বর্তমান বিশ্বে কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সার। কৃষকদের কাছে সারের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করা খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পুতিন বিশেষভাবে ভারতীয় কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছেন। তিনি জানান, রাশিয়া ইতিমধ্যেই সরবরাহ বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও আরও বাড়াতে প্রস্তুত। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে কৃষিক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন সারের জোগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাশিয়ার এই সহযোগিতার আশ্বাস নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক।
ভারত ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কও নতুন গতি পাচ্ছে। পুতিন উল্লেখ করেছেন, গত বছর বাণিজ্য কিছুটা কমলেও চলতি বছরে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন বেড়েছে। এই বৃদ্ধিকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের অর্থনীতির পরস্পরের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ইঙ্গিত। জ্বালানি, সার, শিল্পপণ্য, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়লে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও নতুন দরজা খুলতে পারে।
ভারতের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল জ্বালানি। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভারতের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারত যদি রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের কাছ থেকে স্থিতিশীল জ্বালানি সহযোগিতা পায়, তাহলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী হতে পারে। একইভাবে পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হলে ভারতের পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে তা সহায়ক হতে পারে।
উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সম্ভাবনা যথেষ্ট। বর্তমান পৃথিবীতে একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা প্রচলিত শিল্পের ওপর নির্ভর করে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, পরমাণু প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উন্নত শিল্পপ্রযুক্তির মতো ক্ষেত্র আগামী দিনের অর্থনীতিকে নির্ধারণ করবে। তাই ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।এই সম্পর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রাজনৈতিক আস্থা।
পুতিন বলেছেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক শুধু সরকারি স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়; সংসদীয় যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগও এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। জয়শঙ্করের হাতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বার্তা তুলে দেওয়া এবং পুতিনের পক্ষ থেকে মোদীকে শুভেচ্ছা জানানো দুই নেতার পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্বকেই প্রকাশ করে।
জয়শঙ্করের রাশিয়া সফরের সময় ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকারি কমিশনের বৈঠকও হয়েছে। সেখানে বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মতো নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ দুই দেশের সম্পর্ক কোনও একটি ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই বহুমুখী সম্পর্কই ভারত-রাশিয়া সহযোগিতাকে আরও স্থায়ী ভিত্তি দিতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল— একাধিক শক্তিশালী দেশের সঙ্গে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী সুসম্পর্ক বজায় রাখা। রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখেও ভারত আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ভারতের কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং ভারতের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
আগামী দিনে তাই ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের সামনে সম্ভাবনাই বেশি। কৃষকের জন্য সার, দেশের জন্য জ্বালানি, উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি এবং অর্থনীতির জন্য বাণিজ্য—এই চারটি ক্ষেত্রেই সহযোগিতা আরও গভীর করা দরকার। একই সঙ্গে দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোও জরুরি।
বিশ্ব যখন নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা বুদ্ধিমানের কাজ। ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক সেই আস্থারই একটি উদাহরণ। পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক আগামী দিনেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ভারতের উন্নয়ন ও বিশ্বমঞ্চে তার স্বাধীন অবস্থান— দুই ক্ষেত্রেই একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী ভারত-রাশিয়া অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




