলেন। রাজার আক্রোশে তাঁর পিতা আস্তাবল থেকে মিশরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবুও তিনি হিংসাত্মক পথে যুদ্ধ করতে চাননি। সশস্ত্র বিদ্রোহ না করে প্রেমের বিপ্লব ঘটিয়েছেন। তিনি মগজের থেকে হৃদয়কে উপরে স্থান দিয়েছেন।

সূর্য-চন্দ্র যেমন প্রত্যেকে জীবনে সমানভাবে আলো দেয়– ঠিক তেমনি মানুষের মধ্যে কোন বিভেদ-বৈষম্য-বিভাজন থাকবে না। তাই তিনি গরিব শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন। ৭০ বার পর্যন্ত ক্ষমা করতে বললেও অন্যায়কে মেনে নিতে বলেননি। প্রয়োজনে তিনি সুদখোর-ব্যবসায়ীদের চাবুক মেরে ধর্মমন্দির থেকে বার করে দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ভালোবাসার বিপ্লব ঘটিয়েছেন। মানুষের অন্তর্জগতের পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছেন। তলোয়ার ভেঙে লাঙল ফলা তৈরির কথা বলেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ প্রধান হতে চাইলে, তাকে সেবক হতে হবে। তোমাদের মধ্যে যে প্রথম হতে চায়, তাকে হতে হবে সবার শেষের মানুষ। যে বড় হতে চায়, তাকে আগে ছোট হতে হবে। সেই বড় যে সবকিছুকে সহজেই দিতে পারে, এমনকি নিজের জীবনও।

যিশু শ্বেতাঙ্গ না কৃষ্ণাঙ্গ,এই প্রশ্ন অবান্তর ! যিশু পাশ্চাত্যের নয় প্রাচ্যের, ইউরোপের নয় এশিয়ার। ক্ষমার খ্রিস্ট সমগ্র বিশ্বের। তিনি বিশ্বাস করতেন– শুধু কথাই নয়, জীবন আর কাজ দিয়ে গরিব মানুষের পাশে থাকতে হয়। শুধু মুখের কথায় ভালোবাসা পূর্ণ হয় না। মানুষের বিপদে-আপদে, সুখে-দুখে, শামিল থেকে, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যিশু ছিলেন– পরম মানব, প্রেমের দীক্ষাগুরু, মানবসম্পদের দেবতা, মানবপুত্র– দুঃখের রাজা।

ঐশ্বর্য ও দারিদ্রের সমান্তরাল সহাবস্থান সমাজের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দেয়। সেইজন্যে খ্রিস্টীয় সাম্যবাদে অনিবার্যভাবে আসবে কঠোর আত্মত্যাগের জয়গান। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের কথায়— ‘সাম্যাবতার যিশুখ্রিস্ট তিনি বলিয়াছেন— সকল মনুষ্যই ঈশ্বরের সমক্ষে তুল্য। বরং যে পীড়িত,কাতর, দুঃখী সেই ঈশ্বরের অধিক প্রিয়। এই মহাবাক্যে বড় মানুষের গর্ব খর্ব হইল।— অন্যের নিকট হইতে তুমি যে ব্যবহার কামনা কর, অন্যের প্রতিও তুমি সেই ব্যবহার করিও। এই বাক্যের ন্যায় এই মহৎ বাক্য ভূমণ্ডলে আর কখনোই উক্ত হইয়াছে কিনা সন্দেহ। এই বাক্য সাম্যতত্ত্বের মূল।’

Advertisement