সৈয়দ হাসমত জালাল
আসামের নির্বাচনী রাজনীতি বহুদিন ধরেই কেবল দলগত শক্তির লড়াই নয়, এর সঙ্গে কাজ করছে স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব, আঞ্চলিক পরিচয় ও সামাজিক সমীকরণের সূক্ষ্ম মিশ্রণ। আসন্ন ৯ এপ্রিলের নির্বাচনকে ঘিরে উজানি আসাম– বিশেষ করে তিতাবর, মরিয়নি এবং যোরহাট— এই তিনটি কেন্দ্র সেই জটিল সমীকরণেরই এক জীবন্ত প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। এখানে কেবল প্রার্থী বনাম প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং অতীত বনাম বর্তমান, উত্তরাধিকার বনাম রাজনৈতিক পুনর্গঠনের এক গভীর দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক ব্যক্তি– তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ।
Advertisement
কেন এখনও প্রাসঙ্গিক তরুণ গগৈ? আসামের দীর্ঘতম সময়ের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তরুণ গগৈ কেবল প্রশাসনিক সফলতার জন্যই নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার জন্যও স্মরণীয়। ২০০১ থেকে ২০১৬— এই পনেরো বছরের শাসনকাল অনেকের কাছে স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতীক তিনি। বিদ্রোহ, উগ্রপন্থা ও সামাজিক বিভাজনের এক অস্থির সময় থেকে আসামকে তুলনামূলক শান্তির পথে ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব তাঁর নেতৃত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
Advertisement
এই কারণেই তিতাবরের চায়ের দোকানদার থেকে চা-বাগানের শ্রমিক, অনেক সাধারণ ভোটার এখনও তাঁকে স্মরণ করেন একজন হাসিখুশি ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে। এই স্মৃতি শুধু আবেগ নয়, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক পুঁজি, যা বর্তমান নির্বাচনে কংগ্রেস কাজে লাগাতে চাইছে।
এই নির্বাচনে কংগ্রেসের কৌশল স্পষ্ট। তারা অতীতের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিকে একসঙ্গে জুড়ে দিতে চাইছে। এই জায়গায় উঠে আসছেন গৌরব গগৈ– তরুণ গগৈয়ের পুত্র এবং বর্তমানে আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি।
গৌরব গগৈয়ের প্রচারে বারবার উঠে আসছে তাঁর পিতার শাসনকাল এবং বর্তমান সরকারের মধ্যে পার্থক্যের প্রশ্ন। তাঁর বক্তব্যে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘ভয়’, ‘বিভাজন’ এবং ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’-র অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই তিনি স্মরণ করছেন অতীতের ‘সহনশীলতা’ ও ‘ঐক্য’-এর কথা। এই তুলনা কেবল রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, এটি ভোটারদের মনে এমন নৈতিক ছবি তৈরি করার প্রচেষ্টা— যে ছবিটি একটি ‘মরাল ফিগার’ হিসেবে তরুণ গগৈয়ের।
এই নির্বাচনী লড়াইয়ের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দলবদলের রাজনীতি। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজেই একসময় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ছিলেন। ২০১৫ সালে তাঁর বিজেপিতে যোগদান আসাম রাজনীতির একটি বড় বাঁক। এরপর থেকে কংগ্রেসের বহু প্রভাবশালী নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।
গৌরব গগৈয়ের এই বক্তব্য— ‘আসামে প্রকৃত বিজেপি নেই, এটি প্রাক্তন কংগ্রেস নেতাদের একটি গোষ্ঠী’— আসলে এই বাস্তবতারই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। অর্থাৎ আদর্শগত লড়াইয়ের পাশাপাশি এটি এক ধরনের উত্তরাধিকার পুনর্দখলের যুদ্ধও। কংগ্রেস বলতে কী বোঝায়, সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই যেন দ্বন্দ্ব।
তিতাবরে এবারের লড়াই ত্রিমুখী— কংগ্রেসের প্রাণ কুর্মি, বিজেপির ধীরাজ গোয়ালা এবং নির্দল প্রার্থী ভাস্কর জ্যোতি বরুয়ার মধ্যে। বরুয়া নিজে কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক ছিলেন, কিন্তু টিকিট না পেয়ে নির্দল হিসেবে লড়ছেন। এই পরিস্থিতি কংগ্রেসের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই বিজেপির জন্য সুযোগ।
