• facebook
  • twitter
Thursday, 19 March, 2026

সেকালের কলকাতায় কলেরা ও কলের জল

কলেরা বা ওলাউঠার অন্যতম কারণ অপরিষ্কার ও ময়লা জল ব্যবহার

সেকালে কলকাতা আজকের মতো ছিল না। পানীয় জল, রাস্তঘাট, নিকাষী নালা, যানবাহন, জনস্বাস্থ্য সবই ছিল আলাদা। তাঁর এলাকাও ছিল সীমিত। এমন কলকাতা নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী ছিল কলেরা, যা মহামারী হিসাবে মানুষের জীবনকে গ্রাস করে নিত । কিন্তু একসময় কলের জল চালু হলে তা মানুষের এাতা হয়ে দাঁড়ায়।

কলেরা বা ওলাউঠার অন্যতম কারণ অপরিষ্কার ও ময়লা জল ব্যবহার। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের দিকে কলকাতার দিকে তাকালে দেখা যায়, কলকাতায় দক্ষিণ ভাগে ইউরোপীয়রা বাস করতেন। এদিকের বাড়িগুলি সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং রাস্তাগুলি প্রশস্ত। শহরের উত্তরাংশ বেশি লোকের বাস। মাঝখানে গরীব ইউরোপীয় এবং চিনা ও অন্যান্য মিশ্রজাতি বাস করত। এখানে ছিল বড় বড় সওদাগরদের অফিস।

Advertisement

শহরের প্রায় সমস্ত অংশে গরিব লোকেরা ছোট-ছোট বসতি নির্মাণ করে খোলা ঘরে বাস করত। এই সমস্ত বস্তির মধ্যে অসংখ্য ময়লা জলে পূর্ণ পুকুর বা ডোবা ছিল। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর শৈশবের স্মৃতিতে লিখেছেন— ‘কিন্তু তখন এখানে ওখানে সেখানে খালি মাঠের ছড়াছড়ি। আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট পুকুর আর ডোবা। কোঠাবাড়ি এত ছিল না’। বঙ্গদেশের নিম্নভাগ সমুদ্রকূল হতে সামান্য উঁচু ছিল। সে জন্য বর্ষাকালে নিম্নবঙ্গের প্রায় সমস্ত অংশে বন্যা হত। তাই নিম্নবঙ্গ কলকাতা বর্ষাকালে ডুবে যেত। সেজন্য কলকাতা ও শহরতলির অধিবাসীগণ গর্ত করে মাটি কেটে উঁচুতে বাড়ি তৈরি করত। এই জন্য কলকাতা ও শহরতলিতে এত ডোবা দেখা যেত।

Advertisement

কলকাতার শহরতলিতে তখন অল্প ব্যবধানে এক-একটি পুকুর ছিল। সেই পুকুরপাড়ে আম, জাম, নারকেল, তাল, সুপারি ও অন্যান্য গাছ ছিল। লোকেরা মাটির বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করত। পুকুরে এই সমস্ত গাছের পাতা ও লতা এমনকি আস্ত গাছ পড়ে জলদূষিত করত। তাঁর সঙ্গে অধিবাসীদের বাড়ির নোংরা জল মলমূত্র এসে ডোবায় পড়ত। এই অপরিষ্কার পুকুরের ময়লা জল স্নানের জন্য, রান্নার কাজে ব্যবহার করা হত।

গ্রীষ্মকালে ডোবা ও পুকুরের জল শুকিয়ে যায় এবং যা অবশিষ্ট থাকে তা পরীক্ষা করে দেখলে ওই জল এবং শহরের ময়লা ধোয়া জলের মধ্যে সামান্যই পার্থক্য। শহরের পুকুরের অবস্থাও একই। ডাক্তার পেন সাহেব বলেন— ‘এমন কোনও কথা নেই যার দ্বারা কলকাতার পুকুরের জলের বিষয় বলা যায়। এ জল শহরের প্রস্রাব বা ময়লা ধোয়া জল বলা যায়। কলকাতার পুকুরের জল লন্ডন শহরের ময়লা জল অপেক্ষাও ভয়ানক জিনিস।

