• facebook
  • twitter
Wednesday, 13 May, 2026

উপসাগরে কিস্তিমাত: নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও ভারতের গন্তব্য

এতদিন ইজরায়েল যখন খুশি যেখানে খুশি সামরিক আস্ফালন করতে পারত, কারণ তাদের পিছনে ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন ছিল।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সুদীপ ঘোষ

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন একটি কালখণ্ড খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে বিশ্বের একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনও রণাঙ্গনে এমন চূড়ান্ত ও সম্মানহানিকর পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সামরিক অভিধানে পরাজয় নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক লগ্নে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পার্ল হারবার বা ফিলিপিন্সে আমেরিকার বিপর্যয়, কিংবা পরবর্তীকালে ভিয়েতনামের গভীর জঙ্গল ও আফগানিস্তানের রুক্ষ পার্বত্য উপত্যকায় তাদের চরম ব্যর্থতার কথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেইসব বিপর্যয় সাময়িক বা ভৌগোলিক দিক থেকে প্রান্তিক ছিল। ওই ক্ষতিগুলো বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার সামগ্রিক আধিপত্যকে সমূলে উৎপাটন করতে পারেনি। ইরাক যুদ্ধের প্রাথমিক ভুলগুলোও তারা রণকৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে এমনভাবে সামলে নিয়েছিল, যাতে গোটা পশ্চিম এশিয়ায় তাদের দাদাগিরি অক্ষুণ্ণ থাকে।

Advertisement

কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ওয়াশিংটনের যে নজিরবিহীন পিছু হটা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করল, তার চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ক্ষতি অপূরণীয় এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এই পরাজয় প্রমাণ করে দিল যে, একটি পরাশক্তির পতন কেবল অন্য কোনও পরাশক্তির উত্থানের মাধ্যমেই হয় না, বরং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং ভুল রণকৌশলের ফলেও সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে ওঠে। টানা সাঁইত্রিশ দিন ধরে ইরান ভূখণ্ডে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ এবং নারকীয় বোমাবর্ষণ বিশ্ব সমরাস্ত্রের এক ভয়ংকর প্রদর্শনী ছিল। আধুনিকতম প্রযুক্তির সাহায্যে তারা ইরানের সামরিক কাঠামোর বিপুল ক্ষতিসাধন করেছে, শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যে মূল উদ্দেশ্যে এই সর্বাত্মক আক্রমণ— অর্থাৎ কট্টরপন্থী শাসনযন্ত্রের সম্পূর্ণ পতন বা অন্তত তাদের নতজানু করে কোনো চুক্তিতে বাধ্য করা— তার কানাকড়িও অর্জিত হয়নি। একটি রাষ্ট্রযন্ত্র, যা দশকের পর দশক ধরে বহির্বিশ্বের চরম অর্থনৈতিক অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ প্রবল বিক্ষোভ শক্ত হাতে দমন করে টিকে আছে, তারা যে কেবল বোমার ভয়ে আত্মসমর্পণ করবে না, তা সাধারণ রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন যে কারও বোঝা উচিত ছিল। বরং এই সংঘাত এক অভাবনীয় মোড় নিল যখন ইজরায়েল ইরানের একটি উল্লেখযোগ্য গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালাল এবং তার পালটা জবাব হিসেবে ইরান কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে— যা বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কেন্দ্র— নিখুঁত ও ধ্বংসাত্মক প্রত্যাঘাত হানল। এই একটি মাত্র চালেই ইরান বুঝিয়ে দিল যে, তাদের কাছে হারানোর মতো যা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি তারা গোটা বিশ্বের করতে সক্ষম। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের জুজু এবং তেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার আতঙ্কে ওয়াশিংটন কার্যত পিছু হটতে বাধ্য হলো।

Advertisement

এই পিছু হটার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ— হরমুজ প্রণালী— এর ওপর থেকে আমেরিকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অবসান এবং ইরানের অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। হরমুজ প্রণালী কোনও সাধারণ জলপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসতন্ত্র। এই জলপথের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির দড়ি তার হাতেই বাঁধা থাকবে। ইরান এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবে। তারা চাইলেই এখন প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে অবাধ চলাচলের সুযোগ দিয়ে শত্রু রাষ্ট্রগুলোর বাণিজ্যতরী আটকে দিতে পারে। পরমাণু বোমার বোতাম হাতে থাকার চেয়েও এই জ্বালানি সরবরাহের টুঁটি চেপে ধরার ক্ষমতা অনেক বেশি ভয়ংকর ও তাৎক্ষণিক। কারণ, পরমাণু অস্ত্র কেবলই একটি প্রতিরোধের হাতিয়ার, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হলো এক দৈনন্দিন প্রভাব বিস্তারের অব্যর্থ অস্ত্র।

