• facebook
  • twitter
Monday, 19 January, 2026

‘ভয়’ যদি জয়লাভ করে যায়

যে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, উঠছে

Election Commission of India. Nov 1, 2019. (File Photo: Amlan Paliwal/IANS)

কবিতা মুখোপাধ্যায়: বাংলার একটি ধারাবাহিক ‘পরশুরাম’-এর নায়ক শিবপ্রসাদ গাঙ্গুলি, যিনি নিজেকে পরিচিত করেন ‘কমন ম্যান’ বলে। তাঁর দু’টি শিশুসন্তান (একটি ছেলে, একটি মেয়ে)-কে শিক্ষা দিয়ে থাকেন যে, কখনও মিথ্যা কথা বলবে না, আর ভয় পাবে না। তিনি তাদের গান শেখান— ‘আমি ভয় করব না ভয় করব না / দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না…’৷

বাস্তবে কেউ আমাদের একথা শেখায় না, বরং ‘ভয়’ নামে শব্দ‌টিকে সমাজের বৃহদাংশের ভিতরে এমন ভাবে ‘ইনজেক্ট’ করা হচ্ছে যাতে মেরুদণ্ডী মানুষ, পরিণত হচ্ছে অ-মেরুদণ্ডী প্রাণীতে। এখন সমাজের প্রতিটি স্তরেই চলছে একটাই শিক্ষা পদ্ধতি— ‘ভয়’ দেখাও, ‘শাস্তি’ দাও।

Advertisement

গল্প, উপন্যাস, সিনেমায় আমরা দেখেছি, এমনকি আমাদের বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও বলে বেশির ভাগ শিক্ষক ক্লাসে আসতেন বেত হাতে এবং প্রয়োজনে এমনকি অপ্রয়োজনে তার প্রয়োগ ঘটত ছাত্রছাত্রীদের উপর। কখনও কখনও সেই বেত্রাঘাত অমানবিক হলেও তার কোনও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটত না। কিন্তু এখন আমরা নতুন বছরে ঢুকে পড়েছি। আর এ বছরেই মহারণ— পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন— তার জন্য আমরা আদা-জল খেয়ে লেগে পড়েছি ‘বিহার মডেল’-এ ‘বঙ্গ বিজয়ে’। তাই পরিকল্পনা ছাড়াই, না একটু ভুল হল পরিকল্পনা ছাড়া নয়, এটাই পরিকল্পিত ব্যবস্থা, যা রান্না করা হয়েছে বিশেষ রসুই ঘরে।

Advertisement

হ্যাঁ, বলছিলাম ২৩ বছর পর শুরু হওয়া নিবিড় নির্বাচনী সংশোধন যার সংক্ষিপ্ত নাম এসআইআর নিয়ে। যে নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ভীষণ এক আতঙ্ক। কেন? সত্যিই প্রশ্নটা উঠেছে, কেন এই নির্বাচনী সংস্কারকে ঘিরে এত বিতর্ক? এই ভোটার তালিকার সংশোধন তো অনেকবারই হয়েছে। এর উত্তর একটাই— স্বচ্ছতার অভাব। সর্বপ্রথম যে বিষয়টা সামনে উঠে আসে, যে প্রতিষ্ঠানের হাতে এই ভোটার তালিকা সংশোধনের দায়িত্ব ‘জাতীয় নির্বাচন কমিশন’, সেই কমিশনে যাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদের মনোনয়নে নেই সততা এবং স্বচ্ছতা এবং ওই মনোনীত নির্বাচন কমিশনাররা স্বাধীনভাবে কাজ করছেন না বা করতে পারছেন না। তাঁরা দায়বদ্ধ প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি।

প্রথমেই বলা প্রয়োজন যে, আগে নির্বাচন কমিশনাররা নিযুক্ত হতেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দ্বারা গঠিত একটি কমিটি কর্তৃক। কিন্তু নতুন বিধি অনুসারে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনাররা নিযুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা দ্বারা। এর অর্থ নির্বাচন কমিশন হবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের পুতুল।

বিশেষত এখন একটাই ঝোঁক লক্ষ্য করা যায় যে, কোনও উচ্চপদস্থ আধিকারিক তিনি নির্বাচন কমিশনার বা অন্য পদে, নিযুক্ত হন গুজরাত ক্যাডার থেকেই। কেননা তাঁরাই কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ বিশ্বস্ত, যেমন এটাও লক্ষ্য করা যায় যে, বর্তমানে বিদেশি সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইনভেস্টেমেন্টের গন্তব্য গুজরাত। শুধু তাই নয়, যে কোনও আন্তর্জাতিক খেলা সে অলিম্পিক বা অন্য কোনও খেলার যোগ্য আয়োজক একমাত্র গুজরাত, অন্য কোনও প্রদেশ নয়। যে কথা বলছিলাম, যাঁদের হাতে রয়েছে এসআইআর-এর ভার তাঁদের স্বচ্ছতা নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন।

