• facebook
  • twitter
Saturday, 30 May, 2026

আগামীদিনে বৈশ্বিক তথ্য সংগ্রহালয়ের নতুন ঠিকানা ভারত

ভারতের প্রতি মেগাওয়াট ডেটা সেন্টার নির্মাণের খরচ প্রায় ৬-৭ মিলিয়ন ডলার, যা সিঙ্গাপুর ও জাপানের খরচের অর্ধেক। ২০৪৭ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের কর ছাড়।

ছবি: এএনআই

সুনীত রায়

আপনি যখন হোয়াটসঅ্যাপে কোনও বার্তা পাঠান, ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে কোনও ছবি পোস্ট করেন কিংবা ইমেল পাঠান— সেই ডেটাটা কোথায় যায়? হাওয়ার মধ্যে তো আর ভাসে না, সেটা জমা হয় ডেটা সেন্টারে। সেই ডেটা সেন্টারে সংরক্ষণের উপযোগী করার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। রাউটিংয়ের সাহায্যে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার বন্দোবস্ত করতে হয়। ডেটা সেন্টার ছাড়া বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ অদৃশ্য হয়ে যাবে। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স আর স্পটিফাইয়ের মত প্ল্যাটফর্মগুলি তাদের সম্পূর্ণ লাইব্রেরী ডেটা সেন্টারে সংরক্ষিত করে। ‘প্লে’ বোতাম টিপলেই ভৌগোলিকভাবে আপনার কাছাকাছি কোনও ডেটা সেন্টারের সার্ভারে সেই নির্দিষ্ট ফাইলটিকে রিয়েল টাইমে আপনার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা টিভির মধ্যে স্ট্রিমিং হয় অর্থাৎ দেখতে পাওয়া যায়।

Advertisement

আপনি যখনই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন, ব্যাংকিং অ্যাপে আপনার ব্যালান্স চেক করছেন কিম্বা ইউপিআই পেমেন্ট করছেন— তখন ডেটা সেন্টার আপনার পরিচয় যাচাই করে আপনার ব্যালান্স চেক করছে আর নিরাপদে লেনদেন রেকর্ড করছে। আর পুরো ব্যাপারটি ঘটছে কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনেও রয়েছে এই ডেটা সেন্টার। আপনি যখন এআইকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন, এটি ‘চিন্তা’ আর তার প্রতিক্রিয়া জানাতে একটা ডেটা সেন্টারের হাজার হাজার প্রসেসর ব্যবহার করা হয়। স্বাস্থ্যসেবায় ডাক্তারদের এমআরআই জাতীয় বিশাল ইমেজিং ফাইল ডেটা সেন্টারে সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত থাকে। রোগের প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দিতে কিম্বা নতুন ওষুধ তৈরি করতে এই ডেটা সেন্টারে সংরক্ষিত ডেটা ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপটটি আলোচনা করার পর নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে আমাদের বর্তমান দৈনন্দিন জীবনে ডেটা সেন্টার কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর অপরিহার্য?

Advertisement

আমাদের দেশে ডেটা সেন্টার ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। ডেটা সেন্টারগুলি জাতীয় নিরাপত্তা, ইন্টারনেট পরিকাঠামো আর অর্থনৈতিক উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা ছিল ৯৫০ মেগাওয়াট, ২০২৬ সালের মধ্যে তা ১৮০০ মেগাওয়াট হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ২০২১ সালে ডেটা সেন্টার শিল্পের মূল্য ছিল ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার = ৯৪০০ কোটি টাকা), যা ২০১৪ সালে ছিল ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার (১ মিলিয়ন ডলার= ৯. ৪কোটি টাকা)। ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আমাদের দেশে ডেটা সেন্টারের সংখ্যাটি ছিল ১৩৮। বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারের নিরিখে ভারতের স্থান হল ১৩ তম। ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতীয় ডেটা সেন্টারগুলি ৮ বিলিয়ন বর্গফুটের বেশি এলাকা জুড়ে ছিল। মোট ডেটা সেন্টারের ৬০% রয়েছে নভি মুম্বাই, নয়ডা, গুরগাঁও, বেঙ্গালুরু আর হায়দরাবাদে।

