• facebook
  • twitter
Wednesday, 1 April, 2026

সমাজমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ

একতরফাভাবে কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা বাড়ানো, বা ব্যবহারকারীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা— এই পথটি শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

ভারতে ডিজিটাল পরিসর গত এক দশকে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের বাইরেও সাধারণ মানুষ, সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারী ও তথাকথিত ‘ইনফ্লুয়েন্সার’-রা আজ খবর, মতামত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত তথ্যপ্রযুক্তি বিধির সংশোধন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক সম্প্রতি যে খসড়া সংশোধনী প্রস্তাব করেছে, তার মূল লক্ষ্য— সমাজমাধ্যমে খবর বা সাম্প্রতিক বিষয়বস্তু প্রকাশকারীদের ওপর আরও কঠোর দায়বদ্ধতা আরোপ করা। অর্থাৎ, যাঁরা আনুষ্ঠানিক সংবাদ প্রকাশক নন, কিন্তু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার) বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে খবর বা বিশ্লেষণমূলক কনটেন্ট শেয়ার করেন, তাঁদেরও সংবাদমাধ্যমের মতো নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি– ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা অপপ্রচার রুখতে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার। খসড়া সংশোধনীতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম (বিশেষত ১৪, ১৫ ও ১৬) এখন এইসব ‘নন-পাবলিশার’ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এর ফলে একটি আন্তঃবিভাগীয় কমিটি (আইডিসি) প্রয়োজনে তদন্ত করতে পারবে এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রককে কনটেন্ট ব্লক বা পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেবে।
প্রথম নজরে এই উদ্যোগকে তথ্যের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বিপদের দিকটি উপেক্ষা করা কঠিন। কারণ, এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, এই নিয়ন্ত্রণের সীমা কোথায়? এবং তা কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে না?
ডিজিটাল অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এই সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার কার্যত এমন একটি ক্ষমতা অর্জন করতে চাইছে, যা পূর্বে আদালতের পর্যবেক্ষণে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। বিশেষত, ব্যবহারকারীর তৈরি করা কনটেন্ট, যা আগে তুলনামূলকভাবে মুক্ত ছিল, তা এখন সরাসরি সরকারি নজরদারির আওতায় চলে আসবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মতামত জানানোর জন্য মাত্র ১৫ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বলে সমালোচনা উঠেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনমত গ্রহণ যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব কাজ করছে— একদিকে ভুয়ো খবর ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেই ভারসাম্যের অভাব স্পষ্ট। কারণ, ‘খবর’ বা ‘কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স’ কনটেন্টের সংজ্ঞা যথেষ্ট বিস্তৃত। ফলে, ব্যঙ্গ, কৌতুক বা রাজনৈতিক সমালোচনাও সহজেই নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে আসতে পারে।
বর্তমান সময়ে সমাজমাধ্যম শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়– এটি রাজনৈতিক আলোচনা, সামাজিক প্রতিবাদ এবং বিকল্প মতামতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এই মঞ্চ যদি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ে, তবে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অবশ্যই, দায়িত্বজ্ঞানহীন কনটেন্ট বা ভুয়ো খবরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং বিচারযোগ্য। একতরফাভাবে কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা বাড়ানো, বা ব্যবহারকারীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা— এই পথটি শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ডিজিটাল ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ভারসাম্যের উপর— নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার মধ্যে সঠিক সমন্বয়। সরকার যদি সত্যিই একটি সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, তবে তাকে নাগরিকদের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর সেই আস্থা তৈরি হয় স্বচ্ছতা, সংলাপ ও সংবেদনশীলতার মাধ্যমে— শুধু কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়।

Advertisement

Advertisement