• facebook
  • twitter
Sunday, 18 January, 2026

সমবায়ের মাধ‍্যমে কর্মসংস্থান

এই সমবায়গুলি কি যুব প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণ করতে পারছে?

দীপককুমার মৃধা:  সমবায় আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষত কৃষি সমবায়— যেগুলি কফি, তামাক, কাজুবাদাম, তুলা, দুধ, মধু, মৎস্য ইত্যাদি অর্থকরী কৃষিজ পণ্যের সঙ্গে যুক্ত— সেগুলি বহু বছর ধরে উৎপাদকদের স্বার্থরক্ষা, বাজার সম্প্রসারণ এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে— এই সমবায়গুলি কি যুব প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণ করতে পারছে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী কৃষি সমবায় এখনও মূলত উৎপাদন ও প্রাথমিক বিপণনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে।

সমবায়ের কার্যক্রমে বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিদ্যমান সমবায় কাঠামো মূলত বয়স্ক সদস্যদের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, যার ফলে যুবকদের জন্য সমবায় কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। যুবকদের প্রতি সমবায়ের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি আজকের যুব সমাজ শুধুমাত্র কৃষিপণ্য উৎপাদনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না।

Advertisement

তারা প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, বিপণন, ব্র্যান্ডিং এবং বহুমুখী উপার্জনকারী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী। কিন্তু অধিকাংশ কৃষি সমবায়ে এখনও একফসলি উৎপাদন ও একমাত্রিক ব্যবসা মডেলই প্রচলিত। এর ফলে যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যুবকেরা সমবায়ের বিভিন্ন কার্যকলাপে যুক্ত হতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা প্রযুক্তিগত সমর্থন না পাওয়ায় তারা সমবায়ের বাইরে গিয়ে নিজেদের উদ্যোগে কাজ শুরু করে। এর ফলস্বরূপ সমবায়ে যুব সদস্যপদ হ্রাস পাচ্ছে এবং যুবকদের অংশগ্রহণ ও দায়বদ্ধতাও কমে যাচ্ছে।

Advertisement

সমবায়গুলির আরেকটি বড় সমস্যা হল আর্থিক মূলধনের ঘাটতি। শুধুমাত্র কৃষি সমবায় নয়, আবাসন সমবায়, শিল্প সমবায় কিংবা পরিবহণ সমবায়—সব ক্ষেত্রেই মূলধনের সীমাবদ্ধতা একটি গুরুতর অন্তরায়। এই সীমাবদ্ধতার কারণে সমবায়গুলি যুবকদের কর্মী বা কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান করতে পারছে না কিংবা ভর্তুকি-সহ উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ করতে পারছে না। এছাড়া উদ্ভাবনী নেতৃত্বের অভাব সমবায়গুলিকে দীর্ঘদিন ধরে পরনির্ভরশীল করে রেখেছে।

মান সংযোজন, পণ্যের বৈচিত্র্য ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না হওয়ায় সমবায়ের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে না, ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও সীমিত থাকছে। সংক্ষিপ্ত মানশৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থানের সীমাঅধিকাংশ কৃষি সমবায়ের মানশৃঙ্খলা (Value Chain) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সাধারণত কাঁচামাল সংগ্রহ, আংশিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহণ ও বিক্রয়—এই কয়েকটি ধাপেই সমবায়ের কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়।

ফলে যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। যদি সমবায়গুলি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, প্যাকেজিং ইউনিট, ব্র্যান্ডিং ও সরাসরি বিপণনের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি তুলা সমবায় যদি তন্তু উৎপাদন, বস্ত্র প্রস্তুতকরণ, ভোজ্যতেল আহরণ ও পশুখাদ্য উৎপাদনের মতো বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তা বিপুল সংখ্যক যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

একইভাবে কফি, তামাক, মধু, দুধ ও মৎস্যজাত পণ্যকে সমাপ্ত পণ্যে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে সমবায়ের আয় ও কর্মসংস্থান উভয়ই বাড়ানো সম্ভব। নীতিগত দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে সমবায় আন্দোলনে যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সুসংহত ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তানজানিয়ার ২০০২ সালের সমবায় নীতি কিংবা ২০১৩ সালের নতুন সমবায় আইন— কোনোটিতেই সমবায়ের মাধ্যমে যুব উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অধিকাংশ সমবায়ের বিধিতেও যুবকদের ভূমিকা ও অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশ নেই।

