• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 23 June, 2026

উন্নয়নের বাজেট

পশ্চিমবঙ্গের বাজেটকে একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক নথি হিসেবে দেখা যেতে পারে। রাজ্যের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বাজেটকে নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক নথি হিসেবে দেখা যেতে পারে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি শুধু কিছু ঘোষণা নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেছে। কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগ— এই চারটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে যে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, তা রাজ্যের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপগুলির মধ্যে অন্যতম হল ডিএ বৃদ্ধি। ১৮ শতাংশ থেকে এক ধাক্কায় ৩৮ শতাংশে উন্নীত করা শুধুমাত্র একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের প্রতিফলন। এই পদক্ষেপ লক্ষাধিক কর্মী ও পেনশনভোগীর হাতে অতিরিক্ত অর্থ পৌঁছে দেবে, যা সরাসরি বাজারে চাহিদা বাড়াবে এবং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। উৎসবের মরশুমের আগে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় তার ইতিবাচক প্রভাব আরও বেশি করে অনুভূত হবে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই বাজেট এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ, ৫০ হাজার শিক্ষক-অধ্যাপক এবং ২০ হাজার পুলিশ নিয়োগ— সব মিলিয়ে প্রায় ১.৭ লক্ষ চাকরির সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সাহসী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বিশেষ করে ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা শুধু কর্মসংস্থানই নয়, সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগ রাজ্যের যুবসমাজের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করবে।
একই সঙ্গে ‘ভরসা কর্মসূচি’ চালুর ঘোষণা সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাসিক ভাতা দেওয়া তাদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এটি শুধু একটি সহায়তা প্রকল্প নয়, বরং একটি সেতুবন্ধন— যেখানে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা যুবসমাজ সাময়িক স্বস্তি পাবে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিপুল বরাদ্দ এই বাজেটের অন্যতম শক্তি। নারী ও শিশু  দপ্তরের জন্য ৫২,৩০৮ কোটি টাকা এবং ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য ৩৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ— এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে সরকার সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে চায়। প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে সহায়তা পাওয়া বহু পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাবে এবং বিশেষ করে মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়াবে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাজেটটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পরিচয় দিয়েছে। কল্যাণীর কাছে নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর, উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে বিমান পরিষেবা সম্প্রসারণ এবং একাধিক সড়ক ও সেতু প্রকল্প— এসবই রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করে তুলবে। এর ফলে শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়বে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আইআইটি, আইআইএম ও এআইআইএমএস স্থাপনের পরিকল্পনা রাজ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও মেধাবৃত্তি চালুর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও বাজেটটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। পুলিশে ব্যাপক নিয়োগ, মহিলা থানা ও নারী সহায়তা ডেস্ক এবং মহিলা ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা— সবই নিরাপদ সমাজ গঠনের দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর সঙ্গে ‘অ্যান্টি-সিন্ডিকেট’ আইন আনার ঘোষণা ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করে তুলতে পারে।
মহিলাদের ক্ষমতায়ন এই বাজেটের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। চাকরিতে সংরক্ষণ, অন্নপূর্ণা যোজনা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং ক্লাউড কিচেন পলিসি— সব মিলিয়ে মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার একটি সুসংহত পরিকল্পনা দেখা যায়। এই উদ্যোগগুলি বাস্তবায়িত হলে সমাজে মহিলাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে, প্রায় ৪.৩৮ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী নথি। এতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন— দুই দিকই সমান গুরুত্ব পেয়েছে। ঋণের বোঝা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া সরকারের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির প্রমাণ।
এই বাজেট শুধু বর্তমানের সমস্যার সমাধান নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকেও দৃষ্টি দিয়েছে। কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিকাঠামোর উপর ভর করে ‘বিকশিত বাংলা’র যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ পেলে পশ্চিমবঙ্গ নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।
অতএব, এই বাজেটকে নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক, সাহসী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়।