একশোরও বেশি দিনের ধ্বংসস্তূপ, আতঙ্ক, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং অনিশ্চয়তার শেষে অবশেষে থেমেছে বোমার শব্দ। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র— দুই পক্ষই এখন বলছে, তারা জিতেছে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যখন দুই পক্ষই নিজেদের বিজয় ঘোষণা করে, তখন প্রকৃত সত্যটি অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে। এই নতুন সমঝোতা, যাকে ‘মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বলা হচ্ছে, আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধ থামালেও, আসল লড়াই এখনই শুরু।
এই চুক্তি শুধু যুদ্ধবিরতি নয়; এটি একধরনের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমঝোতা। ইরানের কাছে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য— রাষ্ট্রব্যবস্থার টিকে থাকা। তাদের মূল লক্ষ্য কখনওই আমেরিকা বা ইজরায়েলকে সামরিকভাবে পরাজিত করা ছিল না। বরং লক্ষ্য ছিল, এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইসলামিক রিপাবলিকের কাঠামো অটুট থাকে এবং বিশ্বমঞ্চে তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে। সেই দিক থেকে দেখলে, ইরান কিছুটা হলেও সফল।
চুক্তির মাধ্যমে তেহরান দাবি করতে পারছে— তারা আত্মসমর্পণ করেনি, বরং নিজেদের শর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরেছে। হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া, মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি— এসবই ইরানের জন্য বড় প্রতীকী জয়। উপরন্তু, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা তাদের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। ইরানকে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। যদিও এটি নতুন কোনও অঙ্গীকার নয়, তবুও তাদের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত ও পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কঠিন আলোচনার মুখোমুখি হতে হবে। এখানেই শুরু আসল সংকট।
কারণ, দেশের অভ্যন্তরে যে চিত্রটি তৈরি করা হয়েছে— তা একেবারেই ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম, রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং কট্টরপন্থী নেতারা ইতিমধ্যেই জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান একপ্রকার বিজয় অর্জন করেছে। এই পরিস্থিতিতে যদি আলোচনায় কোনও আপস করতে হয়, তা হলে সেটি জনগণের চোখে ‘বিজয়ের পরে আত্মসমর্পণ’ হিসেবেও ব্যাখ্যা হতে পারে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকেই মুক্তি পাওয়া ইরানের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, আমেরিকার জন্য এই চুক্তি একধরনের কৌশলগত পিছু হটা, আবার একই সঙ্গে কূটনৈতিক সাফল্যের দাবিও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে যুদ্ধ শেষ করার এক বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের যুক্তি— ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে, বরং তাকে আলোচনায় আনা এবং পারমাণবিক অস্ত্র থেকে বিরত রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আমেরিকা ধীরে ধীরে
নৌ অবরোধ তুলে নেবে, ইরানের তেল রপ্তানিতে ছাড় দেবে এবং তাদের আটকে থাকা অর্থ মুক্ত করার পথ তৈরি করবে। একই সঙ্গে তারা আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইরানের পুনর্গঠনে সহায়তার কথা বলেছে। এই পদক্ষেপগুলো একদিকে যেমন ইরানকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দেবে, তেমনি অন্যদিকে আমেরিকার জন্যও পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ তৈরি করবে।
তবে ওয়াশিংটনের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেক রিপাবলিকান নেতা এটিকে ‘দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কার্যত স্থগিত না করে বরং অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে।
এই সমালোচনার জবাবে মার্কিন প্রশাসন বলছে— ইরান যদি চুক্তির শর্ত না মানে, তাহলে কোনও সুবিধাই পাবে না। অর্থাৎ, এই সমঝোতা একধরনের ‘শর্তসাপেক্ষ শান্তি’। কিন্তু বাস্তবে এই শর্তগুলি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার উপর।
এই ৬০ দিনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ, এই সময়ের মধ্যেই নির্ধারিত হবে— ইরান তার ইউরেনিয়াম মজুত কমাবে কিনা, তাদের পারমাণবিক পরিকাঠামো কতটা সীমিত করা হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের আওতায় কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখবে।
এই আলোচনার প্রতিটি ধাপেই রয়েছে দ্বন্দ্ব। ইরান যদি বেশি ছাড় দেয়, তবে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার মুখে পড়বে। আর যদি কোনও ছাড় না দেয়, তাহলে চুক্তি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তখন আবার যুদ্ধের সম্ভাবনা ফিরে আসতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি চুক্তিকে অনুমোদন দিয়েছেন, কিন্তু পুরোপুরি সমর্থন করেননি। এই ‘দূরত্ব বজায় রাখা’ কৌশলটি তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ রাখলেও, আলোচনাকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, তাঁরা জানেন না— ঠিক কতদূর পর্যন্ত তাঁরা আপস করতে পারবেন।
এদিকে, পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও এই চুক্তির প্রভাব পড়ছে। ইজরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ এখনও পুরোপুরি থামেনি। ইজরায়েল বলছে, তাদের যুদ্ধ আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাত যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইরান-আমেরিকা চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন— এই শান্তি প্রক্রিয়া সবার জন্যই ভালো এবং এটিকে সম্মান করা উচিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘ভালো’ কথাটি অনেক সময়ই আপেক্ষিক হয়ে ওঠে। প্রত্যেক দেশই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, আর সেই স্বার্থের সংঘাতই আবার নতুন করে অশান্তির জন্ম দেয়।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্যকে তুলে ধরে— যুদ্ধ শেষ করা যতটা কঠিন, শান্তি বজায় রাখা তার চেয়েও কঠিন। কারণ, যুদ্ধের সময় শত্রু স্পষ্ট থাকে, কিন্তু শান্তির সময়ে দ্বন্দ্বগুলো আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে।
ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে সময় পেয়েছে, চাপ কমিয়েছে এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। আমেরিকা পেয়েছে একটি কূটনৈতিক সাফল্যের সুযোগ এবং পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বজায় রাখার পথ। কিন্তু এই লাভগুলোই আবার ভবিষ্যতের সমস্যার বীজ বপন করছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন— এই বিজয়ের গল্প কতদিন টিকবে? যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তখন কি এই গল্প ভেঙে পড়বে না?
ইতিহাস বলছে, যে কোনও শান্তিচুক্তির আসল পরীক্ষা হয় তার পরবর্তী সময়ে। এই চুক্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। আগামী ৬০ দিন শুধু ইরান বা আমেরিকার জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।
শেষ পর্যন্ত, এই সমঝোতা কি স্থায়ী শান্তির পথ দেখাবে, নাকি এটি কেবল এক বিরতি— নতুন সংঘাতের আগে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আলোচনার টেবিলে, রাজনৈতিক সদিচ্ছায় এবং সবচেয়ে বেশি— দুই দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায়।
যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু ইতিহাসের চাকা থেমে থাকে না। শান্তি স্থাপনের এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে, প্রত্যেক পদক্ষেপই ভবিষ্যতের দিক নির্ধারণ করবে।




