• facebook
  • twitter
Saturday, 23 May, 2026

জাতিগণনা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জাতিগণনা যেন শেষ লক্ষ্য না হয়ে ওঠে। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভারতের জাতিগণনা নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আসলে নতুন নয়— বরং দেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভিতরেই বহুদিন ধরে জমে থাকা এক দ্বৈততার প্রকাশ। সুপ্রিম কোর্ট সাম্প্রতিক যে আবেদনটি খারিজ করেছে, সেখানে জাতিভিত্তিক গণনা বন্ধ করার দাবি তোলা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছেন, সরকারের জানা উচিত কত মানুষ পিছিয়ে আছে এবং কাদের কল্যাণমূলক সহায়তার প্রয়োজন। তাঁর এই মন্তব্য এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা মৌলিক প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ভারত রাষ্ট্র একটি জাতিহীন সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছিল। সেই লক্ষ্যেই প্রথম দিকের সরকারগুলি জাতিগণনা থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ধারণা ছিল, জাতিকে পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিলে তা সমাজে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সংবিধান সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ নীতি চালু করে, যেখানে জাতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ফলে একদিকে জাতিকে অস্বীকারের চেষ্টা, অন্যদিকে সেই জাতির ভিত্তিতেই নীতি নির্ধারণ—এই দ্বৈত অবস্থানই আজকের সমস্যার মূল।

Advertisement

এই প্রেক্ষাপটে জাতিগণনার দাবি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৭ সালের জনগণনার অংশ হিসেবে জাতির হিসাব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে যখন দেখা যায়, ১৯৩১ সালের পর এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ গণনা আর হয়নি। এত দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব নীতি নির্ধারণে অসুবিধা তৈরি করেছে। কোন শ্রেণি কতটা পিছিয়ে, কারা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত— এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর না থাকলে পরিকল্পনাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

Advertisement

তবে এর বিপরীত যুক্তিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জাতিগণনা সমাজে জাতিগত পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে তুলতে পারে। এটি মানুষকে নিজেদের পরিচয় আরও সংকীর্ণভাবে ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে যে সামাজিক বিভাজন দূর করার কথা বলা হয়, সেটিই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। এই উদ্বেগ অমূলক নয়, কারণ ভারতের সামাজিক বাস্তবতায় জাতি এখনও গভীরভাবে প্রোথিত।

২০১১ সালের সমাজ-অর্থনৈতিক ও জাতিগণনার অভিজ্ঞতা এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। সেখানে প্রায় ৪৬ লক্ষ আলাদা জাতির নাম উঠে আসে এবং বিপুল পরিমাণ তথ্যগত ভুল ধরা পড়ে। ফলে সেই তথ্য কার্যত অপ্রয়োজ্য হয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, জাতিগণনা শুধুমাত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়— এটি একটি বড় প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জও।

এখানেই সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। যদি জাতিগণনা করতেই হয়, তবে তা হতে হবে অত্যন্ত সতর্ক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। শুধু নাম সংগ্রহ করলেই হবে না, সেই তথ্যকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তবেই তা নীতি নির্ধারণে কার্যকর হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জাতিগণনা যেন শেষ লক্ষ্য না হয়ে ওঠে। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে, রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে যে জাতিহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। মানুষকে যদি নিজেদের ‘জাতিহীন’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায়, তবে সেটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।

অতএব, জাতিগণনা নিয়ে বিতর্ককে একপাক্ষিকভাবে দেখা উচিত নয়। এটি যেমন প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের একটি উপায়, তেমনই এটি সামাজিক সংবেদনশীলতারও একটি পরীক্ষা। সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র যদি এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবে জাতিগণনা একটি বিভাজনের হাতিয়ার না হয়ে, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

Advertisement