রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু সংক্রান্ত বার্ষিক সম্মেলন সাধারণত প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনকে বলে কপ বা কনফারেন্স অফ পার্টিজ। পরবর্তী বার্ষিক সম্মেলন কপ-৩১ হবে আগামী নভেম্বরের ৯ থেকে ২০ তারিখ তুরস্কের আন্তলিয়ায়। গতবছর ব্রাজিলের বেলেম-এ হয়েছে কপ-৩০। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রস্তুতি ও অঙ্গীকারকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্য নিয়ে রাষ্ট্রসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন বা ইউএনএফসিসি-র ৬৪তম সহায়ক সংস্থা বা সাবসিডিয়ারি বডি-র ৬৪ তম অধিবেশন (এস বি-৬৪) সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হল জার্মানির বন শহরে।
দু-সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকারি প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বনের এই এসবি-৬৪-র বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।তবে পরবর্তী কপের প্রস্তুতির প্রথাগত আলোচনার বাইরেও বন-এ এবার কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক এবং দড়ি টানাটানি হয়েছে। দড়ি টানাটানিটা মূলত হয় উন্নত এবং উন্নতিশীল দেশগুলির মধ্যে। বিশেষত উন্নত দেশগুলি কিছুতেই তাদের দেয় অর্থ দিতে চাইছে না।
চাইছে আগের বেলাম সম্মেলনে গৃহীত অর্থ বরাদ্দের পরিমান যাতে না কমে। ইউনাইটেড নেশন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ বা ইউএনএফসিসি-র কার্যনির্বাহী অধিকর্তা সাইমন স্টিল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে আগের বৈঠকের গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকে কেন উন্নত দেশগুলি পেছিয়ে আসছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা জায় বিগত প্রায় সব বৈঠকেই সারা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলের জন্য বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলি যে দায়ী, অর্থাৎ তাদের অবিবেচিত শিল্পোন্নয়নের জন্য সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত যে ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তার জন্য অবশ্যই উন্নত দেশগুলিএখন তাদের নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দেবে উন্নতিশীল দেশগুলিকে।
সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে ছিল জলবায়ু অভিযোজন বা এডাপ্টেশন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস, জলবায়ু দূষণ রোধ করার জন্য অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ, পরিভাষায় যাকে বলা হয় লস অ্যান্ড ড্যামেজ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি। অংশগ্রহণকারী দেশগুলি স্বীকার করেছে যে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা এবং দাবানলের মতো ঘটনাগুলি আরও ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে। ফলে শুধু গ্রিন গ্যাসের ভবিষ্যৎ নির্গমন কমানোর পরিকল্পনা নয়, বর্তমান ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার বাস্তব পদক্ষেপও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বন-এর সাম্প্রতিক ষান্মাসিক সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হলো বিশ্বব্যাপী অভিযোজন লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ গ্লোবাল গোল অন এডাপ্টেশন এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশকিছু অগ্রগতি। উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলি দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল যে অভিযোজনমূলক কর্মকাণ্ডের সাফল্য পরিমাপের জন্য স্পষ্ট সূচক ও মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োজন। বন সম্মেলনে এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরির দিকে দেশগুলি অগ্রসর হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে অভিযোজন প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়নে সহায়ক হবে।বন এর সম্মেলনে জলবায়ু দূষণ রোধের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশগুলি অভিযোগ করে যে উন্নত দেশগুলির বহু প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত মাত্রায় দিচ্ছে না। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিরা বিশেষভাবে জোর দেন যে অভিযোজন ও পুনর্গঠনের জন্য সহজলভ্য এবং অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলির মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তারা খুব কম দায়ী হলেও তার সবচেয়ে ভয়াবহ কুফল তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। গত কয়েক বছরে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির জন্য এই তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বন সম্মেলনে সদস্য দেশগুলি তহবিলের অর্থ সংগ্রহ, পরিচালনা এবং দ্রুত বিতরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করে। যদিও এ বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্য অর্জিত হয়নি, তবুও আলোচনার অগ্রগতি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি তৈরি করেছে। এবারের সম্মেলনে প্রতিটি দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত বরাদ্দ বা ন্যাশনালি ডিটারমিন্ড কন্ট্রিবিউশন বা এনডিসি-র বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি দেশকে তাদের নির্গমন হ্রাসের পরিকল্পনা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হয়। এই সম্মেলনে দেশগুলিকে আরও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে বর্তমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।ভারত-সহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ এই সম্মেলনে জলবায়ু সংক্রান্ত ন্যায়বিচার বা ক্লাইমেট জাস্টিস-এর প্রশ্নকে জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে। তাদের বক্তব্য, ঐতিহাসিকভাবে শিল্পোন্নত দেশগুলিই অধিকাংশ কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী; ফলে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও তাদের অধিক দায়িত্ব নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলির সুস্থায়ী উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই এসবি-৬৪ সম্মেলন কোনও বড় রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্মেলন না হলেও এটি বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখানে গৃহীত আলোচনা, সুপারিশ এবং খসড়া সিদ্ধান্তগুলি আগামী কপ-৩১ সম্মেলনের আলোচ্যসূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বন সম্মেলন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের সামনে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।