ভারতের ক্ষেত্রেও চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়। যদিও ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩৫০০-র বেশি নতুন সমবায়, বিশেষত মহিলা সমবায়, গঠিত হয়েছে৷ তবুও বাস্তবে সমবায়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। প্রায় ৪০০০ সমবায়ে অন্তত ১৬,০০০ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একজনকেও স্থায়ী সমবায় কর্মী হিসেবে নিয়োগ না করা— নিশ্চয়ই সমবায় আন্দোলনের মূল দর্শনের পরিপন্থী।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন— ১. সংস্থাগত সংস্কার: সমবায়ের ভেতরে প্রচলিত মানসিকতা ও কাঠামোগত জড়তা ভাঙতে হবে। যুব ও বয়স্ক সদস্যদের সমান গুরুত্ব দিয়ে সমবায়কে আধুনিক, বাজারমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।২. ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে মান সংযোজন, প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবসায়িক বৈচিত্র্যের দিকে অগ্রসর হতে হবে। ৩. জাতীয় ও রাজ্য সমবায় আইনে যুবকল্যাণ ও যুব প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত স্পষ্ট ধারা সংযোজন করা জরুরি। ৪. যুবকদের জন্য ঋণ, জমি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ৫. প্রযুক্তি উন্নয়ন, নতুন ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমবায়ের মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে।

সমবায়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান বেকারত্বের যুগে এক অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পথ। সরকারি সদিচ্ছা, নীতিগত সংস্কার ও সমবায়ের অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের মাধ্যমে যদি কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশও সমবায়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা যায়, তাহলেই লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী স্বনির্ভর হতে পারবে। সমবায় আন্দোলনের মধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করার এক বিরাট সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।

ভারতবর্ষে ও ব‍্যাপকহারে বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। সরকারী কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা তথা মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারের হাতে দেশের যাবতীয় কর্মসংস্থানের দায়িত্ব মজুত থাকবার ফলে দরিদ্র মানুষজনকে শোষণ করবার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের চালচিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানকার চাষী ও শ্রমিকদের আর্থিক অবস্থা অন‍্য রাজ‍্যের তুলনায় কিছুটা ভালো। তবে এই রাজ‍্যেও সমবায়ের মাধ‍্যমে কর্মসংস্থানের কাজ অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে।

গত ২০১৫ থেকে ২০১৯-এর মধ‍্যে এই রাজ‍্যে ৩৫০০ বা আরও অধিক সমবায় সমিতি নতুনভাবে গঠিত হলেও (মহিলা সমবায় সমিতি) সমবায়ের মাধ‍্যমে তেমনভাবে কর্মীনিয়োগ হতে দেখা যায়নি। ৪০০০ সমবায় সমিতিতে কমপক্ষে ১৬,০০০ কর্মীনিয়োগের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একজনকেও নিয়োগ করা হয়নি সমবায় কর্মী হিসাবে। ব‍্যাপারটি নিশ্চয়ই সমবায়ের মাধ‍্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। তাই সরকারি পদক্ষেপসমূহ ঋণাত্মক না হয়ে ধনাত্মক হলে বেকার যুবক-যুবতীদের এই রাজ‍্যের পক্ষে মঙ্গলজনক ব‍্যাপার হত, কিন্তু তা হয়নি। পরিশেষে এটুকু না বললে নয়, তা হল সমবায়ের মাধ‍্যমে কর্মসংস্থানের মত এত ভালো উদ‍্যোগ সারা রাজ‍্যে বা দেশে পাওয়া কষ্টকর।

তাই সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ‍্যমে যদি প্রয়োজনও হয় সরকারি তরফ হতে বিভিন্ন সমবায়ের উপবিধির সংশোধনের মাধ‍্যমে দেশের কর্মসংস্থানের কমপক্ষে ৫%-এর মত কর্মীনিয়োগ সম্ভব হলেও দেশের বা রাজ‍্যের বেশ কিছু মানুষ স্ব-কর্মসংস্থানের মাধ‍্যমে স্বনির্ভর হতে পারতো বা পারবে। দেশ ও জাতির উন্নয়নে সমবায় সমিতিসমূহে কর্মসংস্থানের যে প্রশস্ত পথ খোলা আছে, তা কাজে লাগালে এদেশের অর্থনৈতিক বনিয়াদ যে অনেকখানি শক্তপোক্ত ও মজবুত হতে পারতো, এ কথা বলা বোধ করি অমূলক হবে না। তাই আমাদের লক্ষ‍্য হওয়া উচিত যত বেশি সম্ভব সমবায়ের মাধ‍্যমে এই চরম বেকারত্বের যুগে কর্মসংস্থানের দ্বারা আশার আলোর পথ দেখানো।

Advertisement