ভারতের বিচারব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, ন্যায়বিচারের পাশাপাশি মর্যাদার সুরক্ষা। বিশেষ করে যৌন হিংসার মতো সংবেদনশীল অপরাধে বেঁচে যাওয়া মানুষের পরিচয় গোপন রাখা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, এই মৌলিক নীতির প্রয়োগে গুরুতর শৈথিল্য দেখা দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ইঙ্গিত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এবং বিচারপতি সঞ্জয় কারোলের বেঞ্চ, উভয়ই যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত সরাসরি বলেছে, যৌন নির্যাতনের শিকারদের পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে পুলিশ ও নিম্ন আদালতগুলির মধ্যে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই কঠোর মন্তব্য প্রকৃতপক্ষে একটি সতর্কবার্তা— আইনের প্রতি এই অবহেলা আর সহনীয় নয়।
Advertisement
গুরুগ্রামের একটি মামলায় নাবালিকা নির্যাতিতার নাম, তার পরিবারের তথ্য এবং এমনকি স্কুলের নথিও আদালতের নথিতে যুক্ত করা হয়েছিল। একইভাবে হিমাচল প্রদেশের একটি মামলায় নয় বছরের এক শিশুর পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে আদালতের নথিতে। এই ঘটনাগুলি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এগুলি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ২২৮এ ধারা (বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৭২ ধারা) অনুযায়ী, যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যার শাস্তি দু’বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
Advertisement
এই আইনি বিধানটি আকস্মিক তৈরি হয়নি। ১৯৮৩ সালে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ভারতীয় ফৌজদারি আইনে ‘ভিক্টিম-কেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হয়। ইন-ক্যামেরা ট্রায়াল, পরিচয় গোপন রাখা— এসবই ছিল সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্যাতিতাদের সামনে আসার সাহস জোগানো এবং বিচার প্রক্রিয়াকে কার্যকর করা। কিন্তু আজ, চার দশক পরেও যদি এই মৌলিক সুরক্ষা বিধান লঙ্ঘিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
২০১৮ সালের নিপুণ সাক্সেনা ভার্সাস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিল যে, নির্যাতিতার পরিচয় কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না। সেই রায়ে আদালত তুলে ধরেছিল, কীভাবে পুলিশি তদন্ত থেকে শুরু করে আদালতের পরিবেশ— সব জায়গাতেই নির্যাতিতারা দ্বিতীয়বার মানসিক আঘাতের সম্মুখীন হন। এমনকি আদালতে প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের অবমাননাকর প্রশ্নের মুখে বিচারকরা অনেক সময় ‘নীরব দর্শক’ হয়ে থাকেন— এই কঠোর মন্তব্যও সেই রায়ে উঠে এসেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি আরও উদ্বেগজনক। কারণ এটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করছে। আদালত নিজেই প্রশ্ন তুলেছে, এ কি তবে ‘গার্ড’ নামিয়ে দেওয়ার লক্ষণ? যদি তাই হয়, তবে তা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার উপর সরাসরি আঘাত।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার নিম্নস্তরে যদি এই ধরনের ভুল বারবার ঘটে, তবে তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? কেবল নির্দেশ জারি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি প্রয়োজন কঠোর প্রয়োগ ও নজরদারি?
সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই রাজ্যগুলির হাই কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলদের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছে, যাতে এই নীতির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়— এমনকি ২০১৮ সালের রায়ের আগের মামলাতেও। এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের উপর।
সমস্যার মূলে রয়েছে সংবেদনশীলতার অভাব। আইন থাকা সত্ত্বেও যদি তার আত্মা অনুপস্থিত থাকে, তবে তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। যৌন নির্যাতনের শিকারদের জন্য বিচার প্রক্রিয়া যেন আরেকটি শাস্তি হয়ে না দাঁড়ায়,এটি নিশ্চিত করাই আবশ্যক।
অতএব, প্রয়োজন কেবল আইনি কাঠামোর নয়, মানসিকতার পরিবর্তন। পুলিশ, আইনজীবী, বিচারক, সবাইকে এই বিষয়ে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ একজন নির্যাতিতার পরিচয় রক্ষা করা মানে শুধু একটি আইনি বিধান মানা নয়, এটি মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা।
সুপ্রিম কোর্টের এই সতর্কবার্তা তাই শেষ কথা নয়, বরং একটি সূচনা— একটি আরও সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল এবং মানবিক বিচারব্যবস্থার পথে।
Advertisement