ভারতের ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা ২০২৩ সালে ০.৯ গিগাওয়াট থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ২ গিগাওয়াট পৌঁছাবে বলে অনুমান। এই ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আগামী তিন বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে। ডেটা সেন্টার স্থাপনের খরচাও বেড়েছে। প্রতি মেগাওয়াট গড় খরচ ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা হয়েছে। জোন্স ল্যাঙ্গ লাসালে ইনকর্পোরেটেড (জেএলএল)-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের শেষের দিকে ডেটা সেন্টার শিল্পে ৬৮১ মেগাওয়াট ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, আর এর জন্য ৭.৮ মিলিয়ন বর্গফুট রিয়্যাল এস্টেট জায়গারও প্রয়োজন হয়েছে। নতুন সরবরাহের ৫৭ শতাংশ মুম্বাই থেকে আর ২৫ শতাংশ চেন্নাই থেকে পাওয়া গেছে। ৫জি চালু হবার ফলে ডেটা সেন্টারের ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে, কারণ এটি ভারতে ডেটা ডাউনলোডের গতি ১০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

গুগল ২০২৫ সালে নভি মুম্বাইতে ১১৪৪ কোটি টাকা বিনিয়োগে ৮তলা উঁচু ৩,৮১,০০০ বর্গফুটের ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া মাইক্রোসফটেরও মুম্বাইতে ডেটা সেন্টার তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিটিআরএলএস ডেটাস্টোর্স লিমিটেড যাদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৮টি ডেটা সেন্টার ছিল, তারা ২০২৪-২০২৬ সালের মধ্যে ভারতে আরও ২৫টি ডেটা সেন্টার তৈরি করার কথা ভাবছে। বর্তমানে ১.২ বিলিয়ন বর্গফুটের সঙ্গে আরও ৫ মিলিয়ন বর্গফুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৩ সালে সাংহাই আর টোকিওর পরে নভি মুম্বাই এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের তৃতীয় বৃহত্তম ডেটা সেন্টার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

কলকাতা পূর্ব ভারতের একমাত্র আর ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেটা সেন্টার হাব, যার মোট ক্ষমতা হল ৬৭ মেগাওয়াট আর আয়তন ১.২ মিলিয়ন বর্গফুট। আরও একাধিক ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা এখানে রয়েছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টারের জন্য নির্ধারিত জমির দিক থেকে কলকাতা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে— এক্ষেত্রে ১৯৫ একর জমি এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। ডেটাসেন্টারের জন্য ৪০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আদানি এন্টারপ্রাইজেস ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে একটা হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার, সিলিকন ভ্যালি হাব নির্মাণের জন্য ৫১.৮ একরের একটা প্লট নিউটাউনে নিয়েছে। এছাড়া ভারতে এয়ারটেল, নেক্সট্রা ডেটা ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কলকাতায় ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটা হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের জন্য ১,৫৪,০০০ বর্গফুটের প্লটও অধিগ্রহণ করেছে। হিরানন্দানি গ্রূপ পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপাড়ার হিন্দমোটরে ৬টি ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। তাছাড়া ৮৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ৬টি ডেটা সেন্টার তৈরির জন্য হুগলির উত্তরপাড়ায় ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে।

বর্তমানে ভারত, ডেটা সেন্টারের একটা ক্রমবর্ধমান শিল্প। ইরান কি হরমুজের সমুদ্রগর্ভস্থ কেবল কেটে দিয়ে বৈশ্বিক ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারে? পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক এই আশঙ্কায় ভারতে ডেটা সেন্টার স্থানান্তকরণের ব্যাপারে বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইজরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এই যুদ্ধে তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হলেও, আশঙ্কা হচ্ছে তেহরান কি এবার ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে?

