• facebook
  • twitter
Sunday, 1 February, 2026

সে হেমন্তে মুই হিমানী

মিশনারি স্কুলে পড়ি তখন৷ সকালবেলায় একই শব্দ ও বাক্যে সাজানো প্রার্থনাগান গাইতে কান্না পেত৷ খালি ভাবতাম— ঈশ্বর কেমন মানুষ গো!

ফাইল চিত্র

ময়ূরী মিত্র


আজ বিকেলে টুকরো এক রোদ নাগেরবাজারের ফ্ল্যাটবাড়ির মাথায় এসে পড়ল৷ টুকুস টুকুস মায়া ছিটল আমার গায়ে মুখে৷ দিন শেষের এ রোদটায় হেমন্তের স্বভাবজাত শীতল ভাবখানি জাগ্রত হয়েছিল৷ মন জাগল ৷
মনে এল— ছেলেবেলায় পুজো শেষ হলেই লোডশেডিংয়ের বাড়াবাড়ি শুরু হত৷ বড় হত সন্ধে৷ লম্বা হত সূর্য ডোবার মনখারাপ৷ বড় সন্ধ্যা নামার আগেই মেজে সাফ করা হত বাড়ির যত হারিকেন— আমার পড়ার লণ্ঠন।

Advertisement

মাঝখানে কেরোসিনের টেবিললণ্ঠন৷ ওপাশে মা৷ এপাশে একটি ছোট ডেস্কে আমি বই খাতা নিয়ে৷ শহরে তখন অল্প অল্প শীত পড়তে শুরু করেছে৷ লণ্ঠনের তাপ আরাম দিত৷ তার শিখায় আমার গললু মায়ের মুখখানা মনে হত একটা মিঠে দইয়ের হাঁড়ি৷ খানিক জ্বলার পরই লণ্ঠনে পোকারা আসত৷ আলো বোধহয় জীব ছাড়া বেশিক্ষণ থাকতে পারে না৷ জ্বলন্ত ল্যাম্পের গায়েই পোকাগুলোকে লেটকে মারতাম— যেটা ধুকপুক করে বাঁচতে চাইত সেটাকে নখের কোনা দিয়ে খুঁচিয়ে মারতাম— পাছে পোকার আঁধারে আমার মায়ের মুখ ঢেকে যায়৷ আমার পুলিশি মারে পোকা মরত নকশালী হারে৷

Advertisement

পোকাহীন বাতির আলোয় উজ্জ্বল হতেন মা৷ আমি মনের আনন্দে ভুলভাল অঙ্ক করে চলতাম৷ রংকানা হয়ে লালের বদলে বেগুনি মার্বেল পেপার দিয়ে দুনিয়ার যত ফালতু work education করতাম৷ সব ভুলে ভরা৷ সাদা হাঁসের বদলে গাম দিয়ে চিপকাতাম গুলাবি মার্বেলের হাঁস৷ আমার ভুলে মা চেঁচাতেন৷ দুলতাম আর হাসতাম৷ বলতাম— মা, এ সাদা নয়, এ হল হাঁদা হাঁস৷ মা ফের চেঁচাতেন৷ আমি আরও বেশি করে হাসতাম৷ আমার দোলানি— আমার শরীর বাঁকানো হাসি মায়ের ক্রোধী মুখে সুন্দর সুন্দর আলো ছায়ার মজা তৈরি করত৷ কী উজ্জ্বল সে ভুল! হায় রে! ভুলে এত উদ্ভাসিত পাপীর হৃদয় ?

সে ছিল আমার হেমন্তের মাতৃদর্শন৷ আমার প্রতিমা৷ চিনি মাখা সর একদম৷
আজ এ হেমন্তে প্রার্থনা করি— মা, তুমি শত হয়ে— সহস্র হয়ে— ভেঙে দাও যত হিংস্র কুকুরের দাঁত— যারা তোমার উপোসী মেয়ের হাত কামড়ে খায়! তোমার লক্ষ স্তনের পানীয় দাও মা মাঠে বসা সন্তানদের৷ দুধচান করিয়ে দাও দেশজোড়া শোষিতকে৷ লণ্ঠনের আলোয় আমি যে তোমার চোখে তেজ দেখতাম, মা৷ বোধহয় সব সন্তানই দেখেছিল কোনও এক হেমন্তে তার মায়ের চোখ৷
ওমা! পারবে না?


