• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 10 September, 2026

ব্যারেলপিছু ১০০ ডলার ছাড়ালো তেল পশ্চিম এশিয়ার আগুনের আঁচ বিশ্ব অর্থনীতিতে

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন যত ছড়াচ্ছে, তার আঁচ ততই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির ঘরে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম

ব্যারেলপিছু ১০০ ডলার ছাড়ালো তেল পশ্চিম এশিয়ার আগুনের আঁচ বিশ্ব অর্থনীতিতে

Photo: Magnific

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন যত ছড়াচ্ছে, তার আঁচ ততই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির ঘরে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপিছু ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। জুলাইয়ের পর প্রথমবার তেলের দাম এই স্তরে পৌঁছেছে। পরে সামান্য নেমে এলেও তাতে স্বস্তির খুব বেশি কারণ নেই। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজারের ওঠানামা কোনও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চক্রের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, প্রতিশোধ, সামরিক উত্তেজনা এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলিকে ঘিরে গভীর অনিশ্চয়তা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, সংঘাত এখন আর কোনও একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। আমেরিকা ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে সংঘর্ষ এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা— সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি একটি জটিল আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সংকট আরও ছড়িয়ে পড়লে তার অর্থনৈতিক অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে, তা এখনই সম্পূর্ণ অনুমান
করা কঠিন।
তেলের বাজারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, বাস্তবে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আগেই দাম বেড়ে যেতে পারে। বাজার ভবিষ্যতের আশঙ্কাকে বর্তমান দামের মধ্যে নিয়ে আসে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন যে, আগামী দিনগুলিতে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, তাঁরা আগেভাগেই বেশি দামে তেল কিনতে শুরু করেন। ফলে যুদ্ধের কোনও প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতি না হলেও শুধু আশঙ্কার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে
যেতে পারে।
এই মুহূর্তে সেই আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত এই সরু জলপথ বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম এশিয়ার বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পড়বে।
ইরানের জন্যও এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খার্গ দ্বীপে দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত। দেশের অপরিশোধিত তেলের বিপুল অংশ এই অঞ্চল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সেখানে কোনও বড় ধরনের সামরিক হামলা হলে বা তেলবাহী জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপন্ন হলে শুধু ইরানের অর্থনীতি নয়, বিশ্ব তেলবাজারও অস্থির হয়ে উঠবে।
এখানেই আমেরিকা ও ইরানের বর্তমান সংঘাত বিশেষ উদ্বেগের। ইরানি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন হামলা এবং তার পাল্টা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কোনও পক্ষই যদি প্রতিশোধের মাত্রা ক্রমাগত বাড়াতে থাকে, তাহলে একটি সীমিত সামরিক সংঘর্ষ সহজেই বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। আর পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের বিস্তার মানেই বিশ্ব তেলবাজারে আরও অনিশ্চয়তা।
সৌদি আরবকে ঘিরে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক। সেখানে তেল স্থাপনা, পরিশোধনাগার বা অন্যান্য শক্তি পরিকাঠামোর উপর বড় আকারের হামলা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এর সঙ্গে যদি ইরান-আমেরিকা সংঘাতও চলতে থাকে, তাহলে বাজারে আতঙ্ক দ্বিগুণ হবে।
লোহিত সাগরের পরিস্থিতিও উপেক্ষা করার মতো নয়। এই সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাহাজ চলাচল নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়লে অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ পথ নিতে হয়। তাতে সময় বাড়ে, জ্বালানি খরচ বাড়ে এবং বিমার খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে শুধু তেল নয়, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং নানা ধরনের ভোগ্যপণ্যের পরিবহণ ব্যয়ও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ তেলের দাম ১০০ ডলার হওয়ার অর্থ শুধু পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা নয়। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়ে। তার ফল পড়ে বাজারদরে। কৃষি, রাসায়নিক শিল্প, প্লাস্টিক, বিমান পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন— অসংখ্য ক্ষেত্র সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত। তাই দীর্ঘস্থায়ী তেল-সংকট বিশ্বব্যাপী নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে উদ্বেগের কারণ আরও স্পষ্ট হয়। গত কয়েক বছরে করোনা-পরবর্তী সরবরাহ সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। বহু দেশে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম দীর্ঘদিন ১০০ ডলার বা তার ওপরে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির পক্ষে সুদের হার কমানো আরও কঠিন
হয়ে পড়বে।
ফলে একটি পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের প্রভাব আর পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে আটকে থাকবে না। সুদের হার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন— সবকিছুর উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম যদি আরও বাড়ে এবং দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কাও বাড়বে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারত তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রার বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতির উপর। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন ও শিল্পের খরচও বাড়ে।
অবশ্য ভারতের কিছু সুবিধাও রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের নীতি, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত তেল মজুত সংকটের অভিঘাত কিছুটা সামাল দিতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে কোনও ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারবে না।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের তাই শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নজরে রাখলেই চলবে না। বিকল্প সরবরাহপথ, কৌশলগত মজুত, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও আরও জোর দিতে হবে। কারণ বর্তমান সংকট আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে— জ্বালানি নিরাপত্তা আসলে জাতীয় নিরাপত্তারই
একটি অংশ।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কূটনীতি। সামরিক শক্তি দিয়ে কোনও পক্ষ হয়তো তাৎক্ষণিক সুবিধা অর্জন করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি পাল্টা হামলা সংঘাতকে আরও গভীর করে। তেলবাহী জাহাজে হামলা, সামরিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বা শক্তি পরিকাঠামোতে আক্রমণ— এসব পদক্ষেপ একদিকে রাজনৈতিক বার্তা দেয়, অন্যদিকে ভুল হিসাবের সম্ভাবনাও বাড়ায়।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে যদি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে দেওয়া হয়, তাহলে তার পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হবে। তেলের দাম হয়তো ১০০ ডলারে থেমে থাকবে না; তার সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাড়তে থাকবে।
এই কারণে তেলের দাম ১০০ ডলার ছোঁয়া নিছক একটি বাজার-সংক্রান্ত খবর নয়। এটি আসলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি সতর্ক সংকেত। একটি অঞ্চলের সামরিক সংঘাত কীভাবে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, তারই প্রমাণ এটি।
পশ্চিম এশিয়ায় আজ যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি, তা হলো— কে সামরিকভাবে জিতবে, শুধু সেটি নয়, সংঘাত কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কারণ যুদ্ধের বিজয়ী হয়তো কোনও একটি পক্ষ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে শেষ পর্যন্ত কেউই পুরোপুরি মুক্ত থাকে না।
তেলের আগুন তাই শুধু তেলের আগুন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাদ্যের দাম, পরিবহনের খরচ, শিল্পের ভবিষ্যৎ, মানুষের জীবনযাত্রা এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। পশ্চিম এশিয়ায় প্রতিটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র যখন আকাশে ওঠে, তার প্রতিধ্বনি আন্তর্জাতিক তেলবাজারে শোনা যায়। আর সেই প্রতিধ্বনি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় সাধারণ
মানুষের সংসারে।

তাই এখন প্রয়োজন প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সংযমের রাজনীতিতে ফিরে আসা। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি আর একটি বড় জ্বালানি-সংকটের ধাক্কা কতটা সামলাতে পারবে, সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছেই নিশ্চিত নয়।