• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 8 June, 2026

সংস্কারের গতি

ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে সংস্কারের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর আবার জোর দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করে তুলতে সংস্কারের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর আবার জোর দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন করে গতি আনতে হবে সংস্কার প্রক্রিয়ায়। এই বার্তা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, জ্বালানি বাজারের ওঠানামা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ— সব মিলিয়ে এক কঠিন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে এখনও স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে চলেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ ত্রৈমাসিকে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ— যা বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার খেলা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির দৃঢ়তার প্রমাণ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর ‘ইজ অফ লিভিং’ এবং ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’-এর উপর জোর দেওয়া যথার্থ। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করা— এই দুই লক্ষ্য একে অপরের পরিপূরক। যখন ব্যবসা সহজ হয়, বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়; আর তার ফলেই সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। গত কয়েক বছরে এই দুই ক্ষেত্রেই যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সরকারের বিভিন্ন তথ্যও এই ইতিবাচক প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। অটোমোবাইল থেকে সিমেন্ট শিল্প, জিএসটি সংগ্রহ থেকে ই-ওয়ে বিল—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্রমাগত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনকি গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প মনরেগা-তে কাজের চাহিদা হ্রাস পাওয়াও এক অর্থে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ, কারণ এটি নির্দেশ করে যে মানুষ অন্যত্র কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন।
একই সঙ্গে ভোক্তা চাহিদার ক্ষেত্রেও আশাব্যঞ্জক চিত্র সামনে এসেছে। কিছু সংস্থা আগে থেকেই চাহিদা কমার আশঙ্কায় পণ্যের আকার ছোট করেছিল, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনও শক্তিশালী এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে সবকিছুই যে নির্ভার, তা নয়। সম্ভাব্য দুর্বল বর্ষা এবং তার ফলে কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব— এই বিষয়গুলি নিয়ে সরকার যথেষ্ট সতর্ক। কারণ, কৃষি খাতের ওপর দেশের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল। বর্ষা কম হলে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধির ওপর। এই কারণেই সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উভয়েই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এই সমগ্র পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট— সংস্কারের গতি থামানো যাবে না, বরং আরও বাড়াতে হবে। ‘রিফর্ম এক্সপ্রেস’-এর ধারণা শুধু একটি রূপক নয়, এটি একটি কর্মপরিকল্পনা। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো— এই সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক উন্নতি অপরিহার্য।
ভারতের সামনে এখন এক বড় সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও যদি দেশ নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে আগামী দিনে আরও বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সরকার, শিল্পক্ষেত্র এবং সাধারণ নাগরিক— সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই বার্তা সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ কখনোই সহজ নয়, কিন্তু সঠিক দিশা ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে সেই পথ সুগম করা সম্ভব। সংস্কারের গতি বজায় রেখে এবং মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার লক্ষ্যে এগিয়ে গেলে ভারত যে আরও উচ্চতায় পৌঁছবে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।