বিশ্বের ডিজিটাল ধমনীগুলো সমুদ্রগর্ভস্থ কেবলের আকারে এই পথগুলোর মধ্যে দিয়ে গেছে। সমুদ্রতলে বিছানো ফাইবার অপটিক্সের তারের এক বিশাল জালের ওপর অবস্থিত হরমুজ প্রণালী আর লোহিত সাগরের বাব-এল-মানদেবের এই দুটি সংকীর্ণ পথ। এই সরু সরু তারের জাল গুলি হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত— ভিডিও কলিং, ইমেল থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কিং লেনদেন আর এআই পরিষেবা পর্যন্ত বৈশ্বিক ইন্টারনেটকে সচল রাখার প্রায় সমস্ত ডেটা এরা বহন করে। লোহিত সাগরের মধ্যে দিয়ে ১৭টি সাবমেরিন কেবল গেছে। এই কেবলগুলো ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকাকে সংযোগকারী ইন্টারনেট ট্রাফিকের সিংহভাগ বহন করে। পারস্য উপসাগরের সক্রিয় সমুদ্রগর্ভস্থ কেবলগুলো সরাসরি ভারতের বৈদেশিক ডেটা সংযোগগুলির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত।

সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১ মার্চ ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অবস্থিত দুটো ডেটা সেন্টার আর বাহারিনের একটি ডেটা সেন্টারের ওপর হামলা চালায়। ১লা এপ্রিল বাহারিনের আরও একটি ডাটা সেন্টারে আর ২রা এপ্রিল দুবাইয়ের একটা ওরাকল ডেটা সেন্টারে হামলা চালায়। ডেটা সেন্টারগুলির পুনরুদ্ধারের জন্যে দীর্ঘ সময় লাগার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মার্কিন ট্রেড এন্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির সহায়তায় এসসিএনএক্স-৩ সাবমেরিন কেবল সিস্টেমটি চেন্নাইকে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে যা ভারতের ডেটা করিডরকে আরও শক্তিশালী করবে।

পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতে ডেটাসেন্টার স্থানান্তরকরণের প্রধান কারণ হল অর্থনৈতিক সুবিধা। ভারতের প্রতি মেগাওয়াট ডেটা সেন্টার নির্মাণের খরচ প্রায় ৬-৭ মিলিয়ন ডলার, যা সিঙ্গাপুর ও জাপানের খরচের অর্ধেক। ২০৪৭ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের কর ছাড়। বিশ্বের প্রধান প্রযুক্তি বহুজাতিক সংস্থাগুলো ভারতীয় ডাটা সেন্টার পরিকাঠামোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে। আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মুম্বাই ক্লাউড অঞ্চলের জন্য ৮.৩ বিলিয়ন ডলার আর ২০২৬ সালের মার্চে হায়দ্রাবাদের জন্য আরও ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার ফলে ২০২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে ভারতে তাদের ডেটা সেন্টারের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। গুগল অন্ধ্রপ্রদেশে ১৫ বিলিয়ন ডলার আর মাইক্রোসফ্ট ১৭.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ভারতের ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের পরিমান ছিল ১২৫ বিলিয়ন ডলার আর সেটাই ২০২৬ সালের শেষে ১৮০বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে ভারতে ডেটা সেন্টার শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। ডেটা সেন্টারগুলোতেও তাদের পরিবেশগত প্রভাব কমানোর জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আর পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ ডিজিটাল চাহিদা মেটাতে এই শিল্প যখন প্রসারিত হবে তখন স্থায়ী উন্নয়নের ওপর এই ভাবনাচিন্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ ডেটা সেন্টার নবায়নযোগ্য শক্তির ধারা চালিত হবে—এই আশা করাটা কি খুব অন্যায় হবে?

Advertisement