ভারত ও চিনের সম্পর্কের উন্নতির জন্য এবারের শরৎকালকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিকস গোষ্ঠীর নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উচ্চপর্যায়ের সফরে দিল্লি এসেছিলেন। কিন্তু তার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ল, অরুণাচল প্রদেশের তক্ষিং সার্কেলে ভারতীয় ও চিনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
গত বৃহস্পতিবার এই ঘটনাগুলি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ওই দিন ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপির ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ কাপুর এই সংঘাতের কথা জানান। তবে এর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা চিনা অনুপ্রবেশের খবর দিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলে চিনের অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়েছে।
চিনের সীমান্ত নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্য সংবাদ সংস্থা ইউএনআই-কে বলেন, ‘‘পূর্ব হিমালয়ে চিন বেশ কিছুদিন ধরেই যে কৌশলকে ‘স্যালামি স্লাইসিং’ বলা হয়, তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, একবারে বড় কোনও পদক্ষেপ না করে ধীরে ধীরে ছোট ছোট এলাকা দখল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
“চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ বর্তমানে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। চিনা নৌবাহিনী তাইওয়ানকে হুমকি দিচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত টহল দিচ্ছে। অন্যদিকে, চিনা সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক জেনারেলের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানও চালানো হয়েছে। চিনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই পরিস্থিতিতে অরুণাচল সীমান্তে সক্রিয়তা দেখানো তাদের কাছে নিজেদের সামরিক দক্ষতা প্রমাণ করার একটা উপায় হতে পারে।”
১৯৬২ সালের সীমান্তযুদ্ধে চিন অরুণাচল ও লাদাখের কিছু অঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চিনা বাহিনী উল্লেখযোগ্য কোনও সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ১৯৬৭ সালে সিকিমের নাথু লা গিরিপথে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে চিনা বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছিল। একইভাবে, ১৯৮৬ সালে অরুণাচল প্রদেশের সমদোরং চু উপত্যকা দখল করে চিনা সেনারা অবস্থান নিলেও পরে তাদের পিছিয়ে যেতে হয়।
সোমবার চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন দাবি করেন, চিন বরাবরই ভারত-চিনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলি মেনে চলেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তে চিনা সেনাদের কার্যকলাপ আসলে নিয়মিত টহলদারির অংশ। এর উদ্দেশ্য হল, চিনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্যের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাঁর কথায়, ‘ভারত ও চিনের সেনাদের মধ্যে একটি সমঝোতা রয়েছে যে সীমান্তে গুলি চালানো যাবে না। চিন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আক্রমণাত্মক টহলদারি চালাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে ওই এলাকাগুলির ওপর নিজেদের দাবির পক্ষে অবস্থান তৈরি করা যায়।’ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সূত্রের বক্তব্য, এ ধরনের মুখোমুখি সংঘাত নতুন কিছু নয় এবং অদূর ভবিষ্যতে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও চিন বহু দফা আলোচনা করেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি-র সম্পূর্ণ সীমারেখা নিয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। ফলে সীমান্তের কোথায় প্রকৃত বিভাজনরেখা রয়েছে, তা নিয়ে দুই দেশের সেনাবাহিনীর ধারণা ও ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য থেকে গিয়েছে। আর এই মতপার্থক্যের কারণেই বারবার সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার আসাফিলা ও লংজু অঞ্চলের কাছে ভারতীয় ও চিনা সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই খবরগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলিও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সম্পর্কে দুই দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যারই প্রতিফলন হতে পারে।
তাঁরা আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তার ভিত্তিতে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে চিনা সেনারা অরুণাচল প্রদেশের মধ্যে ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও এলাকা দখল করে নিয়েছে। একজন শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, ‘যে কোনও সম্ভাব্য পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য সেনাবাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হয়। আমরাও সেই কাজ করি। ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, স্থলভিত্তিক নজরদারি, আকাশপথে পর্যবেক্ষণ এবং মহাকাশভিত্তিক তথ্যসূত্র ব্যবহার করে আমরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করি। এর ফলে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যায় এবং প্রয়োজন হলে সেই পদক্ষেপ কার্যকর হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়।’
চিন অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে দাবি করে। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের তৎকালীন সরকারের মধ্যে যে ম্যাকমোহন লাইনকে সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল, চিন ধারাবাহিকভাবে সেই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
অরুণাচলের সীমান্তবর্তী শহর তাওয়াংয়ের কাছাকাছি একটি গ্রামে ষষ্ঠ দলাই লামার জন্ম হয়েছিল। ১৯৫০ সালে চিন তিব্বল আক্রমণ করে দখল করার পর থেকে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি চিনের দৃষ্টিতে ওই অঞ্চলের গুরুত্বের সঙ্গে একটি বিশেষ প্রতীকী মাত্রা যুক্ত করেছে।
১৯৬২ সালের অক্টোবরে চিনা সেনাবাহিনী থাগলা রিজ ও বুমলা গিরিপথের আশপাশে ভারতীয় সেনাদের অবস্থানের ওপর প্রবল আক্রমণ চালিয়ে তাদের পরাস্ত করে। এরপর চিনা বাহিনী তাওয়াংয়ের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু হিমালয়ের গিরিপথগুলিতে শীতকালে তীব্র আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন সেনা মোতায়েন রাখা কঠিন হতে পারে বুঝতে পেরে, অগ্রসর হওয়ার পর চিনা বাহিনী দ্রুত পিছিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে, ১৯৮৬-৮৭ সালের সমদোরং চু সংঘাতের সময় চিনা সেনারা ওয়াংডুং নামের একটি তৃণভূমি দখল করে। ভারত ওই এলাকাকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করত। এর জবাবে দিল্লি দ্রুত সেখানে অতিরিক্ত সেনা পাঠায়। সেই সঙ্গে সদ্য কেনা বোফর্স কামানও মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে ভারত ও চিন আবার একটি বড় সামরিক সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই সংকট আর বড় সংঘাতে রূপ নেয়নি। বরং এর পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ তৈরি হয়। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঐতিহাসিক চিন সফরে যান। সেই সফরে চিনের নেতা দেং শিয়াওপিং এই বার্তা দিয়েছিলেন যে সীমান্তবিরোধ অমীমাংসিত থাকলেও ভারত ও চিন তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক শত্রুতা কাটিয়ে উঠে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও ভারত ও চিন— দুই দেশেরই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়ানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ১৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় একের পর এক যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগরের সামুদ্রিক পথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও দুই দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে ভারত ও চিন— উভয়েরই।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘চিনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতকে নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সীমান্ত পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করে যেতে হবে। গত দুই দশক ধরে ভারত সেই কাজ করে আসছে। আঞ্চলিক সংঘাত সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা অর্জন করতে হলে এই দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে৷’
দিল্লির উচিত, চিনের ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি ও আগ্রাসী আচরণের মূল্য বাড়িয়ে দিতে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কাজে লাগানো। একই সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখা প্রয়োজন।
কারণ, সীমান্ত সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে হলে ভারত ও চিন— দুই দেশকেই বুঝতে হবে যে অনির্দিষ্টকাল ধরে সংঘাত চালিয়ে যাওয়া কোনও দেশেরই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পক্ষে ভালো নয়। বরং পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সীমান্তবিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করাই দুই দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ।




