• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 5 July, 2026

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এক জাতীয় চেতনার পুনরাবিষ্কার

৬ জুলাই— ভারতীয় রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনেই ১৯০১ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এক জাতীয় চেতনার পুনরাবিষ্কার

৬ জুলাই— ভারতীয় রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনেই ১৯০১ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, সংসদীয় গণতন্ত্রের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং এক বিতর্কিত অথচ প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী চিন্তার ধারক। তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাজনৈতিক চিন্তার বিবর্তনকে নতুন করে বিশ্লেষণ করা।
কলকাতার এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্ম শ্যামাপ্রসাদের। তাঁর পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত উপাচার্য। মায়ের ধর্মনিষ্ঠা এবং পিতার বিদ্যাবুদ্ধির সংমিশ্রণে শ্যামাপ্রসাদের শৈশব গড়ে ওঠে এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। অল্প বয়স থেকেই তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন— প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন কৃতিত্বের সঙ্গে।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর আমলেই প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলায় ভাষণ দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর— যা শিক্ষাক্ষেত্রে ভারতীয় ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই সময়েই তিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও জাতীয় চেতনায় সমৃদ্ধ করার প্রয়াস নেন।
কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের জীবন কেবল শিক্ষাক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯২৯ সালে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দ্রুতই এক দৃঢ় মতাদর্শসম্পন্ন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে এর সর্বভারতীয় সভাপতি হন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল স্পষ্ট— ভারতের ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করা। তবে এই অবস্থান তাঁকে সমর্থন যেমন দিয়েছে, তেমনি বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
স্বাধীনতার আগে বাংলার রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪১-৪২ সালে তিনি বাংলার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে ত্রাণকার্যে সক্রিয় ভূমিকা নেন। একইসঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের নীতির সমালোচনাও করেন।
ভারত বিভাজনের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল জটিল ও বহুমাত্রিক। একদিকে তিনি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দেশভাগের বিরোধিতা করেছিলেন, অন্যদিকে বাংলার হিন্দু অধ্যুষিত অংশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই বাংলার বিভাজনের দাবি জোরদার হয়—যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়। এই ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে, যদিও তা নিয়ে মতভেদ আজও বিদ্যমান।
স্বাধীনতার পর ড. মুখোপাধ্যায় জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। এই সময় তিনি দেশের শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন— ত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ কারখানা, সিন্ড্রি সার কারখানা প্রভৃতি প্রকল্প তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে। কিন্তু খুব শিগগিরই নেহরু সরকারের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে, বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু শরণার্থীদের অবস্থা এবং নেহরু-লিয়াকত চুক্তি নিয়ে।
১৯৫০ সালে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এর পর ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসংঘ— যা পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দল গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি একটি বিকল্প জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন, যা পরবর্তী কয়েক দশকে ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
সংসদে তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। যুক্তি, ভাষা ও তথ্যনির্ভর বক্তব্যের জন্য তিনি দ্রুতই ‘সংসদের সিংহ’ নামে পরিচিত হন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি সরকারকে কঠোরভাবে প্রশ্ন করতেন, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখতেন— যা আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে এক বিরল উদাহরণ।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় জুড়ে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল প্রবল। তাঁর বিখ্যাত উক্তি— ‘এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধানমন্ত্রী, দুই নিশান চলবে না’— আজও রাজনৈতিক আলোচনায় উদ্ধৃত হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি অনুমতি ছাড়াই জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দিদশায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং ২৩ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যু আজও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সরকারি- ভাবে হৃদরোগে মৃত্যুর কথা বলা হলেও, তাঁর পরিবার এবং বহু সমর্থক নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু সেই তদন্ত কখনও হয়নি। ফলে তাঁর মৃত্যু ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে— তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে এবং থাকবেও। তিনি একদিকে শিক্ষাবিদ ও প্রশাসক হিসেবে আধুনিক ভারতের ভিত্তি নির্মাণে অবদান রেখেছেন, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ অনেকের কাছে বিতর্কিত। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি ছিলেন এক দৃঢ়চেতা, স্পষ্টভাষী এবং লক্ষ্যনিষ্ঠ নেতা।
আজ, তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে, আমাদের প্রয়োজন তাঁকে কেবল একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে, সমগ্রতা দিয়ে মূল্যায়ন করা। তাঁর অবদান যেমন স্মরণীয়, তেমনি তাঁর সীমাবদ্ধতাও ইতিহাসের অংশ। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই— বহুমতের মধ্যেও ইতিহাসকে বিচার করার স্বাধীনতা।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর, অনেকেই মনে করেন তাঁর দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে। এই ঘটনাকে অনেকে তাঁর স্বপ্নপূরণ হিসেবে দেখেন। তবে ইতিহাসের মূল্যায়ন সবসময়ই বহুমাত্রিক— এবং সেই আলোচনাই আমাদের গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করে।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের বিশ্বাসের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়— রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, বরং আদর্শ, মতাদর্শ এবং দায়িত্ববোধের এক কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্র।
তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়— তিনি ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, যাকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও তাঁর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে— কারণ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ই আমাদের বর্তমানকে বুঝতে সাহায্য করে।
৬ জুলাইয়ের এই দিনে, তাঁকে স্মরণ করা মানে ভারতের রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে পুনরায় পাঠ করা।