যে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, উঠছে। ক্রমাগত সিদ্ধান্তহীন, অপরিকল্পিত কর্মপদ্ধতি সর্বোপরি একটা ‘ভয়ের’ পরিবেশ সৃষ্টি করে কি সম্ভব স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা তৈরি করা? বিগত কয়েকটি নির্বাচনে আমরা দেখেছি, ভোটের নির্দিষ্ট দিনের ৪৮ ঘণ্টা আগে যখন সমস্ত নির্বাচনী প্রচার বন্ধ হয়ে যায়, ঠিক তখনই আমাদের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়— কেদারনাথের বাতানুকূল গুহাতে ধ্যানমগ্ন বৃহত্তম দলের প্রধানের ছবি প্রচারিত হয়, আবার কখনও কন্যাকুমারীর রকে বসে ধ্যানমগ্ন ছবির প্রচার— বিরোধী দল থেকে নির্বাচন কমিশনে প্রতিবাদ হলেও কমিশন থেকে যায় মূক ও বধির হয়ে।

অথচ অন্য ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা শুধু সক্রিয় নয়, অতি সক্রিয় ও হাস্যকর।বিহার মডেলের সাফল্য আমরা দেখেছি কিন্তু এবার দাওয়াই আরও কঠিন, কেননা এটা যে ‘বাংলা’। ব্রিটিশ আমল থেকে এই বাংলা ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের শিরঃপীড়া, বর্তমান প্রশাসনও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই দেশের সব রাজ্যের বিভিন্ন খাতে (১০০ দিনের কাজ বা প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, বা বিদ্যালয়ে পিএমশ্রী ইত্যাদি ইত্যাদি) সব বন্ধ করে বাংলাকে ভাতে মারার চেষ্টা চলছে ২০২২ থেকে। এবার নিবিড় সমীক্ষার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের বাদ দিয়ে একটি ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন তালিকা তৈরি করার সাধু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভোটে কোনোরকম জল মিশিয়ে কেউ ক্ষমতা দখল করতে না পারে। যেহেতু

২০২৬-এ বঙ্গের নির্বাচন, তাই ১ কোটির উপর রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলমানদের বাদ দেওয়ার জন্য এতটাই ব্যস্ততা যে কোনও সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই এসআইআর-এর কাজ শুরু করা হয়। আর এই অপরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করায় বার বার অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে, যার ফলশ্রুতি বার বার বিধি বদলান এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। সমস্যাটা হচ্ছে কমিশন তো নিজেদের বিচারবুদ্ধি দিয়ে কাজ করছে না। তাদের মাথার উপর ছুরি হাতে যে অদৃশ্য শক্তি চোখ রাঙাচ্ছে, তার পরিণতিতে এত ঘন ঘন নিদানের পরিবর্তন, অসম্ভব রকম কম সময়ে বিপুল কাজের ভার বিএলও সহ সর্বস্তরের কর্মীদের উপর, প্রতি মুহূর্তে কঠোর শাস্তির বাণী উচ্চারিত হচ্ছে।

এত ভয়ের পরিবেশে কি সত্যিই কোনও সুস্থ এবং নির্ভুল কাজ করা সম্ভব? ২৭ তারিখ এসআইআর-এর সাক্ষাৎকার শুরুর প্রথম দিনেই সংবাদমাধ্যমে যে সমস্ত খবর এবং আবারও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তহীনতা বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে বিভ্রান্ত করে তুলেছে। ২০০২ সালে যাদের নাম থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রশ্ন ছিল, যে প্রশ্নগুলো বিএলওরা নিজেরাই সমাধান করতে পারতেন যদি তাঁদেরকে সময়-স্বাধীনতা এবং নির্ভুল ও সক্রিয় বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা দেওয়া হত। শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে কোনও সুস্থ ব্যবস্থা কখনও সম্ভব নয়। একজন ভোটারের কথায় (যেটা ২৭ তারিখ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে)

