ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এক নতুন পর্বে প্রবেশ করছে— এই বাস্তবতা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে ইউরোপ ছিল কিছুটা প্রান্তিক, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থান দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি সফর সেই পরিবর্তনেরই প্রতীকী ও বাস্তব প্রতিফলন।
শীতল যুদ্ধের সময় ভারতের ইউরোপ-নীতি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপকে কখনোই ভারত তার কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে দেখেনি। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র বদলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বহু দশক কেটে গেছে এবং আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
Advertisement
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত বুঝতে পারছে যে, ইউরোপ কেবল একটি বাজার নয়— এটি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও সবুজ শক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে এই বছরের শুরুতে ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (India-EUFTA) এবং তার আগে ২০২৪ সালের ভারত-EFTA চুক্তি— এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। ফলে ইউরোপ এখন ভারতের কৌশলগত চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করছে।
Advertisement
এই পরিবর্তনের পেছনে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতাও বড় ভূমিকা রাখছে। একদিকে আমেরিকার নীতিতে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রাশিয়া ও চিনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা— এই দুই পরিস্থিতি ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে সম্পর্কের ওঠানামা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত স্বাভাবিকভাবেই তার কৌশলগত বিকল্প বাড়াতে চাইছে, এবং ইউরোপ সেই বিকল্পগুলির অন্যতম।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের গন্তব্যগুলি এই নতুন কৌশলের দিকনির্দেশ স্পষ্ট করে। নেদারল্যান্ডসের মতো একটি ছোট দেশও আজ বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে তাদের দক্ষতা ভারতের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। ভারতের নিজস্ব চিপ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে এই সহযোগিতা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
একইভাবে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও ভারত এখন রাশিয়ার উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। ইউরোপীয় দেশগুলি এখানে একটি বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও যৌথ উৎপাদনের মাধ্যমে এই সহযোগিতা ভারতের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সবুজ শক্তির ক্ষেত্রেও ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত যেমন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তেমনি এর জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি ও বড় মাপের বিনিয়োগ। ইউরোপ এই দুই ক্ষেত্রেই ভারতের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে।
এছাড়া, ইউরোপে ভারতীয় প্রবাসীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে দক্ষ কর্মী ও ছাত্রদের মধ্যে। এই মানবসম্পদ বিনিময়ও দুই অঞ্চলের সম্পর্ককে আরও গভীর করছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ককেও শক্তিশালী করছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ইউরোপ কোনও একক সত্তা নয়। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট, তবুও প্রতিটি দেশের নিজস্ব স্বার্থ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি রয়েছে। পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর ইউরোপ বা দক্ষিণ ইউরোপ— প্রতিটি অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। ফলে ভারতের কূটনৈতিক নীতিতেও এই বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ভারত ইতিমধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। এখন প্রয়োজন উত্তর ইউরোপের দেশগুলি ও ইতালির মতো রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ তৈরি করা। এই বহুমুখী সম্পর্কই ভবিষ্যতে ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দ্রুত বদলাচ্ছে। পুরনো জোট দুর্বল হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির প্রভাব কমছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষে ইউরোপকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বরং ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনীতির একটি প্রধান ভিত্তি হতে চলেছে।
Advertisement



