ভারতে পণের প্রথা বহু পুরনো, বহুবার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অসংখ্য প্রচার হয়েছে, তবু বাস্তবের ছবিটি ভীষণ অস্বস্তিকর। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা যতই উন্নতির কথা বলি না কেন, সমাজের গভীরে এই নিষ্ঠুর প্রথা এখনও বেঁচে আছে। মধ্যপ্রদেশের এক তরুণীর রহস্যমৃত্যু নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত শুনানি সেই অস্বস্তিকেই সামনে এনে দিয়েছে। একই সময়ে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের আরও কয়েকটি ঘটনা, আর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬টি পণ-জনিত মৃত্যুর পরিসংখ্যান— সব মিলিয়ে একটাই সত্য সামনে আসে যে, নারীর নিরাপত্তা এখনও বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, মেয়েরা আজ শিক্ষিত হচ্ছে, চাকরি করছে, আর্থিকভাবে স্বাধীন হচ্ছে— তাই তাদের অবস্থাও নিশ্চয়ই অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব বলছে, এই অগ্রগতির কোনোটাই তাদের পণের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে পারছে না। উচ্চশিক্ষা, ভালো চাকরি, সামাজিক মর্যাদা— সবকিছুই মুছে যায় যখন বিবাহ নামের সামাজিক চুক্তির মধ্যে একজন নারীকে ‘লেনদেনের বস্তু’ হিসেবে দেখা হয়। পণের দাবিতে মানসিক নির্যাতন, অপমান, চাপ, এমনকি শারীরিক অত্যাচার— সবই এখনও ঘটছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তার শেষ পরিণতি মৃত্যু।
Advertisement
এই সমস্যার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি শুধু তথাকথিত ‘অশিক্ষিত’ বা ‘গ্রামীণ’ সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। শহর, শিক্ষিত পরিবার, এমনকি প্রেমের বিয়েতেও পণের দাবি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয়— ‘বিয়ের পর সবকিছু মানিয়ে নিতে হবে।’ এই ‘অ্যাডজাস্ট’ করার শিক্ষা অনেক সময় তাদের জীবন বিপন্ন করে তোলে। অত্যাচার সহ্য করাকে গুণ হিসেবে দেখানো হয়, প্রতিবাদ করাকে নয়। সম্প্রতি ত্বিশার মৃত্যু এই অপ্রিয় সত্যটিকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।
Advertisement
প্রশ্ন উঠছে— যখন কোনও মেয়ে তার পরিবারের কাছে ভয় বা বিপদের কথা জানায়, তখন বাবা-মা কী করেন? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না, বা পরিবারের মান-সম্মানের কথা ভেবে মেয়েকে আবার শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এই নীরবতা, এই উদাসীনতা এক ধরনের সহিংসতারই অংশ। একজন মেয়ে যখন সাহায্য চায়, তখন যদি তার নিজের পরিবারই তাকে ফিরিয়ে দেয়, তবে সে কোথায় যাবে?
সরকার ও সমাজ প্রায়ই মেয়েদের শিক্ষা ও সাফল্যের কথা তুলে ধরে গর্ব করে। কিন্তু সেই মেয়ের নিরাপত্তা যদি তার নিজের ঘরের মধ্যেই না থাকে, তবে সেই গর্বের মূল্য কতটা? পণ আইনত অপরাধ হলেও, বাস্তবে তা অনেকাংশে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যে এর প্রকোপ বেশি হলেও, ধীরে ধীরে এটি সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। পণ-সংক্রান্ত নির্যাতনের অভিযোগ বাড়ছে, যা একদিকে সচেতনতার ইঙ্গিত দিলেও, অন্যদিকে সমস্যার গভীরতাও তুলে ধরে। বহু ক্ষেত্রে নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে আসে কেবল মৃত্যুর পর। অর্থাৎ একজন নারী তার জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার পান না। মামলার চার্জশিট জমা পড়লেও, আদালতে দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রমাণের অভাবে বহু অভিযুক্ত ছাড়া পেয়ে যায়। পণ-জনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার কম, বরং খালাস পাওয়ার সংখ্যাই বেশি। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের অভাব তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় যেমন ‘বউ পুড়িয়ে মারা’ ছিল, এখন তেমনই ‘আত্মহত্যা’কে সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু এই আত্মহত্যার পেছনে যে নির্যাতন, মানসিক চাপ ও প্ররোচনা কাজ করে, তা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে আইনের ফাঁক গলে অনেক অপরাধী বেরিয়ে যাচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— একজন বউমা যদি তাঁর শ্বশুরবাড়িতে নিজেকে অসুরক্ষিত মনে করেন, তবে তিনি কেন সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না? এর উত্তর শুধু আইনের মধ্যে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক চাপ, আর্থিক নির্ভরতা, পরিবারের মানসিকতা এবং প্রশাসনের ভূমিকা।
অনেক সময় পুলিশ অভিযোগ নিতে চায় না বা বিষয়টিকে ‘পারিবারিক সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যায়। অতএব, পণপ্রথা রোধ করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের মানসিকতা বদলানো জরুরি। মেয়েদের ‘সহ্য করা’র শিক্ষা নয়, ‘প্রতিবাদ করার’ সাহস দিতে হবে। পরিবারকেও বুঝতে হবে, মেয়ের জীবন কোনও সামাজিক সম্মানের চেয়ে বড়।নারীর নিরাপত্তা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, যদি সেই নিরাপত্তা তার নিজের বাড়ির ভিতরেই নিশ্চিত না হয়, তবে সব উন্নতির দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে। পণপ্রথা শুধু একটি সামাজিক কুপ্রথা নয়, এটি নারীর জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদগুলির একটি। এই সত্য স্বীকার করে এখনই কঠোর ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
Advertisement