২০০২-এর ভোটার লিস্টে তাঁর নাম পাওয়া যায়নি যখন এসআইআর-এর ফর্ম পূরণ করেছিলেন। সুতরাং শুনানিতে ডাক পেয়েছেন। কিন্তু পরে তিনি পান তাঁর নামটি ২০০২-এর তালিকায়। কিন্তু যেহেতু সময়মতো তালিকায় নামটি পাওয়া যায়নি, তাই যেতে হয় শুনানিতে। আসলে প্রথম থেকেই জানা গেছে যে, ২০০২-এর হার্ড কপির সঙ্গে ডিজিটাল তালিকায় বেশ ফারাক আছে। প্রথম পর্যায়ে যদি সঠিকভাবে স্ক্রুটিনি করা হত, তবে এসব অবাঞ্ছিত হয়রানি হত না ভোটারদের। শুধু কি তাই, শুনানিতে যে অমানবিক চিত্র উঠে আসছে অসুস্থ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, দিব্যাঙ্গদের যেভাবে ডেকে আনা হয়েছে এই প্রবল শীতে, সেটা ভাবার বোধ হয় মানবিকতার কারণে প্রয়োজন ছিল।

ভোটে জয়লাভের একমাত্র লক্ষ্য সামনে রেখে এভাবে মানবতাকে ‘অপমান’ ঠিক হচ্ছে না।এসআইআর-এর প্রথম থেকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের একটাই অস্ত্র, সেটি হল ‘শাস্তি’-র খাঁড়া আর ‘সময় কম’ করে দাও, যাতে খুব সামান্য ভুলের কারণে বাদ দেওয়া যায় ভোটারের নাম। কেননা সেটাই যে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব (পড়ুন কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ)। শাস্তির খাঁড়া মাইক্রো অবজারভারদের উপরও, যারা ট্রেনিংয়ে যোগ দেননি। হুমকি সাসপেন্ড হওয়ার। আরও এক ‘শাস্তি’র নিদান, যদি কোনও ভোটার ভুল নথি দেন, তবে সে জন্য ১ বছরের জেল হবে।

এই শাস্তির ভয়ে বিএলও-রা আত্মহত্যা করছেন, এগুলির কোনও মূল্যই নেই নির্বাচন কমিশনের কাছে। তাদের লক্ষ্য অতি অল্প সময়ে জাল গুটিয়ে ২০২৬-এর মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেওয়া। প্রস্তুতি পর্ব এক্ষেত্রে শেষ, এমনকি ভোটে কত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী থাকবে এবং কতদিন সেটাও ঠিক করা হয়ে গেছে, অবশ্য নির্বাচন এখনও ঘোষিত হয়নি।আসলে বঙ্গ বিজয়ের জন্য যে কোনও ছল-বল-কৌশল সবই ‘ফেয়ার’। পুরো ভারতকে জয় করতে গেলে বঙ্গবিজয় প্রয়োজন তার জন্য দাঙ্গাও লাগানো যায়, অসুবিধা নেই। মুঘল সাম্রাজ্যবাদ গেছে ইতিহাস থেকে, গান্ধী-নেহরুকে গিলে ফেলা গেছে। ‘বঙ্কিমদা’কেও হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেছি। শুধু গেলা যাচ্ছে না রবিদাকে (রবীন্দ্রনাথ)। আমরা রামমোহন রায়কে ব্রিটিশের মো-সাহেব বানিয়ে দিয়েছি।

যাঁরা একদিন বাংলায় এনেছিলেন নবজাগরণ, যে বিষয়ে আমাদের জ্ঞান জিরো, সেই আমরাই এবার লক্ষ্যে স্থির নবজাগরণ আনবই আনব। কিন্তু প্রশ্ন হল এসআইআর-এর খসড়া তালিকা তো প্রকাশিত। এবার কি আমরা জানতে পারব প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশিদের সংখ্যা ঠিক কত? নাকি আসামের মতো এখানেও হিন্দু মতুয়ারাই শুধু ভোটাধিকার হারাবেন! আসলে একটা কথা মাথায় রাখা জরুরি, মিথ্যা প্রচার, অতিরিক্ত শাসন এবং সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে তোলা এবং বঞ্চিত করা— এটা কখনওই দীর্ঘকাল ধরে চলতে পারে না। সাময়িক বিভ্রান্তি সম্ভব, কিন্তু বিশাল সংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা যায় না, প্রতিবাদ হবেই। সর্বস্তরের রাজনীতির মানুষদের বলব, একটু সময় করে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাটি একটু দেখুন, কিছু যদি শিক্ষা লাভ করা যায়— ‘দড়ি ধরে মারো টান / রাজা হবে খান খান…’৷

Advertisement