গত এক সপ্তাহে ভারত এবং বিশেষত বাংলাদেশে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা দুটি আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে চায়ের কাপে ঝড় তুলেছেন। ঘটনাদুটি দেখিয়ে দিল, উভয় পক্ষের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কতটা আবেগপ্রবণ এবং সংবেদনশীল রয়ে গেছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘিরে ভারতের সদ্য নিযুক্ত বাংলাদেশে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে। আনুষ্ঠানিক কূটনীতির প্রথাগত ও নিয়ন্ত্রিত রীতিতে ঢাকা পৌঁছনোর বদলে, ত্রিবেদী এবং তাঁর স্ত্রী পায়ে হেঁটে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত অতিক্রম করেন। এর প্রতীকী তাৎপর্য ছিল স্পষ্ট। একজন পেশাদার কূটনীতিক নন, বরং একজন রাজনীতিক প্রোটোকলের চেয়ে নৈকট্য এবং রাজনীতির চেয়ে মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিতে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশে পৌঁছে দীনেশ ত্রিবেদী ভূপেন হাজারিকার একটি গান উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ ‘একই আকাশ, একই বাতাস’-এর নিচে বাস করে এবং একই ধরনের কষ্টের মুখোমুখি হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, ১৬০ কোটির মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
এই অকপট মন্তব্য— এমন এক সময়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন দুই দেশকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছে— যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে ভারতকে মোকাবিলা করতে হবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং আরও দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহ। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই এই মন্তব্যের জেরে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থী এবং জামায়াত-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহল তৎক্ষণাৎ এই বক্তব্যকে ‘ভারতের আধিপত্যবাদী পরিকল্পনার’ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে। পাকিস্তানপন্থী জামায়াতে ইসলামী, যারা এখনও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে এক ধরনের অস্বস্তিকর ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে দেখে, ব্যাখ্যা দাবি করে এবং প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যথেষ্ট সম্মান পাচ্ছে কি না।
এই প্রতিক্রিয়া ত্রিবেদীর বক্তব্যের চেয়ে বরং সম্পর্কের ওপর এখনও ভর করে থাকা গভীর অবিশ্বাসকেই বেশি সামনে নিয়ে আসে, বিশেষত বাংলাদেশের উগ্র ডানপন্থী অংশের মধ্যে।
বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ইউএনআই-কে বলেন, ‘এটি ছিল জামায়াত নেতৃত্বের সচেতন চেষ্টা— সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যপূর্ণ একটি মন্তব্যকে বিতর্কে পরিণত করে দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তোলার।’
দ্বিতীয় বিতর্কের সূত্রপাত হয় দিল্লি বিমানবন্দরে, এক শান্ত রবিবারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান ভারত মহাসাগর বিষয়ক একটি সরকারি সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসেন। তিনি একটি ব্যক্তিগত পাসপোর্টে ভ্রমণ করছিলেন, যেখানে পুরনো সার্ক ভিসা স্টিকার ছিল। অথচ সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রী-স্তরের প্রতিনিধির ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকার কথা।
এরপর যা ঘটে, তা সম্ভবত ছিল প্রশাসনিক বিভ্রান্তি। ছুটির দিনে, যখন বহু সরকারি দপ্তর বন্ধ ছিল, নথিপত্র নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে তাঁর প্রবেশে বিলম্ব হয়। সমস্যার সমাধান হয়ে অনুমতি মেলার আগেই রহমান দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনাটি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এটি কোনও ষড়যন্ত্রের চেয়ে বরং প্রশাসনিক গাফিলতির উদাহরণ— যা দুই পক্ষের আরও ভালো সমন্বয়ে সহজেই এড়ানো যেত।
আলাদাভাবে দেখলে, এই দুই ঘটনাই তুচ্ছ। কিন্তু একসঙ্গে বিচার করলে, তারা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: ভারত ও বাংলাদেশ কি পারস্পরিক আস্থার এক নতুন স্তরে পৌঁছতে প্রস্তুত?
এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্পর্ক এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতও তার আঞ্চলিক কূটনীতি পুনর্মূল্যায়ন করছে। আগের শাসনামলে সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে দেওয়া পুরনো নিশ্চয়তাগুলি আর আগের মতো নেই। সীমান্তের দুই পারেই উঠে আসছে নতুন শক্তি, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এবং নতুন কৌশলগত হিসাব।
মরিশাসে ভারতের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জি বলেন, ‘উভয় পক্ষেই পরিণত নেতৃত্ব রয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদী অভিজ্ঞ রাজনীতিক, এবং সবাই জানেন ইউনূস সরকারের ১৮ মাসে যে সম্পর্কে অবনতি হয়েছিল, তা এখন মেরামতের পথে। এই ধরনের তুচ্ছ বিষয়গুলোকে পেছনে ফেলে আমাদের একসঙ্গে এগোতে হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের একাংশের কট্টরপন্থীরা নতুন এই সৌহার্দ্যের পরিবেশকে বিপদের মুখে ফেলছে। তারা বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত বৈরিতার আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিতে চায়।
সিক্রি বলেন, ‘বৃহত্তর বাংলাদেশের ধারণা এবং ইউনূস আমলে শোনা তীব্র ভারত-বিরোধী সুরের সূচনাকারী ছিল জামায়াত। এই মানসিকতা যদি সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে, তা দুই দেশের পক্ষেই ক্ষতিকর হবে।’
দীনেশ ত্রিবেদী সম্ভবত তা বোঝেন। তাঁর বক্তব্য মূলত অতীতের ক্ষোভে আটকে থাকা রাজনৈতিক মহলের উদ্দেশে নয়, বরং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে— যারা চাকরি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং সুযোগ চায়। এমন এক প্রজন্ম, যাদের অতীতের প্রতিটি বিতর্ক নতুন করে বিচার করার আগ্রহ খুব কম।
বাস্তব হলো, ভারত ও বাংলাদেশের তরুণরা একই ডিজিটাল পরিসরে বাস করে, একই ধরনের অর্থনৈতিক ও জলবায়ুজনিত উদ্বেগের মুখোমুখি হয় এবং প্রায় একই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। মতাদর্শগত লড়াইয়ের চেয়ে তাদের বেশি আগ্রহ— সরকারগুলি সমৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে পারছে কি না।
এর অর্থ এই নয় যে, ইতিহাস ভুলে যেতে হবে। ১৯৭১-এর স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী মতভেদগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। বহুচর্চিত ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন’-ও তেমনই প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু ইতিহাস পথপ্রদর্শক হওয়া উচিত, কারাগার নয়। বাস্তবতা হলো, ভারত বা বাংলাদেশ— কেউই ভৌগোলিক অবস্থান বদলাতে পারবে না। আজকের সরকার, রাজনৈতিক দল বা বিতর্কের বহু পরে-ও তারা প্রতিবেশীই থাকবে।
প্রশ্ন হলো— তারা কি স্থায়ী সন্দেহে ভারাক্রান্ত প্রতিবেশী হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তবসম্মত সহযোগিতায় সক্ষম প্রতিবেশী হবে?
বাণিজ্য, জলবণ্টন, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিবাসন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা— সবকিছুর জন্যই এমন আস্থা প্রয়োজন, যা তৈরি করা সম্ভব নয় যদি প্রতিটি বক্তব্যকে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং প্রতিটি প্রশাসনিক ভুলকে কূটনৈতিক সংকটে পরিণত করা হয়।
এই দুই বিতর্কের শিক্ষা এক পক্ষ সঠিক আর অন্য পক্ষ ভুল— তা নয়। শিক্ষা হলো, পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি এখনও বিপজ্জনকভাবে দুর্বল।
এই আস্থা গড়ে তুলতে দরকার ধৈর্য, রাজনৈতিক সাহস এবং যেখানে সম্ভব সেখানে সদিচ্ছার ওপর বিশ্বাস রাখার মানসিকতা। এটি বিবৃতি দেওয়া বা সমাজমাধ্যমে পয়েন্ট স্কোর করার চেয়ে কঠিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রিবেদীর সীমান্ত পেরিয়ে হাঁটা, তার নিজস্ব পরিসরে, ভবিষ্যৎকে অন্যভাবে ভাবার একটি আমন্ত্রণ ছিল। ভারত ও বাংলাদেশ সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে কি না, সেটাই আগামী বছরগুলিতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।




