• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 21 June, 2026

মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তি

ভিভাটেকের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ‘এআই কান্ট্রি পার্টনার’ হিসেবে অংশগ্রহণ করছে— এটি কেবল কূটনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। ভারতীয় স্টার্ট-আপ এবং উদ্ভাবকদের উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়, এই দেশ কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং একটি সক্রিয় নির্মাতা

প্যারিসের ভিভাটেক ২০২৬ মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে— প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত অগ্রগতির হাতিয়ার হতে পারে, যখন তা সবার জন্য উন্মুক্ত ও মানবকেন্দ্রিক হয়। তাঁর ‘এআই মানে অল ইনক্লুসিভ’—এই সংজ্ঞা কেবল একটি শব্দের নতুন ব্যাখ্যা নয়, বরং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি— সর্বত্রই এর প্রভাব বাড়ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসছে— এই প্রযুক্তি কি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে? নাকি এটি কেবল কিছু নির্দিষ্ট মানুষের হাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্য এই প্রশ্নের একটি ইতিবাচক উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ জরুরি। অর্থাৎ, প্রযুক্তি এমনভাবে বিকশিত হতে হবে যাতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ তার সুফল পায়। ভারতের ডিজিটাল যাত্রা এই ধারণারই একটি বাস্তব উদাহরণ। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, আধারভিত্তিক পরিষেবা, কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার— এসবই দেখিয়েছে কীভাবে প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে।
এআই-এর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, এআই মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, শিক্ষার সুযোগ বাড়াবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে এবং পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হবে। বিশেষ করে শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা, ব্যক্তিগতভাবে উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা— এসব ক্ষেত্রে এআই-এর সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। ভারতের মতো বহুভাষিক দেশে এটি একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন। ভুয়ো তথ্য, ডিপফেক, সাইবার প্রতারণা— এসব সমস্যার কারণে এআই-এর অপব্যবহারও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই তিনি যে ‘সুরক্ষা ও নৈতিকতার’ উপর জোর দিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, তার ব্যবহারে মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি।
এখানেই ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষত্ব। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উন্নতি নয়, তার সামাজিক প্রভাব এবং নৈতিক ব্যবহারের ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, এআই এখন আর কোনও একটি দেশের সীমায় আবদ্ধ নয়— এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। ফলে এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
ফ্রান্সের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা এই প্রেক্ষিতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ভিভাটেকের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ‘এআই কান্ট্রি পার্টনার’ হিসেবে অংশগ্রহণ করছে— এটি কেবল কূটনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। ভারতীয় স্টার্ট-আপ এবং উদ্ভাবকদের উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়, এই দেশ কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং একটি সক্রিয় নির্মাতা।
একই সঙ্গে ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গও উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও দক্ষতা বিনিময়ের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এর ফলে ভারতীয় প্রযুক্তি শিল্প আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়বে।সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে— যেখানে প্রযুক্তি এবং মানবিকতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
‘অল ইনক্লুসিভ এআই’ অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি এমন একটি পথনির্দেশ যা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিকে আরও ন্যায়সঙ্গত, নিরাপদ এবং মানবকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হলে, প্রযুক্তি সত্যিই একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে— যেখানে উন্নতি হবে সবার এবং কেউ পিছিয়ে থাকবে না।