কলকাতায় তখন কাঁচা ড্রেন থাকায়, ড্রেন বাহিত জল পুকুরে এসে পড়ত। পুকুরের চারদিকে রাশিকৃত ময়লা বা আবর্জনায় পূর্ণ। গৃহস্থেরা ওই পুকুরে স্নান করে, কাপড় কাচে, বাসন মাজে, ওই জলে মুখ ধোয়, পান করে এবং পানীয় দুধে মেশায়। কলকাতার বস্তির লোক যদি একটা ময়লা ভর্তি গর্ত পায় এবং ওই ময়লা যদি এমন তরল হয় যে, গায়ে দিলে গায়ে না লেগে থাকে তবে ওই ময়লাই জল বলে ব্যবহার করে, তাতে স্নান করে, মুখ ধোয় এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করে।’

মিঃ এ, পেডলার সাহেব কলকাতার ১২৪টি পুকুর এবং ৭৬টি কূপের জল পরীক্ষা করে বলেন— ‘আমি শহরের ২০০টি পুষ্করিণীর ও কূপের জল পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি, তন্মধ্যে শতকরা ৪৪টির জল কেবল শহরের ময়লা ধোয়া জল বই আর কিছুই নহে। শতকরা ২২টির জল অত্যন্ত অধিক ময়লাযুক্ত, শতকরা ২০টির জল অধিক ময়লাযুক্ত। শতকরা ৯টির জল সাধারণ অপরিষ্কার জল এবং শতকরা ৪টি কি ৫টির জল পানের জন্য ব্যবহৃত হইতে পারে। এই শেষোক্ত গুলি কলিকাতার ময়দানস্থিত রক্ষিত পুষ্করিণীর জল’।

পেডলার সাহেব আরও বলেন যে, ‘বর্তমান কলের জলের ছয় ভাগ নিয়ে তাতে যদি শহরের খুব ঘন ময়লা ধোয়া জল দু’ভাগ মিশিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে ওই মেশানো জল গড় পড়তা কলকাতার পুকুর ও কূপের জলের সমান হয়।
কলকাতার কলেরার কারণ কেবলমাত্র পুকুর, ডোবার নোংরা জল নয়, গঙ্গার জলও এ জন্য দায়ি। কলকাতায় কলের জল প্রচলিত হওয়ার পূর্বে শহরের অধিবাসীগণ পুকুর, কূপ ও গঙ্গার জল ব্যবহার করত। পরেও অনেকে গঙ্গাজল ব্যবহার করে। গঙ্গার জলও নানা কারণে অপরিষ্কার।

কলকাতার গঙ্গার অসংখ্য নৌকা ও জাহাজ রয়েছে। নৌকার ও জাহাজের লোকেরা জলে মলমূত্র ত্যাগ করে৷ এ সকল মলমূত্র নদীর ধারে যেখানে স্রোত কম সেখানে ভাসতে থাকে। মৃত পশু গঙ্গায় ফেলে দেয়। কলকাতার লোকেরা ওই জলে স্নান করে, মুখ ধোয় এবং কলসি ভর্তি করে বাড়িতে জল নিয়ে আসে। বিস্তর লোক গঙ্গায় গিয়ে স্নান করে এবং গঙ্গার জল ব্যবহার করে। প্রতিদিন সকালে কলকাতার গঙ্গার স্নানের ঘাটসমূহ জলপূর্ণ হয়। কমিশন স্বচক্ষে দেখেছে যে ছোটছোট শিশুদের পর্যন্ত গঙ্গাস্নানের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

কমিশন কলেরার জন্য গরুর দুধকেও দায়ী করেছে। কলকাতায় খাটালগুলি অত্যন্ত অপরিষ্কার। ওই সমস্ত গোয়ালা বস্তির মধ্যে প্রায় সমস্ত জায়গাই পচা জলভর্তি পুকুর আছে। গোয়ালারা দুধের সঙ্গে ওই জল মিশিয়ে কলকাতায় দুধ বিক্রি করে। কলেরা রোগের জীবানু দুধে পুষ্টি লাভ করে। তাই দুধ জাল না দিয়ে তা কাঁচা পান করলে কলেরা রোগের সৃষ্টি হয়। বাইরে থেকে কলকাতায় আসা দুধে কলেরার জীবানু আসে । ১৮৭২ সালের ইণ্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেটে ডাক্তার কেলি উল্লেখ করেছেন, ‘কলকাতার কাছে কেদারহাটী নামক গ্রামে ৩০০ ঘর লোকের মধ্যে প্রায় ৭০ জন গোয়ালা ছিল৷ তারা কলকাতায় এসে দুধ বিক্রি করত।

