• facebook
  • twitter
Monday, 9 March, 2026

ক্ষমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ইরান

ইরানের এই দ্বিধাবিভক্ত ক্ষমতার কাঠামো থেকেই হয়তো স্পষ্ট হয়ে উঠছে কেন একদিকে প্রেসিডেন্ট প্রতিবেশী দেশগুলির কাছে ক্ষমা চাইছেন

ফাইল চিত্র

সৈয়দ হাসমত জালাল

পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাতের এক সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যে বার্তা দিলেন, তা এই যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দুর্বলতার এক অস্বস্তিকর চিত্রও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব দেশগুলির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের দাবি প্রত্যাখ্যান— এই দুই বিপরীত সুরের মধ্যে দিয়ে যেন ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা ধরা পড়েছে। ক্ষমা চাওয়ার ভাষায় কূটনৈতিক সংযম থাকলেও বাস্তবে যখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশে উড়ছে, তখন সেই ক্ষমাপ্রার্থনা কতটা কার্যকর— সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।

Advertisement

এই পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘটিত এক বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ্ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামো বস্তুত অস্থির হয়ে পড়ে। সেই হামলার পরই যুদ্ধের সূচনা এবং তারপর থেকে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। এখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী পরিষদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে, যার অন্যতম মুখ পেজেশকিয়ান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে সামরিক বাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। বিশেষ করে শক্তিশালী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ করছে, এমন ধারণাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

Advertisement

ইরানের এই দ্বিধাবিভক্ত ক্ষমতার কাঠামো থেকেই হয়তো স্পষ্ট হয়ে উঠছে কেন একদিকে প্রেসিডেন্ট প্রতিবেশী দেশগুলির কাছে ক্ষমা চাইছেন, অন্যদিকে একই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। বাস্তবে দেখা গিয়েছে, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন জায়গায় সাইরেন বেজে উঠেছে, মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটেছে, এবং বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলির একটি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পর্যন্ত যাত্রীদের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিতে হয়েছে। কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও।

এই ঘটনাগুলি শুধু সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিতই নয়, এগুলি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিপর্যয়েরও পূর্বাভাস বহন করছে। উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় বা আরও বিস্তৃত হয়, তবে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দু’বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে তার অভিঘাত শুধু ইউরোপ বা আমেরিকায় নয়, ভারতসহ সমগ্র উন্নয়নশীল বিশ্বেই তীব্রভাবে অনুভূত হবে।

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও বাড়ানো হতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ইরানের আরও কিছু অঞ্চল ও গোষ্ঠী এখন হামলার লক্ষ্য হতে পারে। একই সময়ে আমেরিকা ইজরায়েলের জন্য নতুন করে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে, যার অর্থ এই সংঘাতে ওয়াশিংটনের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও তীব্র হতে চলেছে।

অন্যদিকে, ইজরায়েলের লক্ষ্যও স্পষ্ট। তাদের সামরিক অভিযান মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সামরিক পরিকাঠামো এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চলছে। গত এক সপ্তাহে শয়ে শয়ে বিমান হামলায় ইরানের সামরিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মারাত্মক চাপে পড়েছে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ।

এই সংঘাতের মানবিক মূল্যও ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী ইতিমধ্যেই এক হাজারেরও বেশি মানুষ ইরানে নিহত হয়েছে। লেবাননে মৃত্যু হয়েছে দু’শোর বেশি মানুষের এবং ইজরায়েলেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কয়েকজন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছে। এই সংখ্যাগুলি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলি যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।

তবে যুদ্ধের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইরানের ভেতরেই এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। সেখানকার প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা নাসের মাকারাম শিরাজী ইতিমধ্যেই দেশের ধর্মীয় পরিষদকে দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও সহজ নয়। কারণ যে পরিষদ এই সিদ্ধান্ত নেবে, তার সঙ্গে যুক্ত ভবনগুলিও বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতা কার্যত এক অন্তর্বর্তী অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব কূটনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে, কিন্তু সামরিক বাহিনী নিজের কৌশল অনুযায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে ইরানের অবস্থান।

উপসাগরীয় দেশগুলির প্রতিক্রিয়াও এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অবিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছুটা কূটনৈতিক উষ্ণতা দেখা গিয়েছিল। এখন সেই সম্পর্ক আবার ভেঙে পড়ার মুখে। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র বা বাহরাইনের নিরাপত্তা যদি সরাসরি বিপদের মুখে পড়ে, তবে তারা নিরপেক্ষ থাকবে— এমন আশা করা কঠিন।

একজন আঞ্চলিক বিশ্লেষক ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে, ইরান হয়তো এক বড় কৌশলগত ভুল করছে। তাঁর মতে, ইরান যদি এই সংঘাতকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়, তবে তা কার্যত ইজরায়েলের কৌশলকেই সফল করে তুলবে। কারণ এতে সংঘাত আর কেবল ইরান-ইজরায়েল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ইরান বনাম আরব বিশ্বের বৃহত্তর সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

এই সম্ভাবনাই পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করছে। যদি যুদ্ধের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত থাকবে না, বরং তা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল— সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়বে।
এই অবস্থায় কূটনীতির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, সমস্যার সমাধান কূটনৈতিক পথে হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখলে মনে হচ্ছে, সেই পথ এখন ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের আবেগ, প্রতিশোধের রাজনীতি এবং ক্ষমতার লড়াই— এই তিনের মধ্যে প্রায়শই চাপা পড়ে যায় কূটনীতির কণ্ঠস্বর ।

পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসে বহুবার দেখা গিয়েছে, একটি ছোট সংঘাত দ্রুত বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। বিশেষ করে যখন একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে এবং অন্যদিকে বহু শক্তিধর দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে। ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরের বিভাজন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান, ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগ— সব মিলিয়ে অত্যন্ত জটিল এই সমীকরণ।

তবু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মধ্যেও আলোচনার পথই খুঁজে নিতে হয়। কারণ যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া শুধু একটি দেশের ওপর নয়, সমগ্র অঞ্চলের উপর পড়ে। আজ পশ্চিম এশিয়ায় যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার অভিঘাত বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর বহুদিন ধরে অনুভূত হতে পারে। সেই কারণেই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ এবং এমন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা যা অন্তত এই সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

Advertisement