পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমশ গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকা যে-কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। সেই তালিকা নিয়ে যদি সন্দেহ, বিভ্রান্তি বা অভিযোগের আবহ তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নয়, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থার ওপরও পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার কলকাতার এসপ্লানেডে মেট্রো চ্যানেলে ধর্নায় বসেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বহু যোগ্য ভোটারকেও তালিকা থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ধর্নামঞ্চে এমন ২২ জন মানুষকে হাজির করেছেন, যাঁদের নির্বাচন কমিশনের তালিকায় ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি তিনি এমন আটটি পরিবারকেও সামনে এনেছেন, যাঁদের সদস্যদের নাম এসআইআর প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
Advertisement
এই ঘটনাগুলি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্যই হল ভুল সংশোধন করা এবং তালিকাকে আরও নির্ভুল করা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াতেই যদি নতুন ভুল তৈরি হয়, তাহলে তা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন তো তুলবেই, পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগও উসকে দেবে।
Advertisement
নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে যে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরও প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের অবস্থান বিচারাধীন রয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের ভোটাধিকার এখনও নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, খসড়া তালিকায় প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল, আর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ লক্ষে। তাঁর মতে, বিচারাধীন নামগুলিকে ধরলে মোট প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সংখ্যার এই বিশালতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে। যদি এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে থাকে বা বিচারাধীন অবস্থায় থাকে, তাহলে কি এসআইআর প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন কমিশনের ওপরেই বর্তায়।
ভারতের নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন বা নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাও সেই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে এই এসআইআর প্রক্রিয়া বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের যৌথ ষড়যন্ত্র। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূল সমর্থক এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বেশি করে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে নির্বাচনে বিজেপির সুবিধা হয়। যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে বিজেপি, তবুও এমন অভিযোগ যে উঠছে সেটাই উদ্বেগের বিষয়।
গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, এটি নাগরিক অধিকারের প্রতিফলন। একজন নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে তাঁকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। সেই কারণেই ভোটার তালিকার নির্ভুল এবং স্বচ্ছ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হল স্বচ্ছতা। নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত এবং বিস্তারিতভাবে পুরো এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া— কীভাবে তালিকা সংশোধন করা হয়েছে, কোন ভিত্তিতে নাম বাদ পড়েছে, এবং ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়াও প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলিরও এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রচারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত। কারণ ভোটার তালিকা নিয়ে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর পড়বে।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা না গেলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এসআইআর বিতর্কের দ্রুত ও নিরপেক্ষ সমাধান এখন সময়ের দাবি। ভোটাধিকার নিয়ে সামান্যতম সন্দেহও গণতন্ত্রের পক্ষে অশুভ— এই সত্যটি সকল পক্ষেরই মনে রাখা জরুরি।
Advertisement