এই ৭০ জন গোয়ালার বাস একটি পচা পুকুরের চারদিকে। ১৮৭২ সালে ওই গোয়ালাদের মধ্যে ১৬ জন কলেরার আক্রান্ত হয়, তারমধ্যে ৮জন মারা যায়। তাঁর পরের বৎসর তাঁদের মধ্যে কলেরা দেখা দেয়। সে বছর বাইরে থেকে কলকাতায় কলেরার জীবানু এসে ছিল।’ ডাক্তার পেন বলেন, ‘১৮৭৭ সালে জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে কলকাতায় ৫৫০ জন লোক কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তারমধ্যে ৫০৮ জন নিত্যান্ত গরীব ও ইতর শ্রেণীর, অবশিষ্ট কয়েকজন ছাত্র, শিক্ষক ও কেরাণী ছিল। কিন্তু ধণীলোকের মধ্যে একজনও কলেরায় মারা জাননি।’

কলকাতার লোকেদের কলেরা মহামারির হাত থেকে বাঁচাবার উপায় হল কলের জল ব্যবহার। তাই ১৮৬৯ সাল থেকে কলকাতায় কলের জল প্রচলন হয়। জলের কল আরম্ভ হতেই শহরের প্রধান প্রধান গলি ও রাস্তায় জলের পাইব বসান হয়। ওইসমস্ত রাস্তার সংখ্যা ৩৬০টি। ১৮৭০ সালের শেষে ১১৬৪টি বাড়িতে কলের জলের লাইনের সংযোগ দেওয়া হয়। ১৮৭২ সালে ৫৮৭৪টি বাড়িতে কল হয়, ১৮৭৫ সালে ৮৯৭০ এবং ১৮৭৭ সালে ১০৪৭১টি বাড়িতে জলের কল হয়।

আশঙ্কা হয়ে ছিল যে, হিন্দুরা এই জল ব্যবহার করবে কিনা। কিন্তু পরে দেখা গেল সমস্ত লোক জল ব্যবহার করছে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ বিধান দিলেন যে, কলের জল ব্যবহারে দোষ নেই, তবে দেবসেবায় না ব্যবহার করলেই হল।
তবে কলকাতায় কলের জল ব্যবহারের ফলে কলেরা কমে যায় বলে কমিশন স্বীকার করে ছিল। ১৮৭১-৭২ সালে বাংলায় সর্বত্র কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়। অথচ ওই দু’বৎসর কলকাতায় কলেরায় অল্প লোক মারা যায়। কলের জল চালু হবার পূর্বে লোক বাধ্য হয়ে পুকুরের জল ব্যবহার করত, কারণ মিউনিসিপালিটির দ্বারা রক্ষণা-বেক্ষণে দু-চারটি পুকুর ছাড়া সহরের ভালো জল পাবার উপায় ছিল না। কিন্তু কলের জল চালু হওয়ামাত্র কলেরার প্রাদুর্ভাব হঠাৎ কমে যায়। তবে কলকাতা শহরতলী অবস্থা আগের মতোই ছিল।

কলের জল ব্যবহার সত্ত্বেও ১৮৮০ সাল থেকে কলকাতায় কোন কোন পাড়ায় কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়ে ছিল। ১৮৮৬ সালে কুমারটুলিতে কলেরা বৃদ্ধি পায়। ওই বছরের রিপোর্টে স্বাস্থ্যরক্ষক ডাক্তার সিমসন সাহেব উল্লেখ করেছেন, ওই স্থানে কলের জল যথোচিতভাবে যোগান ছিল না। কলকাতার অনেক স্থানে দেখা যায় কলের জল নেওয়ার জন্য অনেক লোক কলসী নিয়ে অপেক্ষা করছিল। একটি কলসী পুরতে ১৫ মিনিটের বেশি সময় যাচ্ছিল। কেউ পাচ্ছিল কেউ পায়নি। আগে ফোর্ট ইউলিয়াম দুর্গে কলেরা হলেও ১৮৬৫ সালের পর পরিষ্কার জল ব্যবহৃত হওয়ায় তা আর দেখা যায়নি। তাই বহুদিনের মহামারিরূপ কলেরার আতঙ্ক রোধ করে ছিল কলের জল। স্বস্তি পেয়েছিল কলকাতার মানুষ।

Advertisement