একইভাবে যোরহাটেও গৌরব গগৈ বনাম বিজেপির হিতেন্দ্রনাথ গোস্বামীর লড়াই হবে অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। এই সব ক্ষেত্রেই ‘তরুণ গগৈ ফ্যাক্টর’ কতটা ভোটে রূপান্তরিত হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
মরিয়নির শিক্ষাবিদ হরেন গোয়ালার একটি মন্তব্য এই আলোচনার কেন্দ্রে– ‘তরুণ গগৈ একটি ব্র্যান্ড’। একজন প্রয়াত নেতার জনপ্রিয়তা অনেক সময় তাঁর জীবদ্দশার থেকেও বেশি প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা অন্য প্রার্থীর পক্ষে কতটা ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে, তা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের উপর।
প্রথমত, বর্তমান প্রজন্মের ভোটারদের কাছে তরুণ গগৈ কতটা প্রাসঙ্গিক? দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস কি সেই স্মৃতিকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারছে? তৃতীয়ত, বিজেপির শক্তিশালী সংগঠন ও নির্বাচনী যন্ত্রের বিরুদ্ধে এই আবেগ কতটা টিকতে পারবে?
বিজেপির রাজনীতির একটি বড় শক্তি হল তাদের ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’— অর্থাৎ উন্নয়ন, জাতীয়তাবাদ এবং পরিচয়ের প্রশ্নকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক গল্প তৈরি করা। এর বিপরীতে কংগ্রেসের বর্তমান কৌশল অনেকটাই অতীতনির্ভর।
এই জায়গায় প্রশ্ন উঠছে, শুধু অতীতের স্মৃতি কি বর্তমানের উন্নয়ন-রাজনীতির বিরুদ্ধে যথেষ্ট? নাকি কংগ্রেসকে নতুন করে একটি বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণ গগৈয়ের উত্তরাধিকার একটি অংশ হবে, কিন্তু একমাত্র ভরসা নয়?
আসামের রাজনীতিতে জাতিগত ও সামাজিক পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অহোম সম্প্রদায়ের মধ্যে তরুণ গগৈয়ের প্রভাব এখনও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বিজেপিও এই সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করতে সক্ষম হয়েছে।
একই সঙ্গে চা-শ্রমিক সম্প্রদায়, মুসলিম ভোটার এবং অন্যান্য অনগ্রসর গোষ্ঠীর মধ্যে কংগ্রেসের ঐতিহ্যগত প্রভাব রয়েছে। এই সব গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং ভোটে রূপান্তরিত করা— এই দুটিই কংগ্রেসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
গৌরব গগৈয়ের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের ‘ভয়’-এর প্রসঙ্গ। এই অভিযোগ নতুন নয়, সারা দেশেই বিরোধী দলগুলি একই ধরনের অভিযোগ তুলেছে।
তবে এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, ভোটাররা কি সত্যিই এই বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন? নাকি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ই শেষ পর্যন্ত বেশি প্রভাব ফেলবে?
আসামের এই নির্বাচন কেবল কয়েকটি আসনের ফলাফল নির্ধারণ করবে না, এটি রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকও নির্দেশ করবে। যদি ‘তরুণ গগৈ ফ্যাক্টর’ কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে তা কংগ্রেসের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেবে। অন্যদিকে, যদি এই কৌশল ব্যর্থ হয়, তবে কংগ্রেসকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে ভাবতে হবে।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন একটি বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—আসামের ভোটাররা কি অতীতের স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির স্মৃতিকে বেছে নেবেন, নাকি বর্তমানের শক্তিশালী সংগঠন ও নতুন রাজনৈতিক বর্ণনাকে সমর্থন করবেন?
Advertisement