এই পরিবর্তিত সমীকরণে পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল রদবদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। যে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো এতদিন আমেরিকার সামরিক ও নিরাপত্তার ছাতার তলায় নিজেদের অর্থনীতি ও সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল, তারা আজ এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে। তারা বুঝতে পারছে যে, আমেরিকার নৌবহর আর তাদের রক্ষাকবচ নয়। নিজেদের অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের এখন অগত্যা তেহরানের সঙ্গে আপস রফায় আসতে হবে। অন্যদিকে, ইজরায়েল পড়বে এক চূড়ান্ত কোণঠাসা অবস্থায়।

এতদিন ইজরায়েল যখন খুশি যেখানে খুশি সামরিক আস্ফালন করতে পারত, কারণ তাদের পিছনে ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন ছিল। কিন্তু এখন, ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতির ত্রাতা বা ধ্বংসকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, তবে লেবানন বা গাজার মতো অঞ্চলে ইরানের মদতপুষ্ট ছায়াশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে ইজরায়েলকে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হবে। কারণ ইজরায়েলের সামান্যতম উসকানিতে ইরান যদি জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে গোটা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়বে এবং সেই দায় ইজরায়েলের ঘাড়েও বর্তাবে। আন্তর্জাতিক এই পটপরিবর্তনের প্রভাব ভারতের মতো উন্নয়নশীল এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য অত্যন্ত গভীর ও চিন্তার বিষয়।

ভারতের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়, তার সিংহভাগই আসে এই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এবং তা হরমুজ প্রণালী হয়েই ভারতের বন্দরে পৌঁছয়। এতদিন মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় এই জলপথটি নিরাপদ ছিল বলে ভারতকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামাতে হয়নি। কিন্তু আমেরিকার এই ‘কাগুজে বাঘ’-এ পরিণত হওয়ার বাস্তবতায়, নয়া দিল্লিকে তার বিদেশনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের খোলনলচে বদলাতে হবে।

ভারতীয় হিসেবে আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, পশ্চিমা দুনিয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার দিন শেষ। ভারতকে এখন তার নিজস্ব কৌশলগত স্বকীয়তা বজায় রেখে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনীতির খেলায় অবতীর্ণ হতে হবে। একদিকে যেমন আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আমাদের বিপুল বাণিজ্যিক স্বার্থ ও প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি জড়িত, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও ঐতিহাসিক ও ভূ-কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য অপরিহার্য। চাবাহার বন্দরের মতো প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর যে স্বপ্ন ভারত দেখছে, তার চাবিকাঠি তেহরানের হাতে। এখন ইরান যখন গোটা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে উঠছে, তখন তাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে ভারতকে আরও দূরদর্শী হতে হবে। আমেরিকা বা পশ্চিমি দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে, সম্পূর্ণ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও জ্বালানি চুক্তি সুনিশ্চিত করা ভারতের জন্য এখন শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ।

এছাড়া, এই সংঘাত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কোনও দেশের সামরিক রসদ কতটা দ্রুত তলানিতে এসে ঠেকতে পারে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে উন্নত বিশ্বের অস্ত্রভাণ্ডারে যেভাবে টান পড়েছে, তা দেখে রাশিয়া বা চিন তাদের নিজেদের আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নে আরও উৎসাহিত হবে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বেজিংয়ের সামরিক প্রস্তুতি কিংবা ইউরোপের সীমানায় মস্কোর আস্ফালন আগামী দিনে আরও প্রবল আকার ধারণ করতে পারে। এই বহুমেরু বিশ্বে, যেখানে কোনও একক পরাশক্তির আর ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা নেই, সেখানে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও স্থিতিশীলতা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়েছে।

এমন একটি পরিস্থিতিতে, ভারতের মতো রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের নৌ-প্রভাব বিস্তারের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা যদি পশ্চিমারা আর নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য এক অসম প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ‘যার যার তার তার’ নীতি বিশ্বকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তবে ভারত, তার প্রাচীন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে, এই নয়া বিশ্বব্যবস্থায় একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তির ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দূরদর্শী বিদেশনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব। উপসাগরের এই দাবাখেলায় আমেরিকা হয়তো সাময়িকভাবে কিস্তিমাত হয়েছে, কিন্তু বিশ্বরাজনীতির আসল খেলাটি সবেমাত্র শুরু হলো। আর এই খেলায় ভারতকে কেবল দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না, অত্যন্ত সাবধানে এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের ঘুঁটিগুলো সাজাতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুরক্ষিত ও স্বনির্ভর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়।

Advertisement