সাঁঝগগনের বুকে তখন হেমন্ত আর হেমন্ত৷ সূর্যের অস্তকালের ঘোলাটে কমলা… সদ্য জাগা তারাদের দেহে শীতল স্পর্শ… কী না থাকত আমার ছেলেবেলার প্রিয় ঋতুটিতে! হেমন্তকে শীতের থেকে পৃথক করে বোঝার বয়স তখন হয়নি৷ শুধু কার্তিক মাস পড়লে মনে হত, এবার বেলগাছিয়ার মাঠের ঘাসগুলোয় জলবিন্দু বসবে একটা একটা করে৷ আর তারপর ভেজা ঘাসের শিস আমার স্কুলের নিউকাটের বেল্টে জড়িয়ে যাবে৷

মিশনারি স্কুলে পড়ি তখন৷ সকালবেলায় একই শব্দ ও বাক্যে সাজানো প্রার্থনাগান গাইতে কান্না পেত৷ খালি ভাবতাম— ঈশ্বর কেমন মানুষ গো! একই গান শুনতে তাঁর বিরক্ত লাগে না! কষিয়ে দুটো থাপ্পড় লাগায় না কেন, যারা এসব গান একই ধরনের বেসুর লাগিয়ে গেয়ে যাচ্ছে৷ একটা কমলা পর্দায় মোড়া বদ্ধ ঘরে যীশু ডাকতে বলা হল৷ এটাই নাকি প্রেয়ার রুম আর এইভাবে বিড়বিড় করে যীশু ডাকাই নাকি প্রার্থনা৷ যীশুর মতো একটা হরিণচক্ষু কোমলপ্রাণ মানুষকে বন্দি করব এমন বদ্ধ ঘরে! যেখানে রোদ বৃষ্টি আলো কালো কিছু বোঝা যায় না!

হেমন্তকাল তখন৷ সন্ধেবেলা মাঠে গিয়ে ঘুরছি৷ বড় বড় লোহার পাইপ রয়েছে একদিকে৷ এগুলো ড্রেনে বসানোর পাইপ৷ আমরা বলতাম, পেটমোটা গুণ্ডা পাইপ৷ এই গুণ্ডা পাইপের মধ্যে দিয়ে একটা উঁচু মানুষ ঢুকে ওপার দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে৷ দুপুরবেলায় গুণ্ডাপাইপে লুকোচুরি খেলতাম৷ যে চোর সেও যেমন লুকোনোর জন্য একটা গুণ্ডাপাইপ বাছত, তেমনি পুলিশও গুণ্ডাপাইপের মধ্যে লুকিয়ে থাকত৷ কে যে কাকে ধাওয়া করেছে বোঝা মুশকিল৷ দুঃখসুখের নদীর মতো! কোন কূলে সুখ আর কোন কূলে অশ্রু বোঝা যায় না যেমন!

সন্ধেতে এর আগে মাঠে এমন ঘুরিনি! ঈশ্বর ডাকতেই হবে মন্তর পড়ে, স্কুলের নানদের এই বাধ্যতা হয়ত সেদিন শিশুমনে তীব্র বিরূপতা তৈরি করেছিল৷ দেখলাম, সন্ধেতে গুণ্ডাপাইপের ভেতরে এক একটি দীপ জ্বলে উঠেছে৷ কেউ কুপি জ্বালিয়ে ভাত রাঁধছে৷ কেউ রুটি বেলছে! কোনোটায় আবার ছেলে মেয়েরা বইপত্তর নিয়ে বসেছে৷ কোনও মা অপেক্ষাকৃত আঁধারে বুকেরটাকে মাই দিচ্ছে৷ পাইপের এক একটি অভ্যন্তর এক একটি সংসার৷ রেশনের চালের কটু গন্ধ টুপুস শিশির মিলেমিশে মহাপ্রার্থনার জন্ম দিল—

ও বাবা আকাশ৷ এদের ভালো রাখো৷ এদের পাইপঘরে দুটো করে মোমবাতি দাও৷ হারু-নাড়ু অত কম আলোয় পড়তে যে পারে না, তুমি বোঝো না হাঁদারাম৷ আর মাঝে মাঝে এদের গোবিন্দ চাল (গোবিন্দভোগ) আর ছোট আলু দিও৷ সেদ্ধ করে ঘি মেখে খাবে৷ শিশির পড়া শুরু হলেই নতুন আলু ওঠে৷ গীতাপিসি আমায় বলেছে৷ আমি তোমায় বললাম!
সেই রাতে শুনলাম, বাবা লবণহ্রদ বলে একটা জায়গায় নতুন বাড়ি বানিয়েছেন৷ সব মেঝেতে মোজাইক৷ দেওয়ালের রঙ ডললেও আঙুলে রঙ লাগে না৷ আমরা এবার সে বাড়িতে চলে যাব৷ নতুন বাড়ি গিয়েই নতুন সোফা কেনা হবে৷…
চেঁচিয়ে উঠলাম— সেখানে মাঠ আছে মা? আর গুণ্ডাপাইপ? খোকা, তার মা আর তার নেশায় টলতে থাকা বাপ… সব সেখানে পাব তো হাতের কাছে!

হেমন্ত ঝরল একফোঁটা…
টুপ…

Advertisement