• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 5 September, 2026

ভুয়ো নথি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ঋণ: Zee-র মালিক সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে এবার CBI, তোলপাড় শিল্পমহল

সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে নতুন সিবিআই মামলা থেকে ২২ হাজার কোটির দেউলিয়া বিতর্ক, জি গ্রুপের সাত বছরের আর্থিক সংকটের সম্পূর্ণ খতিয়ান।

ভুয়ো নথি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ঋণ: Zee-র মালিক সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে এবার CBI, তোলপাড় শিল্পমহল

Subhash Chandra of Zee Group (Subhash Chandra of Zee Group (Wikimedia, AI Retouched))

সম্পত্তির অঙ্কে গরমিল থাকলে কী হয়, সেটাই এবার হাতেকলমে দেখিয়ে দিতে চাইছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই (CBI)। জি গ্রুপ (Zee Group) তথা এসেল গ্রুপের (Essel Group) কর্ণধার সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে প্রতারণার নতুন মামলা। অভিযোগ, বাজার থেকে ঋণ জোগাড় করতে নিজের সম্পত্তির অঙ্ক কয়েকশো গুণ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিলেন তিনি। এই ঘটনায় আধা সরকারি সংস্থা এলআইসি হাউজিং ফিনান্সের (LIC Housing Finance) প্রায় ১,৩২২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে দাবি।

তবে এই মামলা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘ সাত বছরের এক আর্থিক নাটকের সাম্প্রতিকতম অধ্যায় এটি। নাটকটির শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। আপাতত প্রায় যবনিকা পতনের সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, ২২ হাজার কোটি টাকার দেনা কী ভাবে মাত্র সাড়ে ছ’ কোটিতে মিটে যেতে পারে।

কী বলছে FIR

গত ৩১ আগস্ট এলআইসি হাউজিং ফিনান্স লিমিটেডের (LICHFL) জেনারেল ম্যানেজার নীতা মেংহানির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর (FIR) দায়ের করে সিবিআইয়ের ব্যাঙ্কিং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ফ্রড ব্র্যাঞ্চ। অভিযুক্তের তালিকায় সুভাষ চন্দ্র ছাড়াও রয়েছেন পঙ্কজ সুরোলিয়া, আমিশ পান্ডিয়া ও রাজীব ধোলাকিয়া। সঙ্গে রয়েছে বসন্ত সাগর প্রপার্টিজ, প্যান ইন্ডিয়া ইনফ্রাপ্রোজেক্টস, ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কনসালটেন্সি সার্ভিসেস এবং স্পিরিট ইনফ্রাপাওয়ার অ্যান্ড মাল্টিভেঞ্চার্স নামে চারটি সংস্থার নামও।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দু’টি ঋণ মঞ্জুর করে এলআইসি হাউজিং ফিনান্স। বসন্ত সাগর প্রপার্টিজের জন্য ৫০০ কোটি, আর ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার ম্যানেজমেন্টের জন্য ৪৮০ কোটি টাকা। মোট ৯৮০ কোটি। দুটি ঋণেরই ব্যক্তিগত জামিনদার (personal guarantor) ছিলেন সুভাষ চন্দ্র নিজে। পরে দু’টি ঋণই বকেয়া পড়ে যায়। বসন্ত সাগরের বকেয়া দাঁড়ায় ৫৭০.৫০ কোটি, ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবারের বকেয়া ৫০৭.২৫ কোটি। সব মিলিয়ে LICHFL-এর সংস্থার ক্ষতি ছাপিয়ে যায় ১,৩২২ কোটি টাকা।

সিবিআইয়ের এফআইআরে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়ো নথি তৈরি করেছিলেন সুভাষ চন্দ্র, যাতে নিজের সম্পত্তির অঙ্ক বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় দায়ের হয়েছে মামলা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি দমন আইনের (Prevention of Corruption Act) ধারাও।

যেখানে আসল গরমিল

গোটা মামলার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি হল সম্পত্তির অঙ্কের হেরফের। ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ডিআইএম অ্যান্ড কোং নামে একটি সংস্থার শংসাপত্র অনুযায়ী সুভাষ চন্দ্রের সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। মাস তিনেক পরে, ৬ জুলাই এমপিজে অ্যান্ড কোংয়ের শংসাপত্রে সেই অঙ্ক নেমে আসে ৪০,৫৬২ কোটিতে। ঋণ মঞ্জুরের সময় দু’টি শংসাপত্রই জমা পড়ে।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। বছর কয়েক পরে ব্যক্তিগত দেউলিয়া মামলার (personal insolvency proceedings) শুনানিতে সুভাষ চন্দ্র নিজেই জানান, ২০২৪ সালে তাঁর মোট সম্পত্তির মূল্য মাত্র ৩১.৭৯ কোটি টাকা। এমনকি ২০১৭-১৮ সালেও তাঁর সম্পত্তি ৪০ হাজার কোটির বেশি ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। অর্থাৎ, যে অঙ্ক দেখিয়ে হাজার কোটির ঋণ জোগাড় হয়েছিল, সেই একই ব্যক্তি বছর কয়েক পরে বলছেন সেই অঙ্কটাই ভুল ছিল। এলআইসি হাউজিং ফিনান্সের অভিযোগের কেন্দ্রে ঠিক এই বৈপরীত্যটিই।

গল্পের গোড়ায় ২০১৯ সালের ধাক্কা

এই গোটা সংকটের বীজ পোঁতা হয়েছিল অনেক আগে। এসেল গ্রুপ তখন সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুৎ পরিবহণ ও সৌরশক্তি প্রকল্পে বিপুল ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিল। সেই ঋণের বিপরীতে বন্ধক (pledge) রাখা হয়েছিল জি এন্টারটেনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেসের (ZEEL) প্রোমোটার শেয়ার। যতদিন শেয়ারের দাম চড়া ছিল, ততদিন সমস্যা হয়নি। কিন্তু ২০১৮ সালের শেষ দিকে শেয়ারের দরে ধস নামতেই গোটা কাঠামো টলমল করে ওঠে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে জি নেটওয়ার্ককে সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিসের (SFIO) তদন্তাধীন এক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তার জেরে হুড়মুড়িয়ে পড়ে শেয়ারের দাম। ঋণদাতাদের হাতে বন্ধক রাখা শেয়ার বাজেয়াপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি একটি খোলা চিঠিতে ব্যাংক ও লগ্নিকারীদের কাছে ক্ষমা চান সুভাষ চন্দ্র। প্রতিশ্রুতি দেন, প্রোমোটার শেয়ার বিক্রি করেই ঋণ শোধ করবেন। সেই থেকেই শুরু হয় জি সাম্রাজ্যে ধারাবাহিক অস্থিরতার পালা।

সেবির খাঁড়া

শুধু ব্যাঙ্ক ঋণ নয়, বাজার নিয়ন্ত্রক সেবিও (SEBI) একাধিকবার কড়া পদক্ষেপ করেছে সুভাষ চন্দ্র ও তাঁর ছেলে পুনীত গোয়েঙ্কার বিরুদ্ধে। ইয়েস ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ মেটাতে জি এন্টারটেনমেন্টের তহবিল অন্যত্র সরানোর অভিযোগ ওঠে ২০২৩ সালে। সেই মামলায় সাময়িকভাবে দুজনকেই তালিকাভুক্ত সংস্থার শীর্ষ পদে বসতে নিষেধ করে দেয় সেবি। চলতি বছরের জুলাইয়ে হায়দরাবাদের জমি বেআইনিভাবে বন্ধক রাখার অভিযোগে সুভাষ চন্দ্রকে ৬০ লক্ষ টাকা জরিমানা করে এবং এক বছরের জন্য শেয়ারবাজারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সংস্থা।

২২ হাজার কোটির দেনার রফা মাত্র সাড়ে ৬ কোটিতে

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অধ্যায় সম্ভবত সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়া মামলা। ২০২২ সালে ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফিনান্স (এখন সামান ক্যাপিটাল) দেউলিয়া আইনের (Insolvency and Bankruptcy Code) ৯৫ ধারায় সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরু করে। এই মামলা শুরু হয় বিবেক ইনফ্রাকন বলে একটি সংস্থার ১৭০ কোটি টাকার ঋণে তিনি ব্যক্তিগত জামিনদার ছিলেন।যা কখনওই শোধ দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালে সেই আবেদন গৃহীত হওয়ার পরে একে একে দাবি জানাতে থাকে অন্য ঋণদাতারাও। শেষমেশ মোট দাবির অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকা।

এই দাবির বিপরীতে সুভাষ চন্দ্র প্রস্তাব দেন, তিনি মাত্র ৬.২৫ কোটি টাকা (পরে সংশোধিত হয়ে ৬.৫ কোটি) দিয়ে গোটা দেনা মেটাতে চান। অর্থাৎ, প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ হেয়ারকাট (haircut) নিতে বাধ্য হবেন ঋণদাতারা। জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনালে (NCLT) এই প্রস্তাব নিয়ে বিচারকদের মধ্যেও মতভেদ দেখা যায়। শেষে তৃতীয় সদস্যের রায়ে আগস্ট মাসে এই পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। কিন্তু এলআইসি হাউজিং ফিনান্স ও এইচডিএফসি ব্যাংকের মতো ঋণদাতারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ট্রাইব্যুনাল এনসিএলএটিতে (NCLAT) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে সওয়াল করেন, এই রায় বহাল থাকলে দেউলিয়া আইনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে।

নিজের সাফাইয়ে সুভাষ চন্দ্র বারবার বলেছেন, ২২ হাজার কোটি টাকা তিনি ব্যক্তিগতভাবে ধার নেননি। তাঁর কথায়, এই অঙ্ক আসলে বিভিন্ন সংস্থার ঋণের বিপরীতে তাঁর দেওয়া ব্যক্তিগত জামিন (personal guarantee)। ৩০ অগস্ট এক বিবৃতিতে তিনি সরাসরি বলেন, তাঁর নিজের ঋণ শূন্য।

এখন কী হবে

সিবিআইয়ের নতুন এফআইআর এমন এক সময়ে এল, যখন এনসিএলটি-এনসিএলএটিতে দেউলিয়া মামলার শুনানি তুঙ্গে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ফৌজদারি মামলা এবং দেউলিয়া প্রক্রিয়া সমান্তরালভাবে চললে চাপ আরও বাড়বে সুভাষ চন্দ্রের উপর। তদন্ত সবে শুরুর পর্যায়, তাই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া আর অভিযোগ ওঠার মধ্যে ফারাক আছে, সেটা মনে রাখা জরুরি। তবে এটুকু স্পষ্ট, এক সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যারনের আর্থিক সাম্রাজ্যের চারপাশে আইনি ঘেরাটোপ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।